ক্যালিফোর্নিয়ায় ৫৭ লাখ শিক্ষার্থীর তথ্য চুরি, বিনামূল্যে পরিচয় সুরক্ষার সুযোগ দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ
ক্যালিফোর্নিয়ার লাখো শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত তথ্য চুরি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য দুই বছরের বিনামূল্যের পরিচয় সুরক্ষা সেবা দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে সরকারি বিদ্যালয়ের প্রায় ৫৭ লাখ শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত তথ্য চুরির ঘটনা সামনে এসেছে। অঙ্গরাজ্যের শিক্ষা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষার্থীদের মানসম্মত পরীক্ষার কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ইটিএসের কাছে সংরক্ষিত নথি থেকে এসব তথ্য চুরি করা হয়েছে। ঘটনাটি বর্তমান শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাবেক শিক্ষার্থীদেরও ঝুঁকির মুখে ফেলেছে। ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য দুই বছরের বিনামূল্যের পরিচয় সুরক্ষা সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কর্তৃপক্ষ পরিবারগুলোকে সতর্ক থাকার এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সহায়তা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, চুরি হওয়া নথিতে শিক্ষার্থীদের নাম, জন্মতারিখ, বাসার ঠিকানা, শিক্ষার্থী শনাক্তকরণ নম্বর এবং পরীক্ষার ফলাফল থাকতে পারে। কিছু নথিতে বিদ্যালয়ের নাম, শ্রেণি, ভাষাগত দক্ষতা, বিশেষ শিক্ষাসহায়তা গ্রহণের অবস্থা এবং অন্যান্য শিক্ষাসংক্রান্ত তথ্যও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। তবে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর সব তথ্য চুরি হয়েছে, এমন দাবি করেনি কর্তৃপক্ষ।
এই ঘটনার গুরুত্ব শুধু আক্রান্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না। শিশু ও কিশোরদের ব্যক্তিগত তথ্য দীর্ঘ সময় ধরে তাদের পরিচয় শনাক্ত করতে ব্যবহার করা সম্ভব। নাম, জন্মতারিখ, বাসার ঠিকানা এবং শিক্ষার্থী শনাক্তকরণ নম্বর একত্রে অপরাধীদের জন্য প্রতারণার সুযোগ তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে অভিভাবকেরা অনেক সময় বুঝতে পারেন না যে তাঁদের সন্তানের তথ্য কোথাও চুরি হয়েছে কি না। ফলে ভবিষ্যতে ভুয়া পরিচয় তৈরি, প্রতারণামূলক যোগাযোগ কিংবা ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
তবে কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এই ঘটনায় সামাজিক নিরাপত্তা নম্বর, আর্থিক হিসাবের তথ্য, ব্যাংক বা লেনদেনের কার্ডের তথ্য এবং হিসাবের গোপন সংকেত চুরি হওয়া নথির অন্তর্ভুক্ত ছিল না। অভিভাবকদের ব্যক্তিগত তথ্যও আক্রান্ত নথিতে অন্তর্ভুক্ত ছিল না বলে জানানো হয়েছে।
তবুও এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চুরি না হওয়ার অর্থ এই নয় যে ক্ষতির আশঙ্কা পুরোপুরি শেষ হয়ে গেছে। শিক্ষার্থীর জন্মতারিখ, ঠিকানা এবং পরিচয় শনাক্তকরণ নম্বরের মতো তথ্য ব্যবহার করেও প্রতারণার চেষ্টা করা সম্ভব। তাই পরিবারগুলোকে অচেনা ফোন, বার্তা কিংবা ইমেইলের ব্যাপারে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বিদ্যালয়ের পরীক্ষা, শিক্ষার্থীর পরিচয় যাচাই কিংবা তথ্য সুরক্ষার নামে কেউ ব্যক্তিগত তথ্য চাইলে আগে তার পরিচয় নিশ্চিত করা উচিত।
