খাদ্যসহায়তা জালিয়াতির অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান, গ্রেপ্তার পাঁচ, আরও ধরপাকড়ের ঘোষণা
খাদ্যসহায়তা কর্মসূচিতে জালিয়াতির অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে কর্তৃপক্ষ, প্রথম পর্যায়ে হাইতির চারজন ও কিউবার একজন নাগরিক গ্রেপ্তার হয়েছেন।
খাদ্যসহায়তা জালিয়াতির অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অভিযান, গ্রেপ্তার পাঁচ, আরও ধরপাকড়ের ঘোষণা
৮,৫৩৫ বার পড়া হয়েছে ৬ মিনিটে পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি খাদ্যসহায়তা কর্মসূচিতে কথিত জালিয়াতি এবং অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে দেশজুড়ে অভিযান শুরু করেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। দেশটির স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ জানিয়েছে, এ অভিযানের আওতায় ইতোমধ্যে একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে হাইতির চারজন নাগরিক এবং কিউবার একজন নাগরিক রয়েছেন। কর্তৃপক্ষ বলছে, সরকারি অর্থে পরিচালিত খাদ্যসহায়তা কর্মসূচির অপব্যবহার বন্ধ করতে এ ধরনের অভিযান আরও বিস্তৃত করা হবে। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে—এমন তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমের ২০ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে প্রথম এ অভিযানের কথা সামনে আসে। পরদিন, ২১ অক্টোবর, স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি প্রকাশ করে। বিভাগটির প্রধান মার্কওয়েন মুলিন বলেছেন, অভিযানে যাদের আটক ও বহিষ্কার করা হয়েছে, তারা আরও বড় পরিসরে চলমান অভিযানের তুলনায় খুবই সামান্য অংশ। তাঁর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, ট্রাম্প প্রশাসন সরকারি সহায়তা কর্মসূচিতে জালিয়াতির অভিযোগ তদন্ত এবং অভিবাসন আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কঠোর অবস্থান অব্যাহত রাখতে চায়। স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, অভিযানে শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন হাইতির নাগরিক রুবস্টনি জুনিয়র থিওডোর, উইলবার্ট জিন ব্যাপটিস্ট, লুই জিন এবং ঝেনস্লি চার্লস। কিউবার নাগরিক এলিজাবেথ পোভেয়া রদ্রিগেজও গ্রেপ্তার হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে সরকারি খাদ্যসহায়তা কর্মসূচির সুবিধা প্রতারণার মাধ্যমে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কীভাবে জালিয়াতি সংঘটিত হয়েছে, কত অর্থের সুবিধা নেওয়া হয়েছে কিংবা কত দিন ধরে এ ধরনের কর্মকাণ্ড চলেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে অতীতে অপরাধসংক্রান্ত অভিযোগ বা দণ্ডের তথ্য রয়েছে। থিওডোরের বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগ, আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ এবং অনধিকার প্রবেশসংক্রান্ত ঘটনায় গ্রেপ্তারের ইতিহাসের কথা উল্লেখ করেছে বিভাগটি। অন্যদিকে, রদ্রিগেজের ক্ষেত্রে বিশৃঙ্খল আচরণের দায়ে পূর্ববর্তী দণ্ড এবং হামলা ও পারিবারিক সহিংসতাসংক্রান্ত অভিযোগে গ্রেপ্তারের তথ্য জানানো হয়েছে। তবে এসব তথ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে খাদ্যসহায়তা জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণ করে না। অতীতের অভিযোগ, গ্রেপ্তার এবং আদালতে প্রমাণিত অপরাধ—এই তিনটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা জরুরি।
যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি খাদ্যসহায়তা কর্মসূচিটি নিম্ন আয়ের ব্যক্তি ও পরিবারকে খাদ্য কেনার সামর্থ্য জোগাতে পরিচালিত হয়। কর্মসূচিটির মাধ্যমে যোগ্য সুবিধাভোগীদের নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ইলেকট্রনিক সুবিধা কার্ডে দেওয়া হয়। ওই কার্ড ব্যবহার করে অনুমোদিত দোকান থেকে নির্ধারিত খাদ্যসামগ্রী কেনা যায়। কর্মসূচিটির অর্থ আসে সরকারি তহবিল থেকে, ফলে এর অর্থ আত্মসাৎ, পরিচয় চুরি কিংবা ভুয়া আবেদন করে সুবিধা নেওয়ার মতো ঘটনা সরকার ও প্রকৃত সুবিধাভোগী—উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর হতে পারে। তবে এ কর্মসূচিতে কারা সুবিধা পাওয়ার যোগ্য, তা নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি বিষয় রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে অনিয়মিত অভিবাসন অবস্থায় থাকা ব্যক্তিরা সাধারণভাবে এ কর্মসূচির সুবিধা পাওয়ার যোগ্য নন। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক নন—এমন প্রত্যেক ব্যক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অযোগ্য। নির্দিষ্ট আইনসম্মত অভিবাসন অবস্থায় থাকা কিছু বিদেশি নাগরিক নির্ধারিত শর্ত পূরণ করলে খাদ্যসহায়তা পেতে পারেন। তাঁদের ক্ষেত্রে অভিবাসন অবস্থার পাশাপাশি আয়, পরিবারের সদস্যসংখ্যা এবং অন্যান্য যোগ্যতার শর্তও প্রযোজ্য হতে পারে। তাই নাগরিকত্ব না থাকাকে একমাত্র অযোগ্যতার কারণ হিসেবে দেখানো সঠিক হবে না।