যুক্তরাষ্ট্রে বৈচিত্র্যমূলক স্কুল ভর্তি নীতি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে নতুন আইনি লড়াই শুরু হচ্ছে
মেরিল্যান্ডের একটি সরকারি স্কুলের লটারি-ভিত্তিক ভর্তি পদ্ধতিকে চ্যালেঞ্জ করে নতুন মামলা শুনতে সম্মত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত, যা শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈচিত্র্য নীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের মন্টগোমারি কাউন্টির বিশেষায়িত সরকারি মধ্যবিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তির নীতি নিয়ে নতুন একটি মামলা শুনতে সম্মত হয়েছে। মামলাটির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে লটারিভিত্তিক ভর্তি পদ্ধতি, শিক্ষার্থীদের সমান সুযোগ এবং জাতিগত বৈষম্যের অভিযোগ। এই মামলার ফলাফল যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের ভর্তি ও বৈচিত্র্য নিশ্চিত করার নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
মন্টগোমারি কাউন্টির বিশেষায়িত বিদ্যালয়গুলোতে গণিত, বিজ্ঞান, মানবিক বিদ্যা এবং অন্যান্য বিষয়ে উন্নত শিক্ষার সুযোগ রয়েছে। এসব কর্মসূচিতে ভর্তি হওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা থাকে। ফলে কারা এই সুযোগ পাবে এবং কীভাবে শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হবে, তা নিয়ে অভিভাবক ও শিক্ষা কর্তৃপক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলছে।
মামলাটি করেছে শিক্ষায় ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার দাবিতে গঠিত একটি অভিভাবক সংগঠন। সংগঠনটির অভিযোগ, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের পরিবর্তিত ভর্তি নীতি সরাসরি জাতিগত পরিচয় বিবেচনা না করলেও বাস্তবে এশীয় বংশোদ্ভূত মার্কিন শিক্ষার্থীদের সুযোগ কমিয়ে কৃষ্ণাঙ্গ ও লাতিনো শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছে। তবে এটি মামলাকারীদের অভিযোগ; আদালত এখনো এ অভিযোগের সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি।
বিতর্কের সূত্রপাত শিক্ষার্থী নির্বাচনের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনার মধ্য দিয়ে। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আগের ব্যবস্থায় পরীক্ষা ও অন্যান্য শিক্ষাগত মূল্যায়নের মাধ্যমে বিশেষায়িত কর্মসূচির জন্য শিক্ষার্থী নির্বাচন করা হতো। করোনা মহামারির সময় সরাসরি পরীক্ষা নেওয়ার অসুবিধা দেখা দিলে কর্তৃপক্ষ বিকল্প পদ্ধতি গ্রহণ করে। নতুন ব্যবস্থায় শিক্ষাগত যোগ্যতার পাশাপাশি লটারির মাধ্যমে আসন বণ্টনের ব্যবস্থা রাখা হয়।
এই পদ্ধতিতে লটারিতে অংশ নেওয়ার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রথমে নির্ধারিত যোগ্যতা পূরণ করতে হয়। এরপর যোগ্য শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে ভর্তির সুযোগ দেওয়া হয়। শিক্ষার্থীরা যে বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে, সেই বিদ্যালয়ের শিক্ষাগত পরিবেশ এবং আর্থসামাজিক পরিস্থিতিও মূল্যায়নের অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। কর্তৃপক্ষের মতে, এর মাধ্যমে বিভিন্ন আর্থসামাজিক পটভূমির শিক্ষার্থীদের জন্য উন্নত শিক্ষার সুযোগ বাড়ানো সম্ভব।
মামলাকারীদের আপত্তি হলো, শিক্ষার্থীদের নিজস্ব বিদ্যালয়ের ফলাফল ও আর্থসামাজিক অবস্থার ভিত্তিতে তুলনা করার পদ্ধতি কিছু শিক্ষার্থীর জন্য অতিরিক্ত বাধা তৈরি করতে পারে। তাদের দাবি, এশীয় বংশোদ্ভূত অনেক শিক্ষার্থী তুলনামূলকভাবে ভালো ফলাফলের বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে। ফলে নতুন ব্যবস্থার প্রভাব তাদের ওপর অসমভাবে পড়তে পারে।
অন্যদিকে, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের বক্তব্য হলো, নতুন পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের জাতিগত পরিচয়কে সরাসরি বিবেচনা করা হয় না। তাদের দাবি, এই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য হলো ভর্তি প্রক্রিয়ায় আরও বেশি শিক্ষার্থীকে সুযোগ দেওয়া এবং বিভিন্ন আর্থসামাজিক অবস্থার শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো। ফলে মামলাটির মূল প্রশ্ন হচ্ছে, জাতিগতভাবে নিরপেক্ষ বলে বিবেচিত কোনো নীতির ফলাফল নিয়ে বৈষম্যের অভিযোগ উঠলে আদালত কীভাবে সেটি মূল্যায়ন করবে।
