গ্রেপ্তার বা মৃত্যুর ভয় নেই, ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ঘোষণা দিলেন শেখ হাসিনা
৯,৬৪৭ বার পড়া হয়েছে ৬ মিনিটে পড়ুন
শেখ হাসিনা আবারও বাংলাদেশে ফেরার ঘোষণা দিয়ে দেশের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। সোমবার, ১৯ অক্টোবর, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে আয়োজিত একটি ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি জানান, আগামী ডিসেম্বর মাসে দেশে ফেরার ইচ্ছা তাঁর রয়েছে। গ্রেপ্তার, নির্যাতন কিংবা প্রাণহানির আশঙ্কা থাকলেও তিনি নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে চান না বলে বক্তব্যে উল্লেখ করেন। ভারতের সংবাদমাধ্যম টাইমস অব ইন্ডিয়া ও ইন্ডিয়া টুডে তাঁর এই বক্তব্যের খবর প্রকাশ করেছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওয়াশিংটনভিত্তিক সেন্টার ফর ইউএস-বাংলাদেশ রিলেশনস আয়োজিত অনুষ্ঠানে অনলাইনে যুক্ত হয়ে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশে ফিরে যাওয়া তাঁর দায়িত্ব। দেশে ফিরলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হতে পারে, এমনকি তাঁর জীবনও বিপন্ন হতে পারে—এই আশঙ্কার কথাও তিনি উল্লেখ করেন। তবু ভয়কে নিজের সিদ্ধান্তের পথে বাধা হতে দিতে চান না বলে জানান তিনি। তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল, দেশের মানুষের কাছে ফিরে যাওয়া এবং রাজনৈতিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন—এটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তাঁর বক্তব্যের ভিত্তিতে সমর্থিত। কিন্তু তিনি ঠিক কোন তারিখে ফিরবেন, কোন পথে ফিরবেন কিংবা বাস্তবে তাঁর প্রত্যাবর্তন ঘটবে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়। তাঁর ঘোষণাকে দেশে ফেরার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের প্রমাণ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। এ বিষয়ে বাংলাদেশের সরকার, ভারতের সরকার কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে তাঁর ফেরার কোনো নিশ্চিত সময়সূচি প্রকাশিত হয়েছে বলে আলোচিত প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ নেই।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার পরিকল্পনা অবশ্য একেবারে নতুন নয়। এর আগে চলতি বছরের ১০ জুলাই রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, ডিসেম্বরের দিকে আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নিয়ে দেশে ফেরার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। তখন তিনি দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করার সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেছিলেন। পরে ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়ার বিদেশি সংবাদদাতাদের সংগঠনের আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ভার্চুয়ালি বক্তব্য দিয়ে তিনি আবারও ডিসেম্বর মাসে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। অর্থাৎ, অক্টোবরের বক্তব্যটি তাঁর আগের ঘোষণার ধারাবাহিকতা। সাম্প্রতিক বক্তব্যে তিনি নিজের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তবে আগের সাক্ষাৎকারে যে প্রত্যাবর্তন ও আদালতে আত্মসমর্পণের পরিকল্পনার কথা বলেছিলেন, সেটির বাস্তবায়ন এখনো হয়নি। তাঁর বক্তব্য এবং বাস্তব পরিস্থিতিকে আলাদা করে দেখাই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
শেখ হাসিনা ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান। এরপর থেকে তিনি ভারতে অবস্থান করছেন বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী বলপ্রয়োগের অভিযোগ ওঠে। ওই আন্দোলন ও দমন-পীড়নের ঘটনায় ব্যাপক প্রাণহানির পর তাঁর সরকারের পতন ঘটে। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, ওই দমন-পীড়নে নিহতের সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৪০০ পর্যন্ত হতে পারে।
এই ঘটনাগুলোর পর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে একাধিক আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তাঁর অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং বিচারপ্রক্রিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য ও অভিযোগ তাঁর নিজের অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি; এগুলোকে আদালতের সিদ্ধান্ত বা স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্যের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না। একইভাবে, আদালতের রায় ও তার বিরুদ্ধে তাঁর আপত্তি—দুই বিষয়ই সংবাদ প্রতিবেদনে যথাযথ প্রেক্ষাপটে উল্লেখ করা প্রয়োজন।
