সরাসরি মানচিত্র, পূর্বাভাস ও জরিপের গড়: PoliAgg (CC BY-SA 4.0)

পূর্ণ ফলাফল, মানচিত্র ও জরিপ
ব্রেকিং
যুক্তরাষ্ট্রের ৭ কোটি শিশুকে স্পেসএক্সের শেয়ার উপহারের ঘোষণা ইলন মাস্কের, মূল্য প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারধর্ম বদলেছে, বেঁচে গেছে ইতিহাস—যুক্তরাষ্ট্রে গির্জা থেকে মসজিদ হওয়ার অনন্য কাহিনিমধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার আগুন, বিশ্ববাজারে ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছাল জ্বালানি তেলের দামহিজাব বিতর্কে শিক্ষিকার বিদায়, কান্নায় ভাসল বাকুর বিদ্যালয়, ভাইরাল হৃদয়বিদারক দৃশ্যমার্কিন নাগরিককে মাটিতে ফেলে আটক, ফেডারেল কর্মকর্তাদের ঘিরে প্রতিবাদে ফেটে পড়লেন প্রতিবেশীরা

ধর্ম বদলেছে, বেঁচে গেছে ইতিহাস—যুক্তরাষ্ট্রে গির্জা থেকে মসজিদ হওয়ার অনন্য কাহিনি

নিউইয়র্কের ইউটিকায় পরিত্যক্ত মেথডিস্ট গির্জা কিনে সংস্কার করেন বসনীয় মুসলিমরা; আজ ভবনটি উপাসনা, শিক্ষা ও সম্প্রদায়ের মিলনস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

ধর্ম বদলেছে, বেঁচে গেছে ইতিহাস—যুক্তরাষ্ট্রে গির্জা থেকে মসজিদ হওয়ার অনন্য কাহিনি
ধর্ম বদলেছে, বেঁচে গেছে ইতিহাস—যুক্তরাষ্ট্রে গির্জা থেকে মসজিদ হওয়ার অনন্য কাহিনি

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের ইউটিকা শহরে ধর্মীয় সম্প্রীতি, ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ এবং অভিবাসী সম্প্রদায়ের ঐক্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে একটি পুরোনো গির্জা। একসময় খ্রিষ্টানদের উপাসনালয় হিসেবে ব্যবহৃত ভবনটি দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকার পর বসনীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের উদ্যোগে মসজিদে রূপান্তরিত হয়। নিজেদের উপাসনার স্থান গড়ে তোলার পাশাপাশি ভবনটিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করে নতুনভাবে ব্যবহারযোগ্য করে তোলেন তাঁরা। ঘটনাটি শুধু একটি ভবনের পরিবর্তনের ইতিহাস নয়; বরং নতুন দেশে আশ্রয় নেওয়া মানুষের সংগ্রাম, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং ধর্মীয় সহাবস্থানেরও গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

ঐতিহাসিক নথি অনুযায়ী, ইউটিকার ৩০৬ কোর্ট স্ট্রিটে অবস্থিত ভবনটির নির্মাণকাল ১৮৬৯ সাল। এটি প্রথমে মেথডিস্ট ধারার খ্রিষ্টানদের উপাসনালয় হিসেবে নির্মিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ভবনটি সেন্ট্রাল মেথডিস্ট এপিসকোপাল গির্জা এবং ট্রিনিটি মেথডিস্ট গির্জা নামে পরিচিত ছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ পাওয়া যায়। উনিশ শতকের স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত ভবনটিতে খিলানযুক্ত জানালা, ইটের দেয়াল এবং উঁচু চূড়ার মতো বৈশিষ্ট্য ছিল। দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গির্জাটির নিয়মিত উপাসনায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কমে যায়।