ক্যালিফোর্নিয়ার শিক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের শনাক্ত করে পরিবারগুলোর কাছে বিজ্ঞপ্তি পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে কেউ বিজ্ঞপ্তি না পেলেই তাঁর সন্তানের তথ্য নিরাপদ রয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। ঠিকানা পরিবর্তন, পুরোনো যোগাযোগের তথ্য কিংবা অন্যান্য কারণে বিজ্ঞপ্তি পৌঁছাতে দেরি হতে পারে। তাই পরিবারগুলোকে সরকারি তথ্য যাচাই করতে এবং প্রয়োজনে সহায়তা কেন্দ্রে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য দুই বছরের বিনামূল্যের পরিচয় সুরক্ষা সেবা দেওয়া হচ্ছে। অপ্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে মা-বাবা বা আইনগত অভিভাবককে আবেদন করতে হবে। প্রাপ্তবয়স্ক ও সাবেক শিক্ষার্থীরা নিজেদের জন্য নির্ধারিত সেবায় আবেদন করতে পারবেন। নিবন্ধনের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সরকারি নির্দেশনা যাচাই করা জরুরি। অপরিচিত কোনো ওয়েবসাইটে ব্যক্তিগত তথ্য জমা দেওয়া উচিত নয়।
এই সেবায় নিবন্ধনের শেষ তারিখ ২০২৭ সালের ১৯ মার্চ। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর হাতে আবেদন করার জন্য এখনো সময় রয়েছে। তবে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা না করে দ্রুত যোগ্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া ভালো। নিবন্ধনের সময় কোনো অর্থ বা অপ্রয়োজনীয় আর্থিক তথ্য চাওয়া হলে সতর্ক থাকতে হবে।
এ বিষয়ে সহায়তার জন্য নির্ধারিত ফোন নম্বর ৮৩৩-৯৩১-৮৪৮৮। যুক্তরাষ্ট্রের প্রশান্ত মহাসাগরীয় সময় অনুযায়ী, সোমবার থেকে শুক্রবার সকাল ছয়টা থেকে সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত এই নম্বরে যোগাযোগ করা যাবে। ফোন করার আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে দেওয়া নির্দেশনা দেখে নেওয়া উচিত, যাতে সঠিক বিভাগ থেকে সহায়তা পাওয়া যায়।
তথ্য চুরির ঘটনা শনাক্ত হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যালোচনা এবং জোরদারের উদ্যোগ নিয়েছে। অননুমোদিত প্রবেশের পথ বন্ধ করা, তথ্য আদান-প্রদানের ব্যবস্থা সুরক্ষিত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা উন্নত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চুরি হওয়া তথ্য প্রকাশ্যে ছড়িয়ে পড়েছে এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে এর অর্থ এই নয় যে ভবিষ্যতে তথ্যের অপব্যবহারের কোনো আশঙ্কা নেই।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, পরিবারগুলোর উচিত শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্যসংক্রান্ত অস্বাভাবিক যোগাযোগের রেকর্ড রাখা, সন্দেহজনক বার্তার জবাব না দেওয়া এবং কোনো সংযোগে প্রবেশ করার আগে তার সত্যতা যাচাই করা। প্রাপ্তবয়স্করা নিজেদের ঋণসংক্রান্ত প্রতিবেদন পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। অপ্রাপ্তবয়স্কদের পরিচয় ব্যবহার করে অননুমোদিত হিসাব খোলা হয়েছে কি না, সে বিষয়েও অভিভাবকেরা সতর্ক থাকতে পারেন।
এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠানের কাছে সংরক্ষিত শিশুদের তথ্য সুরক্ষিত রাখা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। শুধু শক্তিশালী প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা থাকলেই যথেষ্ট নয়; প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত নিরাপত্তা পরীক্ষা এবং দ্রুত ঘটনার খবর জানানোও জরুরি। তদন্তের ফলাফল এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে আরও তথ্য প্রকাশিত হলে পরিবারগুলো পরিস্থিতি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাবে।
আপাতত ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সরকারি নির্দেশনা যাচাই করা, বিনামূল্যের সুরক্ষা সেবার যোগ্যতা পরীক্ষা করা এবং ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহারের সম্ভাবনা সম্পর্কে সতর্ক থাকা। পরিচিত কোনো পরিবারের সন্তান ক্যালিফোর্নিয়ার সরকারি বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে থাকলে তাদেরও বিষয়টি জানানো যেতে পারে, যাতে তারা সময়মতো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারে।





