ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভের আগুন, প্যারিস-মার্সেইয়ে দাঙ্গা-লুটপাটে চাপে সরকার, বাড়ছে জনঅসন্তোষ
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি ও বিদ্যালয়ের দুরবস্থার প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে মানুষ রাস্তায় নামেন; কয়েকটি শহরে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট এবং গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে।
ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, বিদ্যালয়ের অব্যবস্থাপনা এবং সরকারি পরিষেবার অবনতির প্রতিবাদে দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। রাজধানী প্যারিস থেকে শুরু করে মার্সেই, লিয়োঁ, বোর্দো, লিল ও আরও কয়েকটি শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, দোকানপাটে ভাঙচুর এবং লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভের পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ১৯ অক্টোবর প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটি ফ্রান্সের অন্যতম গুরুতর অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা।
বিক্ষোভের সূচনা হয়েছিল মূলত বিদ্যালয়ের দুরবস্থা নিয়ে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অসন্তোষ থেকে। পরে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, জ্বালানির ব্যয়, ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, মজুরি এবং সরকারি পরিষেবায় অর্থায়নের সংকট আন্দোলনের প্রধান দাবিগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়। ফলে শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ বৃহত্তর সামাজিক অসন্তোষের রূপ নেয়। শ্রমিক সংগঠন, শিক্ষার্থী এবং জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষও এতে অংশ নেন।
বার্তা সংস্থা এপি ও রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবর শনিবার ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বড় আকারের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। ফরাসি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, সেদিন দেশজুড়ে ১১০টি মিছিলে প্রায় পাঁচ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন। অন্যদিকে আয়োজক শ্রমিক সংগঠন ও শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর দাবি, অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় আট লাখ। সরকারি হিসাব ও আয়োজকদের হিসাবের এই পার্থক্য আন্দোলনের ব্যাপকতা সম্পর্কে ধারণা দিলেও প্রকৃত সংখ্যা নিয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
বিক্ষোভের বড় অংশ শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হলেও কয়েকটি স্থানে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। প্যারিসের প্রজাতন্ত্র চত্বরে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করা হয়। কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশকে লক্ষ্য করে বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ করেন। কোথাও গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়, কোথাও দোকানের কাচ ভেঙে পণ্য লুট করা হয়। বিভিন্ন শহরে সরকারি ভবন, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও জনসাধারণের ব্যবহৃত স্থাপনাও হামলার শিকার হয়।
দক্ষিণ ফ্রান্সের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মার্সেইয়েও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে পৌর ভবনে অনুপ্রবেশ, ভাঙচুর এবং বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়। শহরের কয়েকটি এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে অতিরিক্ত সতর্ক অবস্থানে থাকতে হয়। একই সময়ে লিয়োঁ, বোর্দো, লিল ও অন্যান্য শহরেও সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ এবং দোকানপাটে হামলার ঘটনা সামনে আসে।
লিমোজ শহরে পৌর ভবনে আগুন লাগার ঘটনাটি বিশেষভাবে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সরকারি স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। একাধিক শহরে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত যানবাহন, ভাঙা দোকানের কাচ এবং রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কারে কর্মীদের কাজ করতে দেখা যায়। ব্যবসায়ীরা ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করছেন, আর সাধারণ মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন।
১৮ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, শনিবারের অস্থিরতার পর ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানে প্রায় ১ হাজার ২০০ জনকে গ্রেপ্তার এবং দেড় শতাধিক পুলিশ সদস্য আহত হওয়ার তথ্য সামনে আসে। পরবর্তী সময়ে ১৯ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে গ্রেপ্তারের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৪০০-তে পৌঁছানোর কথা জানানো হয়। বিভিন্ন সময়ের হিসাব হওয়ায় এই সংখ্যাগুলোকে একই সময়ের পরিসংখ্যান হিসেবে দেখা উচিত নয়। হতাহতের পূর্ণাঙ্গ ও চূড়ান্ত হিসাবও স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ সহিংসতা ও লুটপাটের নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা, শান্তিপূর্ণভাবে দাবি জানানো মানুষের অসন্তোষকে গুরুত্ব দিতে হবে, কিন্তু সরকারি ভবন ধ্বংস, দোকান লুট কিংবা মানুষের নিরাপত্তা বিপন্ন করার কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। সরকার সহিংসতায় জড়িতদের বিচারের আওতায় আনার অঙ্গীকার করেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট এলাকায় জনসমাবেশ সীমিত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়ও আলোচনায় এসেছে।
সরকারের সামনে এখন দুটি বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অন্যদিকে বিক্ষোভের পেছনে থাকা অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমস্যাগুলোর বাস্তবসম্মত সমাধান করা। শুধু পুলিশ মোতায়েন করে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হলেও বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট, শ্রেণিকক্ষে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, জরাজীর্ণ ভবন এবং পরিবারের ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের মতো সমস্যার সমাধান না হলে অসন্তোষ থেকে যেতে পারে।
বিদ্যালয়ের অবকাঠামো ও শিক্ষকসংকট নিয়ে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত আসন, শিক্ষা উপকরণ এবং শিক্ষকসংকটের বিষয় উঠে এসেছে। শিক্ষকদের কাজের চাপ এবং সরকারি পরিষেবায় বিনিয়োগ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও বিক্ষোভকারীদের ক্ষোভ বাড়িয়েছে। তবে আন্দোলনে অংশ নেওয়া সব মানুষের দাবি এক নয়; শিক্ষার্থী, শ্রমিক, রাজনৈতিক কর্মী ও সাধারণ নাগরিকের উদ্বেগের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
ফ্রান্সে ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে এই অস্থিরতার রাজনৈতিক গুরুত্বও বাড়ছে। বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষগুলো সরকারের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা, অর্থনৈতিক নীতি এবং জনসেবার মান নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। অন্যদিকে সরকার বলছে, সহিংসতা ও লুটপাটের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের দাবি বিবেচনা করা হবে। পরিস্থিতি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে উঠলেও আন্দোলনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
তথ্য যাচাইয়ে এপি, রয়টার্স এবং এএফপির ১৭ থেকে ১৯ অক্টোবরের প্রতিবেদন মিলিয়ে দেখা গেছে, ফ্রান্সের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ, সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে। অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা এবং গ্রেপ্তারের হিসাব সময় ও সূত্রভেদে আলাদা। তাই ঘটনাটিকে বাস্তব ও সাম্প্রতিক বলা গেলেও সব বিক্ষোভকারীকে সহিংসতার জন্য দায়ী করা সঠিক নয়। অধিকাংশ মানুষের শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ এবং সহিংস গোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডকে আলাদা করে দেখা জরুরি।
এখন ফ্রান্সের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সরকার কীভাবে জননিরাপত্তা পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয়, শিক্ষা ও সরকারি পরিষেবার সংকট মোকাবিলা করবে। আলোচনার মাধ্যমে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না গেলে নতুন বিক্ষোভের আশঙ্কা থেকেই যাবে। অন্যদিকে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার রক্ষা এবং সহিংসতার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে সরকারের বড় পরীক্ষা।