একপর্যায়ে গির্জাটি বন্ধ হয়ে যায় এবং ভবনটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। ২০০৬ সালের দিকে এটি শহর কর্তৃপক্ষের মালিকানায় আসে। দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনটির ছাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বিভিন্ন অংশে পানি জমে থাকার পরিস্থিতি তৈরি হয়। ২০০৮ সালে ভবনটি নিয়ে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়। শহরে বসবাসরত বসনীয় মুসলিমদের একটি সংগঠন সেখানে নিজেদের ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য উপযুক্ত স্থান খুঁজছিল। সেই প্রয়োজন থেকেই বসনীয় ইসলামি সমিতি ভবনটি কেনার উদ্যোগ নেয়।

২০০৮ সালের মার্চে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, শহর কর্তৃপক্ষের মালিকানাধীন ভবনটি বিক্রির বিষয়ে আলোচনা চলছিল। সে সময় ইউটিকার মেয়র ডেভিড রোফারোও প্রস্তাবটি নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। পরিত্যক্ত ভবনটি ভেঙে ফেলার পরিবর্তে নতুন কাজে ব্যবহার করা গেলে শহরের ব্যয় কমানো এবং একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রয়োজন পূরণ দুই লক্ষ্যই অর্জন সম্ভব ছিল। পরবর্তী সময়ে বসনীয় ইসলামি সমিতি ভবনটি কিনে নেয়। সংগঠনটির নিজস্ব পরিচিতিমূলক বিবরণেও ২০০৮ সালে ৩০৬ কোর্ট স্ট্রিটের গির্জাটি কেনার তথ্য রয়েছে।

বসনীয় মুসলিমদের এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে বলকান অঞ্চলের যুদ্ধ ও বাস্তুচ্যুতির ইতিহাস। ১৯৯০-এর দশকে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনায় সংঘাতের কারণে বহু মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমান। তাঁদের একটি অংশ যুক্তরাষ্ট্রের ইউটিকায় এসে বসবাস শুরু করেন। নতুন দেশে জীবন গড়ে তোলার পাশাপাশি সন্তানদের শিক্ষা, পারিবারিক নিরাপত্তা, সামাজিক যোগাযোগ এবং ধর্মীয় পরিচয় বজায় রাখার প্রয়োজন ছিল তাঁদের। একটি নিজস্ব মসজিদ প্রতিষ্ঠা সেই প্রয়োজন পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

২০১২ সালের ৩১ মে প্রকাশিত একটি সংবাদ প্রতিবেদনে ভবনটির সংস্কারকাজের বিস্তারিত উঠে আসে। তখন স্বেচ্ছাসেবীরা পুরোনো ভবনের বাইরের অংশে পরিবর্তন আনছিলেন। লাল ইটের দেয়ালের ওপর নতুন আবরণ ও ধূসর রঙের প্রলেপ দেওয়া হচ্ছিল। আগের গির্জার উঁচু চূড়াটিকেও মসজিদের নতুন পরিচয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়। ভবনের ভেতরে নামাজের কক্ষ সংস্কার করা হয়, পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষ, খাবার পরিবেশনের স্থান এবং শৌচাগার উন্নয়নের কাজও চলছিল। অর্থাৎ প্রকল্পটি শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যবর্ধনে সীমাবদ্ধ ছিল না; ভবনটিকে ব্যবহারযোগ্য ও নিরাপদ করে তোলাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।

এই সংস্কারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল স্থানীয় মানুষের স্বেচ্ছাশ্রম ও আর্থিক সহযোগিতা। বসনীয় সম্প্রদায়ের সদস্যরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী অর্থ দিয়েছেন এবং নির্মাণকাজে অংশ নিয়েছেন। ২০১২ সালের প্রতিবেদনে সে সময় সংস্কারের জন্য প্রায় এক লাখ ষাট হাজার মার্কিন ডলার ব্যয়ের একটি প্রাথমিক হিসাব উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে এটি ছিল ওই সময়ের হিসাব; পরবর্তী বছরগুলোতে প্রকল্পের মোট ব্যয় কত দাঁড়িয়েছে, তা একই অঙ্ক ধরে বলা ঠিক হবে না। বিভিন্ন পরবর্তী বিবরণে সংস্কারকাজের ব্যয় আরও বেশি হওয়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে নির্দিষ্ট চূড়ান্ত ব্যয় সম্পর্কে একক, হালনাগাদ হিসাব নিশ্চিত করা কঠিন।

