মিসিসিপিতে বৃদ্ধ খুন, আগের রাতের এক চিৎকার ঘিরে বাড়ছে রহস্য ও সন্দেহ
যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপিতে বাড়িতে অনুপ্রবেশের সময় নিজের বন্দুকের গুলিতে নিহত হন বৃদ্ধ ববি ম্যাকগিল; সম্ভাব্য ধর্মীয় উদ্দেশ্য নিয়ে তদন্ত চলছে, তবে নিশ্চিত প্রমাণ মেলেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি অঙ্গরাজ্যে নিজের বাড়িতে অনুপ্রবেশকারীর সঙ্গে ধস্তাধস্তির সময় নিজের বন্দুকের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছেন ৮১ বছর বয়সী ববি ম্যাকগিল। ভোররাতে সংঘটিত এই মর্মান্তিক ঘটনায় তাঁর স্ত্রী পেগি ম্যাকগিল প্রাণে বেঁচে বাড়ি থেকে বেরিয়ে জরুরি সেবায় ফোন করেন। ঘটনার তদন্তে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে আগের রাতের একটি ভিডিও, যেখানে অভিযুক্ত ব্যক্তি ঈশ্বরের অস্তিত্ব অস্বীকার করে থাকতে পারেন বলে তদন্তকারীদের ধারণা। তবে হত্যাকাণ্ডের পেছনে ধর্মীয় বিদ্বেষ কাজ করেছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
ইউনিয়ন কাউন্টির শেরিফ জিমি এডওয়ার্ডসের বক্তব্য অনুযায়ী, গত ১৫ অক্টোবর বৃহস্পতিবার ভোর প্রায় চারটার দিকে এই ঘটনা ঘটে। ববি ম্যাকগিল ও তাঁর স্ত্রী তখন নিজেদের বাড়িতে ঘুমিয়ে ছিলেন। এ সময় এরিক বাসকো নামের এক ব্যক্তি তাঁদের বাড়িতে প্রবেশ করেন বলে কর্তৃপক্ষের অভিযোগ। এরপর ববি ম্যাকগিলের সঙ্গে তাঁর ধস্তাধস্তি শুরু হয়। তদন্তকারীদের প্রাথমিক ধারণা, বাড়িতে থাকা মূল্যবান জিনিসপত্র চুরির উদ্দেশ্যেই ওই ব্যক্তি সেখানে প্রবেশ করেছিলেন।
শেরিফের বর্ণনা অনুযায়ী, ম্যাকগিল তাঁর শোবার ঘরের বিছানার পায়ের দিকের কাছে একটি বাক্সে আগ্নেয়াস্ত্র রাখতেন। অনুপ্রবেশকারীকে প্রতিহত করতে গিয়ে তিনি অস্ত্রটি হাতে নেওয়ার চেষ্টা করে থাকতে পারেন। কিন্তু ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি অস্ত্রটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেন এবং ম্যাকগিলকে একাধিকবার গুলি করেন। এতে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয় বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
এই সময় পেগি ম্যাকগিল নিরাপদে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে সক্ষম হন এবং জরুরি নম্বরে ফোন করে জানান, কেউ তাঁদের বাড়িতে ঢুকে তাঁর স্বামীকে আক্রমণ করেছে। তাঁর দ্রুত ফোনের মাধ্যমে কর্তৃপক্ষ ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে পারে। বৃদ্ধ দম্পতির বাড়িতে এমন সহিংস হামলার ঘটনা স্থানীয় এলাকায় উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
তদন্তে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে ঘটনার আগের রাতের একটি ভিডিও। শেরিফ এডওয়ার্ডসের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ভিডিওতে বাসকোকে ম্যাকগিলের বাড়ি থেকে প্রায় দেড় মাইল দূরে একটি সড়ক দিয়ে হাঁটতে দেখা যায়। ভিডিওতে তাঁকে হাত ওপরে তুলে চিৎকার করতেও দেখা গেছে। তাঁর মুখ থেকে ‘ঈশ্বর মৃত’—এমন কথা শোনা যাচ্ছে বলে শেরিফের ধারণা। তবে তিনি স্পষ্ট করেছেন, ভিডিওর শব্দ থেকে ঠিক কী বলা হয়েছে, সে বিষয়ে তদন্তকারীরা শতভাগ নিশ্চিত নন। ফলে ওই বক্তব্যকে এখনই নিশ্চিত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করা যাচ্ছে না।
ববি ম্যাকগিলের বাড়ির আঙিনায় একটি ক্রুশ এবং ‘যিশুই প্রভু’ লেখা একটি ফলক ছিল বলেও শেরিফ উল্লেখ করেছেন। আগের রাতের ভিডিওতে কথিত বক্তব্য এবং বাড়ির আঙিনায় থাকা ধর্মীয় প্রতীকের মধ্যে কোনো সম্পর্ক ছিল কি না, সেই প্রশ্ন তাঁর মনে এসেছে। তবে শেরিফ নিজেই বলেছেন, ধর্মীয় প্রতীক দেখে অভিযুক্ত ব্যক্তি বাড়িটি বেছে নিয়েছিলেন—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নিশ্চিত তথ্য তাঁর কাছে নেই।
