ট্রাম্পের ঘোষণা, যুক্তরাষ্ট্র-ভারত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্তের পথে, মুম্বাইয়ে রুবিওর গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা
ট্রাম্প বলছেন, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত। মুম্বাইয়ে মার্কো রুবিওর আলোচনায় বাণিজ্য, জ্বালানি ও প্রযুক্তি সহযোগিতা গুরুত্ব পেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলা বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, দুই দেশ একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে চায় এবং সমঝোতা এখন অনেকটাই কাছাকাছি। তবে প্রস্তাবিত চুক্তির চূড়ান্ত শর্ত কিংবা স্বাক্ষরের নির্দিষ্ট তারিখ এখনো ঘোষণা করা হয়নি।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য এমন সময় এসেছে, যখন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ভারতের মুম্বাইয়ে দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করছেন। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করা এবং দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিষয়গুলো সমাধান করাই এই আলোচনার অন্যতম লক্ষ্য ।
মঙ্গলবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের সঙ্গে বৈঠক করেন রুবিও। আলোচনায় দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, জ্বালানি, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
বৈঠকের পর রুবিও জানান, দুই দেশ চুক্তির খুব কাছাকাছি রয়েছে। তাঁর ভাষায়, আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার আগে যতটা কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব, দুই পক্ষ এখন প্রায় সেই অবস্থানে রয়েছে। কিছু বিষয়ের চূড়ান্ত সমাধান বাকি থাকলেও সেগুলো দ্রুত মিটে যেতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
রুবিওর এই মন্তব্য আলোচনায় নতুন গতি আসার ইঙ্গিত দিয়েছে। তবে কেবল আশাবাদী বক্তব্যের ভিত্তিতে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে বলা যাবে না। উভয় পক্ষের সম্মতি, চূড়ান্ত শর্ত এবং আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের বাণিজ্য আলোচনা দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন শুল্কনীতি এবং রাশিয়া থেকে ভারতের জ্বালানি আমদানিকে ঘিরে জটিলতার মুখে পড়েছিল। ২০২৫ সালে ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্ক আরোপের পর দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কে চাপ তৈরি হয়।
এরপর চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দুই দেশ বাণিজ্য চুক্তির প্রথম ধাপ নিয়ে একটি কাঠামোতে পৌঁছানোর কথা জানায়। কিন্তু শুল্কের পরিবর্তন, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক শর্ত নিয়ে আলোচনা আবারও ধীর হয়ে পড়ে।
ভারতের লক্ষ্য হলো, দেশীয় শিল্প ও রপ্তানিকারকদের স্বার্থ রক্ষা করে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান নিশ্চিত করা। অন্যদিকে ওয়াশিংটন চায়, মার্কিন পণ্য ও সেবার জন্য ভারতীয় বাজারে আরও সুযোগ তৈরি হোক।
দুই দেশের আলোচনায় জ্বালানি সহযোগিতা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। ভারত তার বিপুল জ্বালানি চাহিদা মেটাতে বিভিন্ন দেশ থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। রাশিয়ার তেলের ওপর ভারতের নির্ভরতা নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে আগে মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল।
রুবিও বলেছেন, ভারত ধীরে ধীরে জ্বালানি আমদানির উৎস বৈচিত্র্যময় করছে। যুক্তরাষ্ট্র চায়, ভারত মার্কিন জ্বালানি ও প্রযুক্তি কেনার পরিমাণ বাড়াক। তবে ভারতের জন্য জ্বালানি সরবরাহের ধারাবাহিকতা, মূল্য এবং দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থও গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়।
রুবিওর ভারত সফরে গুজরাটের জামনগরে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের বিশাল তেল শোধনাগার পরিদর্শনের কর্মসূচিও রয়েছে। জ্বালানি খাতে সম্ভাব্য সহযোগিতা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত করতে পারে।
বাণিজ্য চুক্তির পাশাপাশি প্রযুক্তি ও প্রতিরক্ষা খাতেও সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে দুই দেশ। যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে প্রযুক্তি বিনিময়, জ্বালানি সরবরাহ এবং প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করতে আগ্রহী।
ভারতের জন্যও মার্কিন বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং উন্নত প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সমঝোতা কী হবে, তা নির্ভর করবে আলোচনার ফল এবং দুই দেশের বাণিজ্যিক অগ্রাধিকারের ওপর।
বিশ্লেষকদের মতে, চুক্তিটি সম্পন্ন হলে দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা কমতে পারে এবং রপ্তানিকারক ও বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করার সুযোগ পেতে পারেন। তবে চুক্তির প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে শুল্কের হার, পণ্যের তালিকা, বাজারে প্রবেশের শর্ত এবং বাস্তবায়ন পদ্ধতির ওপর।
ট্রাম্প ও রুবিওর সাম্প্রতিক বক্তব্যে অগ্রগতির ইঙ্গিত স্পষ্ট। তবুও চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত না হওয়া পর্যন্ত এটিকে সম্পন্ন সমঝোতা হিসেবে দেখা উচিত নয়। আগামী কয়েক সপ্তাহে দুই দেশ অবশিষ্ট বিষয়গুলো সমাধান করতে পারে কি না, সেটিই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।