ভবনটির পরিবর্তনের সময় আগের ধর্মীয় পরিচয়ের স্মৃতিচিহ্নগুলোর প্রতিও সম্মান দেখানোর নজির পাওয়া যায়। ২০১২ সালের মে মাসে বসনীয় ইসলামি সমিতি একটি গির্জার ঘণ্টা ও খ্রিষ্টান ক্রুশ হোয়াইটসবোরোর একটি মেথডিস্ট গির্জার কাছে হস্তান্তর করে। এ ঘটনাকে দুই ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে সৌহার্দ্যের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছিল। পুরোনো উপাসনালয়কে নতুন কাজে ব্যবহার করা হলেও আগের সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত সামগ্রী যথাযথভাবে অন্য উপাসনালয়ে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

বর্তমানে ভবনটি বসনীয় ইসলামি সমিতির মসজিদ হিসেবে পরিচিত। এখানে মুসলিমরা নামাজ আদায় করেন এবং সম্প্রদায়ভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পান। এটি ইউটিকার বসনীয় মুসলিমদের ধর্মীয় পরিচয় ও সামাজিক বন্ধন বজায় রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। তবে এই একটি মসজিদই শহরের সব মুসলিমের একমাত্র উপাসনালয় এমন দাবি করা যথার্থ নয়; ইউটিকায় আরও মসজিদ ও ইসলামি কেন্দ্র রয়েছে।

ঘটনাটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ মানেই সব সময় সেটিকে আগের ব্যবহারেই ফিরিয়ে নিতে হবে, এমন নয়। যথাযথ পরিকল্পনা, সংস্কার এবং স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ থাকলে পুরোনো ভবন নতুন সামাজিক প্রয়োজনেও কাজে লাগানো যায়। এ ক্ষেত্রে গির্জাটি ভেঙে ফেলার পরিবর্তে মসজিদে রূপান্তরিত হওয়ায় ভবনটির অস্তিত্ব টিকে থাকে এবং নতুন একটি সম্প্রদায় প্রয়োজনীয় উপাসনাস্থল পায়।

তবে এই ঘটনাকে সব ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে মতবিরোধহীন সম্পর্কের চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করাও ঠিক হবে না। বরং যাচাইযোগ্য ঘটনাগুলো দেখায়, একটি পরিত্যক্ত ধর্মীয় স্থাপনা নতুনভাবে ব্যবহার করার সময় আলোচনা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, স্বেচ্ছাশ্রম এবং ঐতিহ্যের প্রতি দায়িত্বশীলতা ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। ইউটিকার এই ভবনের ইতিহাস তাই শুধু গির্জা থেকে মসজিদে রূপান্তরের গল্প নয়; এটি একই শহরে ভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মানুষের পাশাপাশি বসবাস, নতুন করে ঘর গড়ে তোলা এবং পুরোনো স্থাপনাকে ভবিষ্যতের জন্য বাঁচিয়ে রাখার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত।


ট্যাগ: ইউটিকাবসনীয়মুসলিমমসজিদঐতিহাসিকস্থাপনাধর্মীয়সম্প্রীতিমানবিকতাঅভিবাসীজীবন

প্রতিবেদক

CSB News USA

ফটোকার্ড তৈরি হচ্ছে…

সিএসবি নিউজ ইউএসএ ফলো করুন

প্রতিদিন সকালে প্রধান সংবাদ, আর ব্রেকিং নিউজ ঘটার সাথে সাথে। বিনামূল্যে।