দাঙ্গা-লুটপাটের পর ফ্রান্সের একাধিক শহরে আংশিক কারফিউ জারি, নিরাপত্তা সংকটে সরকার
ফ্রান্সে বিক্ষোভের আড়ালে দাঙ্গা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটে বিপর্যস্ত জনজীবন; পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরের নির্দিষ্ট এলাকায় রাতের কারফিউ জারি।
ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং শিক্ষাব্যবস্থার সংকট ঘিরে শুরু হওয়া বিক্ষোভ সহিংস দাঙ্গা ও ব্যাপক লুটপাটে রূপ নেওয়ার পর দেশটির বিভিন্ন শহরের নির্দিষ্ট এলাকায় কারফিউ জারি করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসনকে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে সরকার। রাজধানী প্যারিসসহ একাধিক শহরে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, দোকানপাটে ভাঙচুর এবং সরকারি স্থাপনায় হামলার ঘটনায় জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের ১৯ ও ২০ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুতর অস্থিরতার মুখে পড়েছে ফ্রান্স। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গোটা দেশে একযোগে সর্বাত্মক কারফিউ জারি করা হয়নি। বরং পরিস্থিতি বিবেচনায় নির্দিষ্ট এলাকা ও সময়ের জন্য চলাচল এবং জনসমাবেশে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
রাজধানী প্যারিসে সোমবার রাতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। পুলিশের নির্দেশনায় শহরের প্রজাতন্ত্র চত্বর এবং লে আল এলাকার মতো সহিংসতা ও লুটপাটে ক্ষতিগ্রস্ত স্থানে রাতের কারফিউ কার্যকর করার কথা জানানো হয়। নির্ধারিত নির্দেশনা অনুযায়ী, সোমবার রাত ১১টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ওই এলাকাগুলোতে প্রবেশ ও অবস্থানে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। একই সঙ্গে সন্ধ্যা ৮টা থেকে নির্দিষ্ট এলাকায় সমাবেশ ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়। এসব ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল নতুন করে সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাট ঠেকানো।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু সোমবার বলেন, জনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, প্রয়োজন অনুযায়ী স্থানীয় ও সীমিত পরিসরে কারফিউ আরোপ করা হবে। তবে গোটা প্যারিসে রাতভর চলাচল বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে জরুরি অবস্থা ঘোষণার সম্ভাবনাও পুরোপুরি নাকচ করেননি তিনি।
সাম্প্রতিক অস্থিরতার পেছনে রয়েছে একাধিক সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ। কয়েক সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট, অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, জরাজীর্ণ ভবন এবং পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণের অভাবের প্রতিবাদ জানিয়ে আসছিলেন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির দাম, সরকারি পরিষেবায় বিনিয়োগের ঘাটতি এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা। এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থী, শ্রমিক ও বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর অংশগ্রহণে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
প্রথমদিকে অনেক স্থানে বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরে কিছু এলাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। সংঘবদ্ধ কিছু ব্যক্তি দোকানের কাচ ভেঙে পণ্য লুট করে, রাস্তায় আগুন জ্বালায় এবং সরকারি স্থাপনায় হামলা চালায়। বিভিন্ন শহরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। এতে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয় এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, লিল, মার্সেই, লিয়োঁ, নিসসহ বিভিন্ন শহরে নিরাপত্তা জোরদার এবং স্থানীয় বিধিনিষেধ আরোপের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে সব শহরে একই ধরনের কারফিউ বা একই সময়সূচি কার্যকর হয়েছে—এমন দাবি সঠিক নয়। কোথাও নির্দিষ্ট এলাকায় রাতের চলাচলে নিষেধাজ্ঞা, কোথাও অপ্রাপ্তবয়স্কদের চলাচলে বিধিনিষেধ, আবার কোথাও সমাবেশের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে।
লিমোজ শহরের ঐতিহাসিক নগর ভবনে অগ্নিসংযোগের ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করেছে। লিয়োঁ শহরের পর্যটন দপ্তরের ভবনও আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় দোকানপাটের ক্ষয়ক্ষতি, পোড়া যানবাহন এবং রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কারে প্রশাসনকে কাজ করতে হচ্ছে।
ফরাসি কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য উদ্ধৃত করে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সহিংসতার ঘটনায় প্রায় দুই হাজার চার শ মানুষকে আটক করা হয়েছে। প্রায় তিন হাজার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। তবে আটক ব্যক্তির সংখ্যা, আহত ব্যক্তির হিসাব এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। তাই এগুলোকে চূড়ান্ত হিসাব হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ ন্যুনেজ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনার মুখে পদত্যাগের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সেই প্রস্তাব গ্রহণ করেননি। বরং নিরাপত্তা পরিস্থিতি উন্নত করা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের ঘাটতি পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
এদিকে বিভিন্ন শহরের মেয়র ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের মতে, ব্যাপক বিক্ষোভের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নিরাপত্তা বাহিনীর প্রস্তুতি পর্যাপ্ত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। অন্যদিকে সরকার বলছে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ করার অধিকার বজায় রেখেই সহিংসতা, অগ্নিসংযোগ, হামলা এবং লুটপাটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু পুলিশ মোতায়েন কিংবা কারফিউ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ, মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা, জ্বালানির ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী ও সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বজায় রাখাও গুরুত্বপূর্ণ।
ফ্রান্সে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করলেও সামাজিক অসন্তোষের মূল কারণগুলো এখনো গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। আগামী দিনগুলোতে নতুন বিক্ষোভ, শ্রমিকদের কর্মসূচি এবং প্রশাসনের সিদ্ধান্ত পরিস্থিতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেদিকে নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের। কারফিউয়ের নির্দিষ্ট সময় ও এলাকা সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রশাসনের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুসরণ করাই এ মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।





