বুরকিনা ফাসোতে মৃত্যুদণ্ড পুনর্বহাল, সন্ত্রাসবাদ ও রাষ্ট্রদ্রোহসহ গুরুতর অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান
আট বছর পর মৃত্যুদণ্ড ফিরিয়ে আনল পশ্চিম আফ্রিকার বুরকিনা ফাসো। ৭১ আইনপ্রণেতার সর্বসম্মত ভোটে নতুন দণ্ডবিধি অনুমোদিত হয়েছে।
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ বুরকিনা ফাসোতে মৃত্যুদণ্ড পুনর্বহাল করা হয়েছে। মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, দেশটির আইনসভা নতুন দণ্ডবিধি সর্বসম্মতিক্রমে অনুমোদন করে। এর মাধ্যমে ২০১৮ সালে বিলুপ্ত হওয়া মৃত্যুদণ্ড আবারও দেশটির বিচারব্যবস্থায় ফিরল। নতুন বিধানে সন্ত্রাসবাদ, গুপ্তচরবৃত্তি ও রাষ্ট্রদ্রোহসহ কয়েকটি গুরুতর অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
দেশটির বিচারমন্ত্রী এদাসো রদ্রিগে বায়ালা জানান, আইনসভার ৭১ জন সদস্যই সংশোধিত দণ্ডবিধির পক্ষে ভোট দিয়েছেন। সরকারের ভাষ্য, এই পরিবর্তনের লক্ষ্য জননিরাপত্তা জোরদার করা, জাতীয় স্বার্থ রক্ষা এবং গুরুতর অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।
কোন অপরাধে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে
নতুন দণ্ডবিধিতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, গুপ্তচরবৃত্তি, রাষ্ট্রদ্রোহ এবং পিতৃহত্যার মতো অপরাধকে মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধের আওতায় রাখা হয়েছে। এ ছাড়া মেয়াদোত্তীর্ণ বা নিষিদ্ধ পণ্য আমদানির ফলে কারও মৃত্যু হলে সংশ্লিষ্ট অপরাধীদেরও সর্বোচ্চ শাস্তির মুখোমুখি হতে হতে পারে।
বিচারমন্ত্রী বায়ালার দাবি, আগের আইনে তুলনামূলক কম কঠোর শাস্তির সুযোগ থাকায় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো নতুন সদস্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে সেটিকে কাজে লাগাত। সরকারের মতে, কঠোর শাস্তির বিধান সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সহায়ক হতে পারে।
তবে মৃত্যুদণ্ড পুনর্বহালের বাস্তব প্রভাব কী হবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়। আইনটি কীভাবে প্রয়োগ করা হবে এবং বিচারপ্রক্রিয়ায় অভিযুক্তদের অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকবে, তা নিয়ে ভবিষ্যতে আরও আলোচনা হতে পারে।
সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার প্রেক্ষাপট
বুরকিনা ফাসো বহু বছর ধরে আল-কায়েদা ও ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সহিংসতার মুখোমুখি। দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে হামলা, নিরাপত্তাহীনতা ও বাস্তুচ্যুতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবন বিপর্যস্ত হয়েছে। সরকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি মোকাবিলাকে মৃত্যুদণ্ড পুনর্বহালের অন্যতম যুক্তি হিসেবে তুলে ধরেছে।
২০২২ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর দেশটি সামরিক শাসনের অধীনে রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম ত্রাওরে প্রশাসন নিরাপত্তা ও বিচারব্যবস্থায় বিভিন্ন পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে। মৃত্যুদণ্ড পুনর্বহালের প্রস্তাবও সেই বৃহত্তর নীতিগত পরিবর্তনের অংশ।
মানবাধিকার নিয়ে উদ্বেগ
মৃত্যুদণ্ড পুনর্বহালের সিদ্ধান্তে মানবাধিকার সংগঠনগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ বিভিন্ন অধিকার সংগঠন অতীতে এই উদ্যোগের বিরোধিতা করে বলেছে, মৃত্যুদণ্ড ফিরিয়ে আনা বিচারব্যবস্থায় মানবাধিকারের সুরক্ষা দুর্বল করতে পারে।
বিশেষ করে সামরিক শাসনের অধীনে বিরোধী মত, সাংবাদিক এবং মানবাধিকারকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে নতুন আইনের প্রয়োগ নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হতে পারে। সমালোচকদের আশঙ্কা, যথাযথ বিচারিক সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে কঠোর আইন ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে সরকার বলছে, অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনায় কঠোর শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে এবং এর উদ্দেশ্য নিরাপত্তা ও জনশৃঙ্খলা নিশ্চিত করা।
১৯৮৮ সালের পর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়নি
বুরকিনা ফাসো ২০১৮ সালে মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্ত করেছিল। দেশটিতে সর্বশেষ নথিভুক্ত বিচারিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল ১৯৮৮ সালে। ফলে নতুন দণ্ডবিধি অনুমোদনের মাধ্যমে দেশটির অপরাধ ও শাস্তি ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এসেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, আইনটির বাস্তব প্রয়োগ, বিচারিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং মানবাধিকার সুরক্ষা আগামী দিনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠবে। সরকার নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতির প্রত্যাশা করলেও কঠোর শাস্তি সহিংসতা কমাতে কতটা কার্যকর হবে, তা সময়ই বলে দেবে।