কোনো ব্যক্তি ধর্মবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন বলে মনে হওয়া এবং ধর্মীয় বিদ্বেষের কারণে কাউকে হত্যা করা—দুটি এক বিষয় নয়। হত্যাকাণ্ডের পেছনে উদ্দেশ্য নির্ধারণ করতে হলে অভিযুক্ত ব্যক্তির বক্তব্য, আচরণ, ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি, সম্ভাব্য চুরির উদ্দেশ্য এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য একসঙ্গে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্য থেকে ধর্মীয় বিদ্বেষকে হত্যাকাণ্ডের নিশ্চিত কারণ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
শেরিফের বক্তব্য অনুযায়ী, বাসকোর বিরুদ্ধে আগে গুরুতর অপরাধের কোনো পরিচিত ইতিহাস ছিল না; ছোটখাটো যানবাহনসংক্রান্ত অপরাধের তথ্যের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। বাসকোর মানসিক অবস্থার বিষয়েও শেরিফ উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে তাঁর মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে কোনো নির্ভরযোগ্য চিকিৎসাগত মূল্যায়ন প্রকাশিত হয়নি। তাই মানসিক অসুস্থতাকে ঘটনার কারণ হিসেবে নিশ্চিতভাবে উল্লেখ করার সুযোগ নেই।
ঘটনার পর বাসকো ম্যাকগিলের বাড়ির একটি বাথরুমে গিয়ে নিজেকে গুলি করেন বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন। তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী প্রতিবেদনে ইউনিয়ন কাউন্টির করোনার পাম বোম্যান নিশ্চিত করেন, হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সপ্তাহান্তে বাসকোরও মৃত্যু হয়েছে। তাঁর মৃত্যুর পর মামলাটির সম্ভাব্য বিচারিক প্রক্রিয়া কীভাবে এগোবে, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত সিদ্ধান্ত প্রকাশিত হয়নি।
নিহত ববি ম্যাকগিলের পরিবারের পক্ষ থেকেও শোক প্রকাশ করা হয়েছে। তাঁর নাতনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, তাঁর দাদা সৃষ্টিকর্তাকে সর্বোচ্চ ভালোবাসতেন এবং পরিবারের সদস্যদের গভীরভাবে ভালোবাসতেন। পরিবারের স্মৃতিচারণে উঠে এসেছে, ম্যাকগিল তাঁর বিশ্বাস ও জীবনাচরণের মাধ্যমে অন্যদের অনুপ্রাণিত করতেন। তবে পরিবারের ধর্মীয় পরিচয় বা বিশ্বাসের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সে বিষয়ে আলাদা প্রমাণ প্রয়োজন।
ঘটনাটি ঘিরে কয়েকটি প্রশ্ন এখনো অমীমাংসিত। অভিযুক্ত ব্যক্তি কেন ওই বাড়িতে প্রবেশ করেছিলেন, কথিত বক্তব্যের প্রকৃত অর্থ কী ছিল এবং বাড়ির আঙিনায় থাকা ধর্মীয় প্রতীক তাঁর সিদ্ধান্তে কোনো প্রভাব ফেলেছিল কি না এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। তদন্তকারীরা প্রকাশ্যে যে তথ্য দিয়েছেন, তার ভিত্তিতে চুরির উদ্দেশ্য একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলেও ধর্মীয় বিদ্বেষের অভিযোগ এখনো অনুমাননির্ভর।
যুক্তরাষ্ট্রে কোনো অপরাধের পেছনে ধর্মীয় বিদ্বেষের সম্ভাবনা দেখা দিলে উদ্দেশ্য নির্ধারণে প্রমাণের গুরুত্ব বিশেষভাবে বেড়ে যায়। এ ক্ষেত্রে ভিডিওর শব্দ স্পষ্টভাবে যাচাই করা, অভিযুক্ত ব্যক্তির পূর্ববর্তী আচরণ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা এবং ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করা জরুরি। শুধু একটি অস্পষ্ট ভিডিও বা বাড়ির আঙিনায় ধর্মীয় প্রতীক থাকার ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ন্যায়সংগত হবে না।





