ফ্রান্সে লুটের পণ্য অনলাইনে বিক্রি ঠেকাতে কঠোর হচ্ছে সরকার
৮,৫৫৩ বার পড়া হয়েছে ৬ মিনিটে পড়ুন
ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও সরকারি পরিষেবার মান নিয়ে অসন্তোষ থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভের মধ্যে বিভিন্ন দোকানে লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। চুরি হওয়া পণ্যের কিছু অনলাইন বাজারে বিক্রির চেষ্টা সামনে আসার পর ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের সুরক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে দেশটির সরকার। অনলাইন বাজার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সন্দেহজনক বিজ্ঞাপন শনাক্ত, চোরাই পণ্যের বিক্রি বন্ধ এবং তদন্তে সহযোগিতা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ফরাসি কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য, লুট হওয়া পণ্য দ্রুত অনলাইন বাজার থেকে সরিয়ে ফেলা এবং বেআইনি কেনাবেচার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করা।
সরকারি উদ্যোগের বিষয়ে ফরাসি ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসাবিষয়ক মন্ত্রী সার্জে পাপাঁ এবং ডিজিটালবিষয়ক মন্ত্রী আন ল্য হেনাঁফ অনলাইন বাজার পরিচালনাকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করেন। ১৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে ভিন্টেড, আমাজন, ইবে, লেবনকোয়া, মেটা ও টিকটকের মতো প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল বলে ফরাসি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। আলোচনার উদ্দেশ্য ছিল, বিক্ষোভের সময় চুরি হওয়া পণ্য অনলাইনে বিক্রির বিজ্ঞাপন শনাক্ত করা, সেগুলো সরিয়ে ফেলা এবং অপরাধের তদন্তে সরকারি সংস্থাগুলোকে সহযোগিতা নিশ্চিত করা।
সরকারের এই পদক্ষেপের পেছনে রয়েছে ১৭ অক্টোবর ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে সংঘটিত বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঘটনা। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির মূল্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি এবং সরকারি পরিষেবা নিয়ে অসন্তোষ থেকে বহু মানুষ রাস্তায় নামেন। বিক্ষোভের অনেক অংশ শান্তিপূর্ণ থাকলেও কিছু এলাকায় পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। দোকানের কাচ ভাঙা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ঢুকে পণ্য নিয়ে যাওয়া, অগ্নিসংযোগ এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েন। ফরাসি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেশজুড়ে অন্তত তিন হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ক্ষতির মধ্যে রয়েছে দোকানের অবকাঠামো নষ্ট হওয়া, পণ্য চুরি, বিক্রয়কেন্দ্র বন্ধ রাখা এবং নিরাপত্তাব্যবস্থা মেরামতের বাড়তি ব্যয়। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য বিশেষ সহায়তা তহবিলের কথাও জানিয়েছেন বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। তবে সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষতির পরিমাণ এক নয়, এবং মোট আর্থিক ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব নির্ধারণে আরও যাচাই প্রয়োজন।
লুটপাটের ঘটনায় বিলাসবহুল পণ্যের দোকানও আলোচনায় এসেছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে লুই ভুইতোঁ, রোলেক্স এবং সেফোরার মতো প্রতিষ্ঠানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানে পোশাক, প্রসাধনী, মূল্যবান সামগ্রী ও অন্যান্য পণ্য বিক্রির দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম প্রতিবেদনে থাকা মানেই তার প্রতিটি শাখায় লুটপাট হয়েছে, এমন নয়। কোন শাখা থেকে কত পণ্য চুরি হয়েছে এবং কত পণ্য পরে অনলাইনে বিক্রির চেষ্টা করা হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকা এখনো প্রকাশিত হয়নি। চুরি হওয়া পণ্য অনলাইনে বিক্রির বিষয়টি সামনে আসায় ব্যবহৃত পণ্য কেনাবেচার মাধ্যম ভিন্টেড বিশেষভাবে নজরে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি ১৯ অক্টোবর জানায়, তারা সন্দেহজনক বিজ্ঞাপনের ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে এবং লুট হওয়া পণ্যের সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে—এমন কিছু বিজ্ঞাপন সরিয়ে দিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য অনুযায়ী, তাদের নিয়ম ভঙ্গকারী বিক্রেতাদের হিসাব স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। চোরাই পণ্য বিক্রি করা কিংবা এ ধরনের পণ্য কেনার জন্য ক্রেতা খোঁজা তাদের নীতিমালায় নিষিদ্ধ। এই পদক্ষেপের গুরুত্ব বোঝার জন্য অনলাইন বাজারের কার্যক্রম বিবেচনা করা প্রয়োজন। বর্তমানে অনেক মানুষ ঘরে ব্যবহৃত পোশাক, জুতা, প্রসাধনী, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং অন্যান্য সামগ্রী অনলাইনে কেনাবেচা করেন। এই বাজারে বৈধ বিক্রেতার পাশাপাশি অপরাধীরা সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। কোনো দোকান থেকে চুরি করা পণ্য দ্রুত অনলাইনে তুলে দিলে সেটি অন্য ক্রেতার কাছে বিক্রি হয়ে যেতে পারে। পণ্য একবার একাধিক ক্রেতার হাতে চলে গেলে সেটির উৎস শনাক্ত করা এবং মূল মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
