যুক্তরাষ্ট্রের আট অঙ্গরাজ্যে পরীক্ষাগারে তৈরি মাংস নিষিদ্ধ, খাদ্যনিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে বিতর্ক
প্রাণীর কোষ থেকে পরীক্ষাগারে মাংস উৎপাদন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ছে বিতর্ক। আট অঙ্গরাজ্যের বিধিনিষেধ, আদালতের রায় ও খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্নে চাপে পড়েছে নতুন শিল্প।
যুক্তরাষ্ট্রে পরীক্ষাগারে প্রাণীর কোষ থেকে তৈরি মাংসের উৎপাদন ও বিক্রি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রচলিত পশুপালনশিল্পের সুরক্ষা, খাদ্যনিরাপত্তা, ভোক্তার অধিকার এবং নতুন প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে মতবিরোধের মধ্যে একাধিক অঙ্গরাজ্য এ ধরনের মাংসের ওপর নিষেধাজ্ঞা বা সাময়িক স্থগিতাদেশ আরোপ করেছে। তবে দেশজুড়ে এ মাংস নিষিদ্ধ করা হয়নি। অঙ্গরাজ্যভেদে বিধিনিষেধের ধরন ও ব্যাপ্তিও এক নয়।
২০২৪ সালে ফ্লোরিডা প্রথম অঙ্গরাজ্য হিসেবে পরীক্ষাগারে উৎপাদিত মাংসের উৎপাদন, বিক্রি ও বিতরণ নিষিদ্ধ করে। পরে আলাবামাও একই ধরনের পদক্ষেপ নেয়। ২০২৫ সালে মিসিসিপি, মন্টানা ও নেব্রাস্কায় এ খাতের ওপর নিষেধাজ্ঞামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ইন্ডিয়ানা ও টেক্সাসেও দুই বছরের জন্য নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথা উঠে আসে। অন্যদিকে, দক্ষিণ ডাকোটায় ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে পাঁচ বছরের স্থগিতাদেশ কার্যকর হয়েছে, যা ২০৩১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত চলার কথা। ফলে এ প্রযুক্তির বাণিজ্যিক ভবিষ্যৎ এখন অঙ্গরাজ্যগুলোর আইন ও চলমান মামলার ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।
পরীক্ষাগারে তৈরি মাংসকে সাধারণত কোষচাষে উৎপাদিত মাংস বলা হয়। এ পদ্ধতিতে জীবিত প্রাণী থেকে সংগৃহীত কোষ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে বৃদ্ধি করা হয়। বড় ধাতব পাত্রে বিশেষ তাপমাত্রা, পুষ্টি ও অন্যান্য পরিবেশগত শর্ত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কোষের সংখ্যা বাড়ানো হয়। পরে সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করে খাদ্যপণ্য তৈরি করা হয়। প্রচলিত মাংসের মতো দেখতে ও স্বাদযুক্ত পণ্য তৈরির লক্ষ্য থাকলেও উৎপাদনপ্রযুক্তি, ব্যয় এবং ব্যাপক বাণিজ্যিক উৎপাদনের সক্ষমতা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
যুক্তরাষ্ট্রে এ প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের ক্ষেত্রে খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন এবং কৃষি বিভাগের ভূমিকা রয়েছে। ২০২২ সালের নভেম্বরে ইউপসাইড ফুডসের কোষচাষে তৈরি মুরগির উপাদান নিয়ে প্রথম পরামর্শমূলক মূল্যায়ন সম্পন্ন করে খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন। ২০২৩ সালের মার্চে গুড মিটের ক্ষেত্রেও একই ধরনের মূল্যায়ন শেষ হয়। এরপর ২০২৩ সালের জুনে কৃষি বিভাগ প্রথমবারের মতো দুটি প্রতিষ্ঠানের কোষচাষে উৎপাদিত মুরগির মাংসের বাণিজ্যিক বিক্রির জন্য প্রয়োজনীয় অনুমোদন সম্পন্ন করে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের পরামর্শমূলক মূল্যায়নকে নিজেই চূড়ান্ত বাজারজাতকরণ অনুমোদন বলা যায় না। সংস্থাটি প্রতিষ্ঠানগুলোর জমা দেওয়া তথ্য পর্যালোচনা করে জানিয়েছিল, তাদের নিরাপত্তাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে তখন আর কোনো প্রশ্ন নেই। বাজারজাতের জন্য অন্যান্য প্রযোজ্য শর্তও পূরণ করতে হয়। অর্থাৎ নিয়ন্ত্রক সংস্থার মূল্যায়ন হয়েছে বলেই প্রতিটি কোষচাষে তৈরি পণ্য সব পরিস্থিতিতে ঝুঁকিমুক্ত এমন দাবি করা যথাযথ নয়।
২০২৫ সালে এ খাতে আরও অগ্রগতি দেখা যায়। খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, ওই বছর মিশন বার্নসের শূকরের চর্বিকোষ, ওয়াইল্ডটাইপের স্যামন মাছের কোষ এবং বিলিভার মিটসের মুরগির কোষ নিয়ে পরামর্শমূলক মূল্যায়ন সম্পন্ন হয়। এর অর্থ, সংশ্লিষ্ট উপাদানগুলো নিয়ন্ত্রক পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে গেছে; তবে প্রতিটি পণ্যের উৎপাদন, পরিদর্শন, লেবেলিং ও বিক্রির জন্য প্রযোজ্য অন্যান্য শর্ত আলাদাভাবে বিবেচ্য।
