যুক্তরাষ্ট্রে সামাজিক নিরাপত্তা নম্বরের নথিতে ৯১ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সংশোধন অভিযান
যুক্তরাষ্ট্রে সামাজিক নিরাপত্তা নম্বরের কোটি কোটি নথি সংশোধন করেছে প্রশাসন, মৃত্যুর তারিখ ও নাগরিকত্বের তথ্য হালনাগাদ করে জালিয়াতি ঠেকানোর উদ্যোগ জোরদার করেছে সরকার।
যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা প্রশাসন তাদের সামাজিক নিরাপত্তা নম্বরের তথ্যভান্ডারে ব্যাপক সংশোধনের ঘোষণা দিয়েছে। মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর প্রকাশিত সংস্থাটির বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ৯১ বছরের ইতিহাসে এত বড় পরিসরে নথি সংশোধনের উদ্যোগ আগে নেওয়া হয়নি। প্রশাসনের দাবি, সরকারি সেবা ব্যবস্থায় পরিচয় যাচাই আরও নির্ভুল করা, ভুল অর্থ প্রদান কমানো এবং সরকারি অর্থের অপব্যবহার প্রতিরোধের জন্য এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা প্রশাসনের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে সক্রিয় সামাজিক নিরাপত্তা নম্বরের প্রায় ১৫ শতাংশের সঙ্গে সম্পর্কিত নথি সংশোধন করা হয়েছে। সংস্থাটির তথ্যভান্ডারে প্রায় ৩৯ কোটি নথি রয়েছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৩৩ কোটি নাগরিকের তথ্যও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এই সংখ্যাগুলোকে ৩৯ কোটি ভুল নথি সংশোধনের প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। প্রশাসন জানিয়েছে, সংশোধনের আওতায় এসেছে সক্রিয় সামাজিক নিরাপত্তা নম্বরের প্রায় ১৫ শতাংশের রেকর্ড।
সামাজিক নিরাপত্তা নম্বর যুক্তরাষ্ট্রে ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করার গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম। চাকরি, করসংক্রান্ত কার্যক্রম, সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা এবং বিভিন্ন সরকারি সেবায় এই নম্বর ব্যবহৃত হয়। ফেডারেল সরকার ও অঙ্গরাজ্যগুলোর বিভিন্ন সংস্থা পরিচয় যাচাইয়ের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা প্রশাসনের নথির ওপর নির্ভর করে। ফলে কোনো ব্যক্তির তথ্য অসম্পূর্ণ, পুরোনো কিংবা ভুল থাকলে তা সরকারি সেবা প্রদান ও অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে।
প্রশাসনের এই উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো মৃত্যুর তারিখসংক্রান্ত তথ্য হালনাগাদ করা। সংস্থাটি জানিয়েছে, আগে যেসব নথিতে মৃত্যুর তারিখ ছিল না, সেগুলোর প্রায় এক কোটি ৭০ লাখ নথিতে মৃত্যুর তারিখ যুক্ত করা হয়েছে। এ কাজে প্রশাসনের নিজস্ব তথ্যব্যবস্থার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে পাওয়া তথ্যও ব্যবহার করা হয়েছে।
মৃত্যুর তথ্য যথাযথভাবে নথিভুক্ত থাকা কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝা কঠিন নয়। কোনো ব্যক্তি মারা যাওয়ার পরও সরকারি নথিতে তাঁর জীবিত থাকার তথ্য থেকে গেলে পরিচয় যাচাইয়ের সময় বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে। একইভাবে, মৃত ব্যক্তির নামে ভুলবশত অর্থ পরিশোধ অব্যাহত থাকলে সরকারি অর্থের অপচয় হতে পারে। সঠিক তথ্য থাকলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো এমন অসংগতি শনাক্ত করতে পারে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর তারিখ নথিতে যুক্ত করা মানেই যে তাঁর নামে অবৈধভাবে অর্থ নেওয়া হয়েছিল, তা নয়। প্রশাসনের ঘোষণায় সংশোধিত সব নথির ক্ষেত্রে জালিয়াতি প্রমাণিত হয়েছে, এমন কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। বরং অনুপস্থিত তথ্য পূরণ করে নথিগুলোকে আরও নির্ভুল করার কথা বলা হয়েছে। তাই এই সংশোধনকে জালিয়াতির বিরুদ্ধে একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যুক্তিসংগত, কিন্তু প্রতিটি সংশোধিত নথিকে জালিয়াতির ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না।