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। আইন অনুযায়ী সুবিধা পাওয়ার যোগ্যতা না থাকা এবং জালিয়াতি করে সুবিধা নেওয়া একই বিষয় নয়। কেউ অযোগ্য হয়েও সুবিধা পেয়ে থাকলে কীভাবে আবেদন করা হয়েছিল, কোন তথ্য দেওয়া হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ভুল তথ্য দিয়েছিলেন কি না, সেসব বিষয় তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হয়। একইভাবে, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলে তা প্রমাণের জন্য উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ ও আইনি প্রক্রিয়া প্রয়োজন। ফলে অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোকে এখনই প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ জানিয়েছে, এ অভিযান শুধু কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। সরকারি অর্থের অপব্যবহার শনাক্ত করা এবং কর্মসূচির সুবিধা প্রতারণার মাধ্যমে গ্রহণকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার লক্ষ্যেই বৃহত্তর কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে। তবে দেশজুড়ে ঠিক কতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, কোন কোন অঙ্গরাজ্যে অভিযান চালানো হয়েছে এবং কতজনকে ইতোমধ্যে বহিষ্কার করা হয়েছে—এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশিত হয়নি। প্রকাশিত পাঁচজনের নামকে তাই পুরো অভিযানের মোট গ্রেপ্তারের সংখ্যা হিসেবে ধরে নেওয়াও ঠিক হবে না। এ অভিযানের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ এবং কৃষি বিভাগ সরকারি খাদ্যসহায়তা কর্মসূচিতে জালিয়াতির বিরুদ্ধে পৃথক একটি দেশব্যাপী কার্যক্রমের তথ্য প্রকাশ করেছে। বিচার বিভাগের ২১ অক্টোবরের ঘোষণায় বলা হয়, ১ সেপ্টেম্বর থেকে ওই দিন পর্যন্ত বিভিন্ন তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপে ৪০ জনের বেশি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এসব মামলায় সরকারি অর্থের সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ ডলার বলে উল্লেখ করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ৪ কোটি ২০ লাখ ডলার খাদ্যসহায়তা কর্মসূচিসংক্রান্ত জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত বলে জানিয়েছে বিভাগটি। তবে বিচার বিভাগের এ হিসাব এবং অভিবাসন কর্তৃপক্ষের পাঁচজনকে গ্রেপ্তারের ঘোষণাকে একই মামলা বা একই অভিযানের হিসাব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বিচার বিভাগের ঘোষণায় পরিচয় চুরি, ভুয়া আবেদন, সুবিধা কার্ডের অপব্যবহার এবং দোকানের মাধ্যমে সন্দেহজনক লেনদেনের মতো একাধিক ধরনের ঘটনার কথা রয়েছে। এসব ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে কেউ কেউ অভিবাসন আইনের আওতায় থাকা ব্যক্তিও হতে পারেন। কিন্তু অভিবাসন কর্তৃপক্ষের তালিকায় থাকা পাঁচজন ওই পৃথক মামলাগুলোর আসামি কি না, সে বিষয়ে প্রকাশিত তথ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। খাদ্যসহায়তা কর্মসূচিতে জালিয়াতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আরেকটি দিক হলো প্রকৃত সুবিধাভোগীদের সুরক্ষা। যেসব পরিবার খাদ্য কেনার জন্য সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভর করে, তাদের কার্ডের তথ্য চুরি হলে বা অনুমতি ছাড়া অর্থ তুলে নেওয়া হলে পরিবারগুলো সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ জানিয়েছে, সুবিধা কার্ডের তথ্য চুরি করে অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় প্রকৃত সুবিধাভোগীদের খাদ্য কেনার অর্থ হারানোর নজির রয়েছে। এ কারণে জালিয়াতি প্রতিরোধের পাশাপাশি কার্ডের নিরাপত্তা, পরিচয় যাচাই এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে সহায়তা দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রাম্প প্রশাসনের এ পদক্ষেপকে অভিবাসন আইন প্রয়োগ এবং সরকারি অর্থের অপব্যবহার বন্ধের বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রশাসনের বক্তব্য, সরকারি সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে যোগ্যতার নিয়ম কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হবে এবং প্রতারণার প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে, এ ধরনের অভিযানে যেন অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে আগেভাগে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা না হয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। তদন্ত, অভিযোগ গঠন, বিচার এবং দণ্ডাদেশ—প্রতিটি ধাপের নিজস্ব আইনি প্রক্রিয়া রয়েছে।