ইরান যুদ্ধে ন্যাটোকে পরীক্ষা, আলোচনার উপযুক্ত পক্ষ খুঁজে পাচ্ছেন না প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প
ইরান যুদ্ধে ন্যাটোর সহায়তা চেয়ে মিত্রদের অবস্থান যাচাইয়ের দাবি ট্রাম্পের; দেশটির নেতৃত্ব ও আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা।
ক্যাপশন: ইরান যুদ্ধে ন্যাটোর সহায়তা চেয়ে মিত্রদের অবস্থান যাচাইয়ের দাবি ট্রাম্পের; দেশটির নেতৃত্ব ও আলোচনার সম্ভাবনা নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন অনিশ্চয়তা।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুদ্ধে উত্তর আটলান্টিক সামরিক জোটের সদস্যদেশগুলো সহায়তা করবে কি না, তা যাচাই করতেই তিনি তাদের কাছে সহযোগিতা চেয়েছিলেন। তাঁর দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের ওই সহায়তার প্রয়োজন ছিল না। একই বক্তব্যে তিনি ইরানের নেতৃত্বের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কথা উল্লেখ করে দেশটির সঙ্গে কার মাধ্যমে আলোচনা করবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা প্রকাশ করেন। তবে তাঁর বক্তব্যের সব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য নয়।
সোমবার, ১৯ অক্টোবর, যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস অঙ্গরাজ্যের পার্ক সিটিতে রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালের পক্ষে নির্বাচনী সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় ট্রাম্প এসব কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যের প্রকাশিত প্রতিলিপিতে দেখা যায়, ইরান বিষয়ে সহায়তা চাওয়াকে তিনি ন্যাটোর সদস্যদেশগুলোর মনোভাব যাচাইয়ের একটি উপায় হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি অভিযোগ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের আহ্বানে মিত্ররা প্রত্যাশিতভাবে সাড়া দেয়নি। বক্তব্যের এই অংশের সত্যতা প্রতিলিপির মাধ্যমে নিশ্চিত করা গেলেও, যুক্তরাষ্ট্রের প্রকৃতপক্ষে সহায়তার প্রয়োজন ছিল না—এটি ট্রাম্পের নিজস্ব দাবি।
ন্যাটোর প্রতি ট্রাম্পের অসন্তোষ নতুন নয়। দীর্ঘদিন ধরে তিনি জোটের সদস্যদেশগুলোর প্রতিরক্ষা ব্যয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তাদের নিরাপত্তানির্ভরতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে আসছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র মিত্রদেশগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিপুল অর্থ ব্যয় করে। তাই সংকটের সময় অন্য দেশগুলোর কাছ থেকেও সমপরিমাণ সহযোগিতা প্রত্যাশা করে ওয়াশিংটন। ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে তাঁর সাম্প্রতিক মন্তব্য সেই পুরোনো বিরোধকে আবার সামনে এনেছে।
তবে ন্যাটোর আনুষ্ঠানিক অবস্থান এবং ট্রাম্পের অভিযোগের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। গত ৩ মার্চ জোটের মহাসচিব মার্ক রুটে স্পষ্ট করেছিলেন, ন্যাটো প্রতিষ্ঠান হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিষয়ক সামরিক অভিযানে সরাসরি অংশ নিচ্ছে না। একই সঙ্গে তিনি জানান, কয়েকটি সদস্যদেশ ঘাঁটি ব্যবহারের সুযোগ, রসদ ও অন্যান্য সহায়তার মাধ্যমে ভূমিকা রাখছে। অর্থাৎ জোট হিসেবে সরাসরি যুদ্ধে অংশ না নেওয়া এবং সদস্যদেশগুলোর সব ধরনের সহযোগিতা প্রত্যাখ্যান করা এক বিষয় নয়।
ন্যাটোর প্রতিষ্ঠাকালীন চুক্তির পঞ্চম অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সদস্যদেশের ওপর সশস্ত্র হামলাকে সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে যুক্তরাষ্ট্র কোনো দেশে সামরিক অভিযান শুরু করলে অন্য সদস্যদেশগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে তাতে যোগ দিতে হবে। ইরানের বিরুদ্ধে অভিযানে ন্যাটোর সরাসরি অংশগ্রহণ না করার বিষয়টি তাই জোটের সম্মিলিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়।
ট্রাম্পের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ইরানের নেতৃত্ব নিয়ে তাঁর দাবি। তিনি বলেন, দেশটির প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ের নেতাদের অনেকে নিহত হয়েছেন এবং তৃতীয় পর্যায়ের নেতৃত্বেরও একটি অংশ আর নেই। এ কারণে আলোচনার জন্য উপযুক্ত ব্যক্তিকে খুঁজে পাওয়া কঠিন বলে তিনি মন্তব্য করেন। তবে এই বক্তব্য থেকে ইরানের পুরো নেতৃত্বব্যবস্থা নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
রয়টার্সের ৬ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনের হামলায় নিহত হন। পরবর্তী সময়ে তাঁর ছেলে মোজতবা খামেনি উত্তরসূরি হন বলে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তিনি হামলায় আহত হয়েছিলেন বলেও খবর রয়েছে। তাঁর প্রকাশ্য উপস্থিতি সীমিত থাকায় দেশটির নেতৃত্বের কার্যক্রম নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তবে নেতৃত্বের পরিবর্তন বা শীর্ষ নেতাদের নিহত হওয়া মানেই রাষ্ট্র পরিচালনার সব ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, এমন নয়।
ইরানের পক্ষ থেকেও ট্রাম্পের বক্তব্যের বিপরীত অবস্থান প্রকাশ করা হয়েছে। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই এর আগে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র জানে ইরানের সঙ্গে কারা আলোচনা করতে পারেন এবং দেশটির সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো কীভাবে কাজ করে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আলোচনার পথে বাধা শুধু উপযুক্ত প্রতিনিধিকে খুঁজে পাওয়া নয়; যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের পরস্পরবিরোধী অবস্থান ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ বার্তাও পরিস্থিতিকে জটিল করছে।
ইরান যুদ্ধের প্রভাব সামরিক ক্ষেত্রের বাইরেও ছড়িয়ে পড়েছে। সংঘাতের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ ও দামের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিও প্রভাবিত হতে পারে।
এ অবস্থায় ইরানের সঙ্গে সমঝোতার জন্য কার্যকর আলোচনাপ্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সম্ভাব্য আলোচনায় যুদ্ধ বন্ধের শর্ত, পারমাণবিক কর্মসূচি, নিরাপত্তার নিশ্চয়তা, নিষেধাজ্ঞা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো বিষয় সামনে আসতে পারে। সামরিক অভিযানে নেতৃত্বের পরিবর্তন ঘটলেও রাজনৈতিক সমাধানের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় না।
কানসাসে ট্রাম্পের বক্তব্য ন্যাটোর প্রতি তাঁর অসন্তোষ এবং ইরানের সঙ্গে আলোচনার জটিলতা সম্পর্কে তাঁর অবস্থান তুলে ধরেছে। ন্যাটোকে পরীক্ষা করার দাবি তাঁর বক্তব্যের প্রতিলিপিতে সমর্থিত। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার কোনো প্রয়োজন ছিল না কিংবা ইরানের নেতৃত্ব কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে এসব বক্তব্যকে স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে সামরিক পরিস্থিতি, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপর।