নাগরিকত্বসংক্রান্ত তথ্য হালনাগাদ করাও এই উদ্যোগের আরেকটি বড় অংশ। প্রশাসন জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগের অধীন সুবিধার জন্য অভিবাসনসংক্রান্ত তথ্য যাচাই ব্যবস্থার মাধ্যমে পাওয়া তথ্য ব্যবহার করে প্রায় আড়াই কোটি নথিতে আগে অনুপস্থিত নাগরিকত্বের তথ্য হালনাগাদ করা হয়েছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অভিবাসন বা নাগরিকত্বের অবস্থা যাচাই করতে সহায়তা পাওয়া যায়।
এখানেই শেষ নয়। সামাজিক নিরাপত্তা প্রশাসন আরও প্রায় ৮৫ লাখ নথিতে ভুল নাগরিকত্বের তথ্য সংশোধনের কাজ করছে বলে জানিয়েছে। অর্থাৎ, এই অংশের কাজ এখনো চলমান। যেসব নথিতে তথ্য অনুপস্থিত ছিল এবং যেসব নথিতে তথ্য ভুল ছিল, সেগুলো এক বিষয় নয়। প্রথম ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্য যুক্ত করা হয়েছে; দ্বিতীয় ক্ষেত্রে বিদ্যমান তথ্য যাচাই করে ভুল সংশোধনের উদ্যোগ চলছে। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নাগরিকত্বের তথ্য ভুল থাকার অর্থ সব সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ভুল তথ্য দিয়েছেন—এমন নয়। তথ্য সংগ্রহ, হালনাগাদ কিংবা নথিভুক্ত করার সময়ও ভুল হতে পারে।
প্রশাসনের কমিশনার ফ্রাঙ্ক জে বিসিগনানো বলেছেন, সামাজিক নিরাপত্তা নম্বরের তথ্যভান্ডার দেশের গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্রের অংশ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি পরিষেবার নির্ভরযোগ্যতা বজায় রাখতে তথ্যের নির্ভুলতা অত্যন্ত জরুরি। তিনি আরও বলেছেন, এই পরিসরের উদ্যোগের মাধ্যমে সরকারি প্রতিষ্ঠান ও অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যের ভিত্তি আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে।
ট্রাম্প প্রশাসন সরকারি ব্যয়, সুবিধা প্রদান এবং বিভিন্ন সরকারি কর্মসূচিতে জালিয়াতি ও অপচয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। সামাজিক নিরাপত্তা প্রশাসনের এই নথি সংশোধনের উদ্যোগ সেই বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ। তবে প্রশাসনের দাবি ও বাস্তব ফলাফলের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। নথি সংশোধন করা হয়েছে—এটি ঘোষিত তথ্য। কিন্তু এই উদ্যোগের ফলে কত ডলারের জালিয়াতি ঠেকানো গেছে, কতজন অনুপযুক্ত সুবিধাভোগী শনাক্ত হয়েছেন কিংবা কত অর্থ সাশ্রয় হয়েছে, সে বিষয়ে প্রকাশিত ঘোষণায় পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান দেওয়া হয়নি।
এই কারণে উদ্যোগটির সাফল্য বিচার করতে ভবিষ্যতে আরও তথ্যের প্রয়োজন হবে। যেমন, সংশোধনের আগে ও পরে ভুল অর্থ পরিশোধের হার কতটা কমেছে, সংশোধিত নথির কতগুলোতে বাস্তব অসংগতি পাওয়া গেছে এবং তথ্যের ভুলের কারণে কোনো বৈধ সুবিধাভোগী সমস্যায় পড়েছেন কি না—এসব বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। কেবল কত কোটি নথি সংশোধন হয়েছে, তা দিয়ে পুরো উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