এর আগে নিম্ন আদালতগুলো মামলাটি খারিজ করে দিয়েছিল। তাদের বিবেচনায়, মামলাকারীরা এমন যথেষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি, যা দিয়ে বোঝানো যায় যে নীতিটি এশীয় বংশোদ্ভূত শিক্ষার্থীদের ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছে অথবা তাদের ওপর বৈষম্যমূলক প্রভাব ফেলেছে। নিম্ন আদালতের পর্যবেক্ষণে শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক প্রতিনিধিত্বের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে মামলাটি আপিল আদালতেও যায়। সেখানেও নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল রাখা হয়। এরপর অভিভাবক সংগঠনটি যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়। সর্বোচ্চ আদালত মামলাটি গ্রহণ করলেও এর অর্থ এই নয় যে আদালত ইতিমধ্যে ভর্তি নীতিকে অবৈধ ঘোষণা করেছে। বরং আদালত এখন মামলাটির নির্দিষ্ট আইনি প্রশ্নের ওপর শুনানি করতে সম্মত হয়েছে।
সেই প্রশ্নটি হলো, কোনো ভর্তি নীতি বাহ্যিকভাবে জাতিগতভাবে নিরপেক্ষ হলেও সেটি জাতিগত বৈষম্যমূলক উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠলে, অভিযোগকারী পক্ষকে কি অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে আবেদনকারীদের অনুপাতের তুলনায় তাদের গোষ্ঠী সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে? অন্যভাবে বললে, কোনো গোষ্ঠীর শিক্ষার্থীদের মোট প্রতিনিধিত্ব আবেদনকারীদের তুলনায় কম না হলেও অন্য প্রমাণের ভিত্তিতে বৈষম্যের অভিযোগ আদালতে বিবেচনা করা যাবে কি না, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
এই মামলার গুরুত্ব আরও বেড়েছে ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি সংক্রান্ত ঐতিহাসিক রায়ের কারণে। সে সময় আদালত হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও নর্থ ক্যারোলাইনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতিগত পরিচয় বিবেচনাকারী ভর্তি কর্মসূচির বিরুদ্ধে রায় দিয়েছিল। তবে বর্তমান মামলাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবর্তে সরকারি মধ্যবিদ্যালয়ের বিশেষায়িত কর্মসূচি নিয়ে। তাই আগের রায়ের প্রভাব থাকলেও দুটি মামলার আইনি ও বাস্তব পরিস্থিতি এক নয়।
শিক্ষা অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন এ বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করেছে। মামলাকারীদের সমর্থকদের বক্তব্য, কোনো নীতি পরোক্ষভাবে জাতিগত বৈষম্য তৈরি করলে শুধু তার প্রকাশ্য ভাষা দেখে বিচার করা যথেষ্ট নয়। অন্যদিকে, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সমর্থকদের মতে, শিক্ষার সুযোগের অসমতা কমাতে এবং আর্থসামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের এগিয়ে আনতে জাতিগত পরিচয়নিরপেক্ষ পদ্ধতি ব্যবহার করা বৈধ ও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
সর্বোচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত শুধু মন্টগোমারি কাউন্টির বিদ্যালয়গুলোর জন্য নয়, যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য সরকারি বিদ্যালয়ের ভর্তি নীতির ক্ষেত্রেও প্রভাব ফেলতে পারে। যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থীদের পারিবারিক আয়, বিদ্যালয়ের পরিবেশ, শিক্ষাগত ফলাফল কিংবা এলাকার আর্থসামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে বৈচিত্র্য বাড়ানোর চেষ্টা করছে, তাদের নীতিও ভবিষ্যতে নতুন আইনি পর্যালোচনার মুখে পড়তে পারে।
তবে আদালত মামলা গ্রহণ করেছে বলেই ভর্তি নীতিকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে, এমনটি ভাবার সুযোগ নেই। মামলার চূড়ান্ত ফলাফল নির্ভর করবে আদালতে উপস্থাপিত আইনি যুক্তি, প্রমাণ এবং সংবিধানের সমান সুরক্ষার বিধান কীভাবে ব্যাখ্যা করা হয় তার ওপর। শুনানির নির্দিষ্ট তারিখ ও চূড়ান্ত রায় সম্পর্কে আদালতের হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে।
এই মামলা যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষার সমান সুযোগ, জাতিগত বৈচিত্র্য এবং বৈষম্য প্রমাণের আইনি মানদণ্ড নিয়ে নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে। সর্বোচ্চ আদালত শেষ পর্যন্ত কী সিদ্ধান্ত দেয়, তা সরকারি বিদ্যালয়গুলোর ভর্তি নীতি এবং শিক্ষার্থীদের সুযোগ বণ্টনের পদ্ধতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।





