দিল্লির বায়ুদূষণ বিপজ্জনকভাবে বাড়ছে, দূষণ ঠেকাতে ৩০ সংস্থাকে নিয়ে সরকারের উদ্যোগ
দশেরার উৎসবের পর দিল্লির বায়ুমান সূচক ২৩৮-এ পৌঁছে মৌসুমের প্রথম ‘খারাপ’ পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। দূষণ নিয়ন্ত্রণে নতুন পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে বায়ুদূষণ নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। বুধবার, ২১ অক্টোবর, শহরটির বায়ুমান সূচক বা এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) ২৩৮-এ পৌঁছেছে, যা চলতি মৌসুমে প্রথমবারের মতো ‘খারাপ’ শ্রেণিতে পড়েছে। দশেরার উৎসবের পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঘন ধোঁয়াশা দেখা দেওয়ার পাশাপাশি বাতাসে দূষণকারী কণার পরিমাণ বেড়েছে।
ভারতের কেন্দ্রীয় দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদের (CPCB) তথ্য অনুযায়ী, বুধবার সকাল ১০টায় দিল্লির AQI ছিল ২৩৮। আগের দিন মঙ্গলবার বিকেলে সূচকটি ছিল ১৭৯। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে বায়ুদূষণের মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। দিনের পরবর্তী সময়ে কিছু প্রতিবেদনে সূচক আরও বেড়ে ২৪৪ হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।
দশেরার উৎসবের সময় আতশবাজি, যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণকাজের ধুলা এবং অন্যান্য দূষণকারী উৎসের সম্মিলিত প্রভাব বায়ুর মান খারাপ করতে পারে। তবে এবারের দূষণ বৃদ্ধির জন্য শুধু উৎসবকে দায়ী করা যাচ্ছে না।
পরিবেশ কর্মকর্তাদের মতে, তাপমাত্রা কমে যাওয়া এবং বাতাসের গতির পরিবর্তনের কারণে দূষণকারী কণাগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে পারছে না। ফলে ধোঁয়া ও সূক্ষ্ম কণা বায়ুমণ্ডলের নিচের স্তরে জমে থেকে দূষণের মাত্রা বাড়িয়ে তুলছে। শীতের মৌসুম এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দিল্লিতে এমন পরিস্থিতি আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
CPCB-এর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, দিল্লির ৫৯টি পর্যবেক্ষণকেন্দ্রের মধ্যে ৫৬টির তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে জাহাঙ্গিরপুরী ও পুসা এলাকায় AQI যথাক্রমে ৩০৮ ও ৩১৪-তে পৌঁছেছে। এই দুই এলাকার বাতাস ‘অতি খারাপ’ শ্রেণিতে পড়েছে। শহরের অন্য কয়েকটি এলাকায়ও দূষণের মাত্রা বেড়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দিল্লি সরকার বিভিন্ন সংস্থাকে সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে। সরকারের ঘোষিত ১১ দফা দূষণ নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনায় প্রায় ৩০টি সংস্থাকে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হলো যানবাহনের ধোঁয়া, রাস্তার ধুলা, নির্মাণকাজের দূষণ, বর্জ্য পোড়ানো এবং শিল্পকারখানার নির্গমন নিয়ন্ত্রণ করা।
পরিকল্পনার আওতায় রাস্তায় যান্ত্রিকভাবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বাড়ানো, প্রয়োজন অনুযায়ী পানি ছিটিয়ে ধুলা নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণস্থলে নিয়মিত পরিদর্শন এবং দূষণ ছড়ানো যানবাহনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো পদক্ষেপ গুরুত্ব পাচ্ছে। খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ করা এবং দূষণের উৎসগুলো শনাক্ত করেও ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের বৃহত্তর শীতকালীন দূষণ মোকাবিলা পরিকল্পনায় গণপরিবহনের ব্যবহার বাড়ানো, যানজট কমানো, দূষণপ্রবণ এলাকায় বিশেষ নজরদারি এবং নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বিষয়ও রয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপের কার্যকারিতা নির্ভর করবে মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন ও বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ের ওপর।
বায়ুর মান ‘খারাপ’ শ্রেণিতে পৌঁছানোর পর কমিশন ফর এয়ার কোয়ালিটি ম্যানেজমেন্ট (CAQM) দিল্লি-জাতীয় রাজধানী অঞ্চলে গ্রেডেড রেসপন্স অ্যাকশন প্ল্যানের (GRAP) প্রথম পর্যায় কার্যকর করেছে। এই পর্যায়ে রাস্তার ধুলা নিয়ন্ত্রণ, নির্মাণস্থলে নজরদারি, বর্জ্য পোড়ানো বন্ধ এবং যানবাহনের দূষণ পরীক্ষা জোরদার করার মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে স্কুল ও অফিস বন্ধের কোনো সাধারণ নির্দেশের কথা সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে জানানো হয়নি। তবে দূষণের মাত্রা বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি অনুযায়ী আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
বায়ুদূষণ বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং হাঁপানি বা অন্যান্য শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত মানুষের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বাতাসে সূক্ষ্ম দূষণকারী কণার মাত্রা বেড়ে গেলে চোখ ও গলায় জ্বালা, কাশি এবং শ্বাস নিতে অসুবিধার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সংবেদনশীল ব্যক্তিদের বাইরে দীর্ঘ সময় অবস্থান এড়ানো এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত। বাইরে গেলে দূষণের মাত্রা ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় যথাযথ সুরক্ষাব্যবস্থা নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
দিল্লির সাম্প্রতিক পরিস্থিতি আবারও শীতের আগে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ সামনে এনেছে। সরকারি পরিকল্পনা, কঠোর নজরদারি এবং নাগরিকদের সহযোগিতা একসঙ্গে কার্যকর না হলে আগামী সপ্তাহগুলোতে রাজধানীর বায়ুর মান আরও খারাপ হতে পারে।





