মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার আগুন, বিশ্ববাজারে ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাল জ্বালানি তেলের দাম
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাতের আশঙ্কা, জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি এবং সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগে আন্তর্জাতিক বাজারে বাড়ছে তেলের দাম, নতুন করে চাপে পড়তে পারে বিশ্ব অর্থনীতি।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম আবারও ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। ২০২৬ সালের ২০ অক্টোবর প্রকাশিত বাজারসংক্রান্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা, সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল নিয়ে আশঙ্কা তেলের বাজারকে অস্থির করে তুলেছে। তবে দাম সব সময় একই অবস্থানে থাকেনি; লেনদেনের বিভিন্ন সময়ে তা বেড়েছে, আবার কমেছেও। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের সর্বশেষ দর এবং দিনের সর্বোচ্চ দরকে আলাদা করে দেখা জরুরি।
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড ব্রেন্টের দাম মঙ্গলবার প্রতি ব্যারেলে ১১০ ডলার ৭ সেন্টে পৌঁছায় বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। আগের লেনদেন পর্বে এর দাম সর্বোচ্চ ১১০ ডলার ৭০ সেন্টে উঠেছিল, যা ২০২৬ সালের ২০ মে-র পর সর্বোচ্চ পর্যায়। দিনের এক পর্যায়ে দাম কমে গেলেও সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বাজারে ক্রেতাদের সতর্ক রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ডের দামও ১০০ ডলারের ওপরে ছিল। এই তথ্য থেকে বোঝা যায়, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চাপ এখনো উল্লেখযোগ্য।
তেলের দাম বৃদ্ধির পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী সৌদি আরবের কয়েকটি জ্বালানি স্থাপনা, বিমানবন্দর ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর দাবি করেছে। তাদের দাবির মধ্যে ইয়ানবু এলাকার সৌদি আরামকোর একটি স্থাপনা এবং শাইবাহ তেলক্ষেত্রের কথাও রয়েছে। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ এসব হামলার দাবি তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করেনি। রয়টার্স জানিয়েছে, এসব দাবির সত্যতা তারা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। তাই হামলার সব বিবরণকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক হবে না। তা সত্ত্বেও জ্বালানি উৎপাদন ও পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো ঝুঁকিতে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা বাজারে প্রভাব ফেলছে।
সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থার তথ্যের বরাতে বলা হয়েছে, দুই সপ্তাহে অন্তত ১৮টি জাহাজে হামলার খবর পাওয়া গেছে। উপসাগরীয় অঞ্চলে জাহাজের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে তেল পরিবহনে বিলম্ব, বীমা ব্যয় বৃদ্ধি এবং পণ্য পৌঁছানোর খরচ বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পথ দিয়ে তেল পরিবহনে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটলে আমদানিনির্ভর দেশগুলো দ্রুত চাপের মুখে পড়তে পারে। তবে আশঙ্কা থাকা আর বাস্তবে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া এক বিষয় নয়; পরিস্থিতির প্রকৃত প্রভাব নির্ভর করবে জাহাজ চলাচল ও রপ্তানির ধারাবাহিকতার ওপর।
তেলের বাজারে শুধু সংঘাতের আশঙ্কাই কাজ করছে না, সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনাও দামকে প্রভাবিত করছে। যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট কিছু নিষেধাজ্ঞা ও শুল্কে ছাড় দেওয়ার পদক্ষেপ নিয়েছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। রাশিয়া থেকে অতিরিক্ত জ্বালানি সরবরাহের সম্ভাবনা বাজারে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে হামলা বা পরিবহনপথে বিঘ্নের আশঙ্কা তৈরি হলে সেই স্বস্তি দ্রুত কমে যেতে পারে। ফলে ব্যবসায়ীরা একদিকে সম্ভাব্য অতিরিক্ত সরবরাহ, অন্যদিকে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি দুই বিষয়ই বিবেচনায় রাখছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের মজুত নিয়েও বাজারে নজর রয়েছে। রয়টার্সের প্রকাশিত প্রাথমিক জরিপে গত সপ্তাহে দেশটির অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির মজুত কমে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। তবে প্রাথমিক জরিপকে চূড়ান্ত সরকারি হিসাব হিসেবে গণ্য করা যায় না। মজুতের প্রকৃত পরিবর্তন, উৎপাদনের পরিমাণ এবং শোধনাগারের চাহিদা সম্পর্কে সরকারি তথ্য প্রকাশের পর বাজারের পরিস্থিতি আরও পরিষ্কার হতে পারে। মজুত কমে গেলে সরবরাহ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়তে পারে, আবার উৎপাদন ও আমদানি বৃদ্ধি পেলে সেই চাপ কিছুটা প্রশমিত হতে পারে।
বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিনির্ভর দেশের জন্য আন্তর্জাতিক বাজারের এই পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম দীর্ঘ সময় উঁচু থাকলে আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। এর প্রভাব জ্বালানি আমদানির বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা, পরিবহন ব্যয়, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পণ্য পরিবহনের খরচে পড়ার আশঙ্কা থাকে। পরিবহন ব্যয় বাড়লে কৃষিপণ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও অন্যান্য পণ্যের বাজারদরেও পরোক্ষ চাপ তৈরি হতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লেই বাংলাদেশের পেট্রোলপাম্পে সঙ্গে সঙ্গে দাম বেড়ে যাবে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক নয়। দেশের খুচরা জ্বালানির মূল্য নির্ধারণে আমদানি চুক্তি, পরিশোধন ব্যয়, পরিবহন, কর, সরকারি নীতি এবং মজুতের মতো একাধিক বিষয় কাজ করে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ব্রেন্টের আন্তর্জাতিক দর এবং বাংলাদেশের পাম্পে বিক্রি হওয়া জ্বালানির দাম এক নয়। ব্রেন্ট একটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, যা মূলত অপরিশোধিত তেলের বাজারদর বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে পেট্রোল, অকটেন ও ডিজেলের দাম নির্ভর করে পরিশোধন ও সরবরাহব্যবস্থাসহ আরও অনেক উপাদানের ওপর। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের একটি দিনের দর দেখে দেশের জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিশ্চিত বলে প্রচার করা বিভ্রান্তিকর হতে পারে। এ বিষয়ে সরকারি ঘোষণা বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তথ্য না পাওয়া পর্যন্ত সম্ভাব্য প্রভাবকে আশঙ্কা হিসেবেই উল্লেখ করা উচিত।
বিশ্লেষকদের মতে, আগামী দিনে তেলের বাজারের গতিপথ নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, জাহাজ চলাচলের স্বাভাবিকতা, রাশিয়ার জ্বালানি সরবরাহ এবং বড় অর্থনীতিগুলোর মজুত ও চাহিদার ওপর। সংঘাতের আশঙ্কা কমলে এবং তেল পরিবহন নির্বিঘ্ন থাকলে দাম থেকে ঝুঁকিজনিত অতিরিক্ত চাপ কমে আসতে পারে। বিপরীতে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা সমুদ্রপথে বাস্তব বিঘ্ন ঘটলে দাম আবারও বাড়তে পারে। তাই ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারের কাছাকাছি দামকে বাজারের অস্থিরতার গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে দেখা গেলেও এটিকে স্থায়ী মূল্য বা ভবিষ্যৎ দামের নিশ্চয়তা হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।