এত নিয়ন্ত্রক অগ্রগতি সত্ত্বেও বাজারে এ ধরনের মাংসের উপস্থিতি এখনো সীমিত। উৎপাদন ব্যয়, বড় পরিসরে উৎপাদনের জটিলতা, ভোক্তার আস্থা এবং বাণিজ্যিক সরবরাহের সীমাবদ্ধতা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বড় বাধা। ফলে অনুমোদন পাওয়া আর সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের খাবারের বাজারে ব্যাপকভাবে পৌঁছে যাওয়া এক বিষয় নয়।
নিষেধাজ্ঞার সমর্থকদের যুক্তি, নতুন এ প্রযুক্তির দ্রুত সম্প্রসারণ প্রচলিত কৃষক, পশুপালক ও মাংস উৎপাদনকারীদের জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি খাদ্যনিরাপত্তা, উৎপাদনপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং নতুন পণ্যের উপাদান নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন বলে তাঁদের কেউ কেউ মনে করেন। অন্যদিকে, প্রযুক্তিটির সমর্থকেরা বলছেন, নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে মাংস উৎপাদনের মাধ্যমে প্রাণী পালনের ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাঁদের মতে, নিরাপত্তা ও মান যাচাইয়ের ভিত্তিতে ভোক্তাদের সামনে বিকল্প রাখাই যুক্তিযুক্ত।
আইনি লড়াইও এই বিতর্ককে আরও জটিল করেছে। ফ্লোরিডায় নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে মামলা করে ইউপসাইড ফুডস। প্রতিষ্ঠানটির যুক্তি ছিল, কেন্দ্রীয় আইনের অধীনে নিয়ন্ত্রিত পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে অঙ্গরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়া উচিত নয়। কিন্তু ২০২৬ সালের ২৩ মার্চ যুক্তরাষ্ট্রের একাদশ সার্কিট আপিল আদালত নিম্ন আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। আদালত জানায়, সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রীয় আইনের বিধান ফ্লোরিডার পণ্য নিষিদ্ধ করার আইনকে এই মামলার প্রেক্ষাপটে অকার্যকর করে না। তবে এটি যুক্তরাষ্ট্রের সব অঙ্গরাজ্যের জন্য একই ধরনের নিষেধাজ্ঞার চূড়ান্ত রায় নয়।
টেক্সাসেও ইউপসাইড ফুডস ও ওয়াইল্ডটাইপের পক্ষ থেকে আইনি চ্যালেঞ্জের কথা সামনে এসেছে। প্রতিষ্ঠানগুলোর বক্তব্য, ভোক্তাদের খাবারের পছন্দ নির্ধারণে রাজনীতিকদের বদলে মানুষের নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থাকা উচিত। অন্যদিকে, নিষেধাজ্ঞার সমর্থকেরা মনে করেন, নতুন খাদ্যপ্রযুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা দূর না হওয়া পর্যন্ত সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
এদিকে ২০২৬ সালের ৪ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পশুপালক ও মাংস উৎপাদনকারীদের বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানো এবং মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতে প্রতিযোগিতা জোরদারের লক্ষ্যে নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন। এতে পশু ও মাংসের বাজারে অন্যায্য বাণিজ্যিক আচরণ তদন্ত, ছোট প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানকে সহায়তা এবং অঙ্গরাজ্য পরিদর্শনব্যবস্থার আওতায় থাকা নির্দিষ্ট মাংসের আন্তঃঅঙ্গরাজ্য বিক্রির সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ রয়েছে। তবে আদেশগুলোতে পরীক্ষাগারে উৎপাদিত মাংসের ওপর দেশব্যাপী নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রে পরীক্ষাগারে তৈরি মাংস নিয়ে বিতর্ক কেবল খাদ্যপ্রযুক্তির প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষকের স্বার্থ, ভোক্তার স্বাধীনতা, বিজ্ঞানভিত্তিক নিরাপত্তা মূল্যায়ন এবং কেন্দ্রীয় ও অঙ্গরাজ্য সরকারের ক্ষমতার সীমা। আগামী দিনে আদালতের সিদ্ধান্ত, নতুন গবেষণার ফলাফল এবং উৎপাদন ব্যয় কমানোর সক্ষমতা নির্ধারণ করবে, এ প্রযুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্যবাজারে কতটা জায়গা করে নিতে পারবে।