এ কারণে ফরাসি কর্তৃপক্ষ অনলাইন বাজার পরিচালনাকারীদের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। কোনো বিজ্ঞাপন সন্দেহজনক মনে হলে সেটি যাচাই করা, প্রয়োজনে সাময়িকভাবে বিক্রি স্থগিত রাখা এবং অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে বিজ্ঞাপন সরিয়ে ফেলা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিক্রেতার হিসাব, পণ্যের বিবরণ এবং লেনদেনের তথ্য তদন্তের প্রয়োজনে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। তবে ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের ক্ষেত্রে আইন মেনে চলা এবং যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুরোধ অনুসরণ করাও জরুরি। সন্দেহজনক পণ্য শনাক্ত করার জন্য কয়েকটি বিষয় কাজে লাগতে পারে। কোনো দামি পণ্য বাজারদরের তুলনায় অস্বাভাবিক কম দামে বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া হলে, একই বিক্রেতা অল্প সময়ে অনেক নতুন পণ্য প্রকাশ করলে কিংবা পণ্যের মালিকানা বা কেনার প্রমাণ দেখাতে অস্বীকৃতি জানালে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কোনো পণ্যে দোকানের নিরাপত্তা চিহ্ন বা শনাক্তকরণ নম্বর থাকলে সেটিও তদন্তে সহায়ক হতে পারে। তবে এসব লক্ষণ একা কোনো ব্যক্তিকে অপরাধী প্রমাণ করে না। যথাযথ যাচাই ছাড়া বৈধ বিক্রেতার বিজ্ঞাপন সরিয়ে ফেলা বা তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা উচিত নয়। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের জন্য বিষয়টি শুধু চুরি হওয়া পণ্যের আর্থিক মূল্য ফিরে পাওয়ার প্রশ্ন নয়। দোকানের দরজা, জানালা ও কাচ মেরামত, নিরাপত্তা ক্যামেরা স্থাপন, কর্মীদের বেতন দেওয়া এবং নতুন পণ্য সংগ্রহ করতে অতিরিক্ত অর্থ প্রয়োজন হতে পারে। অনেক ব্যবসায়ী আগে থেকেই শীতকাল ও বড়দিনের বিক্রির জন্য পণ্য মজুত করে রাখেন। সেই পণ্য লুট হয়ে গেলে মৌসুমি বিক্রির গুরুত্বপূর্ণ সময়েও তাঁরা ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। ফলে অনলাইনে চোরাই পণ্য বিক্রি বন্ধ করা ব্যবসা পুনরুদ্ধারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে এই ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। বড় প্রতিষ্ঠানের তুলনায় তাঁদের আর্থিক সঞ্চয় কম হতে পারে এবং নতুন পণ্য কেনার জন্য ঋণ বা সরবরাহকারীর সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। দোকান বন্ধ থাকলে নিয়মিত ক্রেতা হারানোর আশঙ্কাও থাকে। এ কারণে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের আর্থিক সহায়তা, বিমার দাবি দ্রুত নিষ্পত্তি এবং অনলাইন বাজারে চোরাই পণ্য বিক্রি বন্ধ করার বিষয়গুলোকে একই সংকটের অংশ হিসেবে বিবেচনা করছে।
ফ্রান্সের আইন অনুযায়ী, অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত পণ্য জেনেশুনে নিজের কাছে রাখা, কেনাবেচা করা কিংবা অন্যের কাছে হস্তান্তরের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তবে কোনো পণ্য চোরাই কি না, বিক্রেতা তার উৎস সম্পর্কে কী জানতেন এবং অপরাধের সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতা কতটা—এসব বিষয় তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সন্দেহজনক বিজ্ঞাপন প্রকাশের ভিত্তিতে কাউকে দোষী ঘোষণা করা যায় না। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সাধারণ ক্রেতাদেরও এ ক্ষেত্রে সতর্ক ভূমিকা পালন করতে হবে। খুব কম দামে দামি পণ্য পাওয়ার সুযোগ দেখলেই কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। বিক্রেতার পরিচয়, পণ্যের বিবরণ এবং কেনার প্রমাণ সম্পর্কে জানতে চাওয়া যেতে পারে। পণ্যটি চুরি করা হয়েছে বলে যুক্তিসংগত সন্দেহ তৈরি হলে কেনাকাটা থেকে বিরত থাকা এবং অনলাইন বাজার পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে জানানো উচিত। এতে চোরাই পণ্যের চাহিদা কমতে পারে এবং অপরাধীদের পণ্য বিক্রি করা কঠিন হতে পারে।
তবে এই সংকটের সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে মানুষের অসন্তোষের বিষয়টিও জড়িত। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, জ্বালানি ব্যয়, শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা এবং সরকারি পরিষেবা নিয়ে মানুষের উদ্বেগকে উপেক্ষা করলে সামাজিক উত্তেজনা কমানো কঠিন হতে পারে। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ এবং ভাঙচুর বা লুটপাটের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বজায় রাখা জরুরি। যারা শান্তিপূর্ণভাবে নিজেদের দাবি জানিয়েছেন, তাঁদের সবাইকে সহিংসতার জন্য দায়ী করা যায় না। অপরাধের অভিযোগের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত দায় নির্ধারণ করতে হবে প্রমাণের ভিত্তিতে।
ফরাসি সরকারের উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করছে অনলাইন প্রতিষ্ঠানগুলো কত দ্রুত সন্দেহজনক বিজ্ঞাপন শনাক্ত করতে পারে এবং তদন্তে কতটা কার্যকরভাবে সহযোগিতা করে তার ওপর। বিজ্ঞাপন সরানোর পাশাপাশি চুরি হওয়া পণ্য উদ্ধার, ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের ক্ষতি কমানো এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের অপরাধ প্রতিরোধ করাও গুরুত্বপূর্ণ। সরকারের কাছে প্রতিষ্ঠানগুলোর অগ্রগতির প্রতিবেদন পৌঁছালে পদক্ষেপগুলোর কার্যকারিতা সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।