দেশে ফেরার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে তাঁর আইনি অবস্থান। বাংলাদেশ সরকার এর আগে ভারত সরকারের কাছে শেখ হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছে। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে অনুরোধটি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিবেচনা করার কথা জানানো হয়েছে বলে পূর্ববর্তী প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ রয়েছে। ফলে শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে না; এর সঙ্গে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক, প্রত্যর্পণসংক্রান্ত বিধান এবং বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়াও জড়িত। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিও এই ঘোষণাকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার এখন ক্ষমতায় রয়েছে বলে সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চলমান মামলা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও অব্যাহত রয়েছে। শেখ হাসিনা ও তাঁর দল এই পরিস্থিতিকে রাজনৈতিকভাবে হয়রানি করার প্রচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করে আসছে। অন্যদিকে, তাঁর সরকারের আমলে সংঘটিত সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের বিচার নিশ্চিত করার দাবিও বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে রয়েছে।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার সঙ্গে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকার প্রশ্নও জড়িয়ে আছে। দলটির কার্যক্রমে বিধিনিষেধের কারণে তাদের নির্বাচনী অংশগ্রহণ, সাংগঠনিক তৎপরতা এবং নেতাকর্মীদের রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। শেখ হাসিনা আগে বলেছেন, তাঁর দলকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ দেওয়া উচিত এবং জনগণকে নির্বাচনের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিতে হবে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশে ফিরে তিনি দলটির নেতাকর্মীদের পাশে দাঁড়াতে চান। তবে দেশে ফিরে তিনি কীভাবে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করবেন, তাঁর বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলোর কী পরিণতি হবে কিংবা তিনি নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত। এদিকে, শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তনের বিষয়টি বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৪ সালে তাঁর দেশত্যাগের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তাঁকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। ভারত বিষয়টি বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছে। শেখ হাসিনা স্বেচ্ছায় বাংলাদেশে ফিরে গেলে প্রত্যর্পণ নিয়ে চলমান কূটনৈতিক আলোচনার ধরন বদলাতে পারে। তবে তাঁর বিরুদ্ধে থাকা রায়, নিরাপত্তার আশঙ্কা এবং দুই দেশের আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে পরিস্থিতি জটিলই থাকতে পারে। এখন পর্যন্ত তাঁর ফেরার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে কোনো চূড়ান্ত সমঝোতা হয়েছে বলে আলোচিত সংবাদ প্রতিবেদনগুলোতে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। এই ঘোষণাকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। শেখ হাসিনার সমর্থকেরা তাঁর বক্তব্যকে দেশে ফেরার দৃঢ় অঙ্গীকার হিসেবে দেখতে পারেন। অন্যদিকে, ২০২৪ সালের আন্দোলনে নিহত ব্যক্তিদের পরিবার এবং তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা বিভিন্ন পক্ষের কাছে বিচার ও জবাবদিহির বিষয়টি বেশি গুরুত্ব পেতে পারে। ফলে তাঁর প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নে রাজনৈতিক অবস্থানগুলো পরস্পরবিরোধী হওয়া স্বাভাবিক। তবে ভবিষ্যতে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা দেবে, তা আগাম নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। এখানে সংবাদ যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত, শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন—এমন খবর একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। দ্বিতীয়ত, জুলাই ও আগস্ট মাসেও তিনি একই ধরনের ঘোষণা দিয়েছিলেন। তৃতীয়ত, তাঁর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায়, ভারতে অবস্থান এবং বাংলাদেশ সরকারের প্রত্যর্পণের অনুরোধের বিষয়গুলো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের পূর্ববর্তী প্রতিবেদনেও এসেছে। ফলে তাঁর ফেরার ঘোষণা সংবাদ হিসেবে সমর্থিত হলেও নির্দিষ্ট তারিখে তিনি দেশে ফিরবেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নিশ্চিত প্রমাণ এখনো নেই।