জেলেনস্কিকে সরিয়ে নতুন আলোচক চান ট্রাম্প, ইউক্রেন যুদ্ধের অবসানে বাড়ছে কূটনৈতিক চাপ
রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধে ইউক্রেনের হয়ে অন্য কাউকে আলোচনার দায়িত্ব দেওয়ার পরামর্শ ট্রাম্পের, যা দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে আলোচনার জন্য ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির পরিবর্তে অন্য কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সোমবার, ১৯ অক্টোবর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেন, ইউক্রেনের পক্ষে আলোচনার জন্য নতুন কাউকে বেছে নেওয়ার সময় এসেছে। জেলেনস্কি যুদ্ধ বন্ধে যথেষ্ট সহযোগিতা করছেন না বলেও অভিযোগ করেন তিনি। ট্রাম্পের এই বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যকার সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েনের বিষয়টি সামনে এসেছে।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প বলেন, জেলেনস্কি অনেক আগেই যুদ্ধের সমাধান করতে পারতেন। তাঁর দাবি, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট আগে তাঁর পরামর্শ মেনে নিলে আরও ভালো চুক্তিতে পৌঁছানো সম্ভব হতো। ট্রাম্পের বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে, যুদ্ধ বন্ধের আলোচনায় ইউক্রেনের বর্তমান নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়ে তিনি অসন্তুষ্ট।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ইউক্রেনের পক্ষে অন্য কারও আলোচনার দায়িত্ব নেওয়ার সময় এসেছে। পরে তিনি আবারও বলেন, জেলেনস্কির উচিত হতে পারে অন্য কাউকে আলোচনার দায়িত্ব দেওয়া। তবে তিনি কাকে এই দায়িত্ব দেওয়া উচিত, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো নাম উল্লেখ করেননি। ইউক্রেন সরকার এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন আলোচক নিয়োগ করেছে, এমন তথ্যও পাওয়া যায়নি।
ট্রাম্পের বক্তব্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তিনি জেলেনস্কির বিরুদ্ধে যুদ্ধ বন্ধে অনাগ্রহের অভিযোগ তুলেছেন। তাঁর ভাষ্য, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট পরিস্থিতি সমাধানে খুব বেশি সহায়তা করছেন না এবং তিনি যুদ্ধ থামাতে চান কি না, তা নিয়েও ট্রাম্প সন্দেহ প্রকাশ করেন। ট্রাম্প বলেন, তাঁর লক্ষ্য মানুষের মৃত্যু বন্ধ করা এবং যুদ্ধের অবসান ঘটানো।
তবে জেলেনস্কি সত্যিই যুদ্ধ বন্ধ করতে চান না ট্রাম্পের এই অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ তাঁর বক্তব্যে উপস্থাপিত হয়নি। ফলে এটিকে ট্রাম্পের রাজনৈতিক মূল্যায়ন ও অভিযোগ হিসেবেই দেখা উচিত, প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে নয়।
রাশিয়ার ভূমিকা নিয়েও ট্রাম্পের বক্তব্য আলোচনার জন্ম দিয়েছে। ইউক্রেন পরিস্থিতিতে রাশিয়া খুব বেশি কিছু করছে না বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর এই বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে সামরিক সংঘাত অব্যাহত রয়েছে এবং দুই পক্ষের হামলা ও পাল্টা হামলায় প্রাণহানি ঘটছে।
রাশিয়া ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করে। এরপর থেকে যুদ্ধটি ইউরোপের নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক কূটনীতি, জ্বালানি বাজার এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। যুদ্ধের অবসানে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা ও সমঝোতার উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি।
ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্যের পেছনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের মধ্যে নীতিগত মতপার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। রাশিয়ার বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি সরবরাহ এবং ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দেওয়ার প্রশ্নে দুই পক্ষের অবস্থান নিয়ে মতবিরোধ দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে রাশিয়ার জ্বালানি খাতকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত ইউক্রেনের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
এর আগে ১০ অক্টোবর ট্রাম্প ইউক্রেনের নেতৃত্ব পরিবর্তনের বিষয়েও মন্তব্য করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, এমন নেতৃত্ব প্রয়োজন, যারা রাশিয়ার সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছাতে সক্ষম হবে। এবার তিনি সরাসরি জেলেনস্কিকে আলোচনার দায়িত্ব অন্য কারও হাতে তুলে দেওয়ার পরামর্শ দিলেন। তবে নতুন আলোচক নিয়োগের দাবি এবং ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট পরিবর্তনের দাবি এক বিষয় নয়। সর্বশেষ বক্তব্যে ট্রাম্প মূলত আলোচনার প্রতিনিধিত্ব পরিবর্তনের কথা বলেছেন।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে বলেও ট্রাম্প জানান। যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনের জন্য এ ধরনের তথ্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রুশ বাহিনীর গতিবিধি এবং সম্ভাব্য হামলা সম্পর্কে আগাম ধারণা প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় সহায়তা করতে পারে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত ইউক্রেনীয় নাগরিকদের সাময়িক সুরক্ষার আওতায় দেশটিতে থাকার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করার কথাও বলেছেন তিনি। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ঘোষণা দেননি।
অন্যদিকে, ইউক্রেনের জন্য শান্তি আলোচনার নতুন উদ্যোগও সামনে আসছে। রয়টার্সের ১৯ অক্টোবরের আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ নরওয়েতে ইউক্রেন ও ইউরোপীয় প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিতে পারেন। এরপর রাশিয়া সফর করে প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে আলোচনার পরিকল্পনাও রয়েছে। এসব বৈঠকের লক্ষ্য যুদ্ধ বন্ধে একটি প্রস্তাব তৈরির পথ এগিয়ে নেওয়া। তবে আলোচনার সময়সূচি ও ফলাফল নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ট্রাম্পের বক্তব্যে ইউক্রেনের পক্ষে আলোচক পরিবর্তনের প্রশ্ন সামনে এলেও শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে শুধু আলোচকের পরিবর্তনই যথেষ্ট হবে কি না, তা স্পষ্ট নয়। যুদ্ধ বন্ধের জন্য রাশিয়া ও ইউক্রেনের নিরাপত্তা, ভূখণ্ড, সামরিক অবস্থান এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কের মতো জটিল বিষয়গুলোর সমাধান প্রয়োজন। দুই পক্ষের গ্রহণযোগ্য সমঝোতা ছাড়া স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা কঠিন হতে পারে।
জেলেনস্কিকে ঘিরে ট্রাম্পের সর্বশেষ মন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র-ইউক্রেন সম্পর্কের বিদ্যমান চাপ আরও বাড়াতে পারে। তবে ইউক্রেনের সরকার আলোচক পরিবর্তন করবে কি না, রাশিয়া নতুন শান্তি প্রস্তাবে কীভাবে সাড়া দেবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতা শেষ পর্যন্ত কতটা কার্যকর হবে এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাবনা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বাস্তব পদক্ষেপ, পারস্পরিক সমঝোতা এবং আলোচনার অগ্রগতির ওপর।