সাধারণ নাগরিকদের জন্য এই ঘোষণার তাৎপর্য কী? প্রথমত, সামাজিক নিরাপত্তা নম্বরের নথি হালনাগাদ করা হচ্ছে বলে সবার নম্বর বদলে যাবে—এমন নয়। দ্বিতীয়ত, এই ঘোষণায় সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা গ্রহণকারী প্রত্যেক ব্যক্তির ভাতা বন্ধ করার কোনো নির্দেশ দেওয়া হয়নি। তৃতীয়ত, কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্বসংক্রান্ত তথ্য যাচাই বা সংশোধনের প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট নথির প্রকৃতি অনুযায়ী আলাদা ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তবে সবার জন্য নতুন কোনো আবেদন, নতুন নম্বর গ্রহণ কিংবা অবিলম্বে কার্যালয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—এমন তথ্যও ঘোষণায় নেই।
যাঁরা সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা পান, তাঁদের উচিত সরকারি সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া চিঠি বা বিজ্ঞপ্তি মনোযোগ দিয়ে পড়া এবং ব্যক্তিগত নথিতে কোনো ভুল আছে বলে মনে হলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা। সামাজিক নিরাপত্তা নম্বর, পরিচয়সংক্রান্ত নথি কিংবা ব্যক্তিগত তথ্য অচেনা ব্যক্তি বা সন্দেহজনক বার্তার মাধ্যমে কারও কাছে প্রকাশ করা উচিত নয়। সরকারি পরিচয়ে কেউ অর্থ, গোপন সংকেত বা ব্যক্তিগত তথ্য চাইলে তার সত্যতা যাচাই করা জরুরি।
নাগরিকত্বের তথ্য হালনাগাদের বিষয়টি অভিবাসী পরিবারগুলোর জন্যও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে এই ঘোষণার ভিত্তিতে বলা যায় না যে সব অভিবাসী বা স্থায়ী বাসিন্দার সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমে যাবে কিংবা বন্ধ হয়ে যাবে। সামাজিক নিরাপত্তা নম্বর থাকা, নাগরিকত্বের অবস্থা এবং নির্দিষ্ট সরকারি সুবিধা পাওয়ার যোগ্যতা—এগুলো সম্পর্কিত হলেও এক বিষয় নয়। কোন ব্যক্তি কোন সুবিধা পাবেন, তা সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির আইন ও যোগ্যতার শর্তের ওপর নির্ভর করে। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ক্ষেত্রে কী প্রভাব পড়বে, তা জানতে তাঁর নথি ও প্রযোজ্য নিয়ম আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে।
তথ্যের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। কোটি কোটি মানুষের পরিচয়সংক্রান্ত নথি সংশোধনের সময় তথ্যের উৎস, যাচাইয়ের পদ্ধতি এবং ভুল সংশোধনের সুযোগ স্বচ্ছ রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সরকারি তথ্যভান্ডারে ভুল থাকলে তার প্রভাব ব্যক্তির ওপর পড়তে পারে। তাই নাগরিকত্ব বা মৃত্যুর তারিখের মতো সংবেদনশীল তথ্য হালনাগাদের ক্ষেত্রে নির্ভুলতা নিশ্চিত করা এবং ভুলের শিকার ব্যক্তিদের অভিযোগ জানানোর সুযোগ রাখা জরুরি।
সব মিলিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রের সামাজিক নিরাপত্তা প্রশাসনের ঘোষণা একটি বড় প্রশাসনিক পরিবর্তনের কথা জানায়। প্রায় এক কোটি ৭০ লাখ নথিতে মৃত্যুর তারিখ যুক্ত করা হয়েছে, প্রায় আড়াই কোটি নথিতে অনুপস্থিত নাগরিকত্বের তথ্য হালনাগাদ করা হয়েছে এবং আরও প্রায় ৮৫ লাখ নথিতে ভুল নাগরিকত্বের তথ্য সংশোধনের কাজ চলছে। প্রশাসনের লক্ষ্য পরিচয় যাচাই উন্নত করা, সরকারি অর্থের অপব্যবহার কমানো এবং সুবিধা ব্যবস্থাপনা আরও নির্ভরযোগ্য করা। তবে এই উদ্যোগের ফলে বাস্তবে কতটা জালিয়াতি কমবে এবং নাগরিকদের জন্য কী ধরনের পরিবর্তন আসবে, তা নিশ্চিতভাবে বোঝার জন্য আরও ফলাফল ও বিস্তারিত তথ্যের অপেক্ষা করতে হবে।





