ঢাকার স্কুল থেকে অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ ধনীদের তালিকায় রবিন খুদার অবিশ্বাস্য উত্থান
৯ মিনিটে পড়ুন
অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম শীর্ষ ধনী উদ্যোক্তা রবিন খুদার সাফল্যের গল্প শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায়। একসময় বিদেশে পড়াশোনা ও চাকরির মাধ্যমে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন দেখা এই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত উদ্যোক্তা পরবর্তী সময়ে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের বৃহৎ তথ্যকেন্দ্র ব্যবসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান এয়ারট্রাঙ্ককে ঘিরে কয়েক বছরের ব্যবধানে গড়ে ওঠে বিপুল বিনিয়োগের ব্যবসা। একপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটি কিনতে ২৪ বিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলারের বেশি মূল্য নির্ধারণ করে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা। ফোর্বস অস্ট্রেলিয়ার ২০২৬ সালের ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় রবিন খুদার অবস্থান ৩৮তম। ওই তালিকায় তাঁর আনুমানিক সম্পদের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ২০০ কোটি মার্কিন ডলার। বাংলাদেশে বেড়ে ওঠা একজন মানুষের আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি অবকাঠামো ব্যবসায় এমন অবস্থানে পৌঁছানো যেমন আলোচনার বিষয়, তেমনি তাঁর উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার পেছনের ঝুঁকি, ব্যর্থতার আশঙ্কা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও গুরুত্বপূর্ণ। ফোর্বস অস্ট্রেলিয়া ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রকাশিত তথ্য থেকে তাঁর জীবন ও ব্যবসার গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো উঠে এসেছে। রবিন খুদার জন্ম ১৯৭৯ সালে ঢাকায়। তাঁর শৈশব ও শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ কেটেছে বাংলাদেশে। তিনি শেরেবাংলা নগর সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় এবং হারম্যান মেইনার কলেজে পড়াশোনা করেন বলে তাঁর জীবনীসংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। কৈশোর পেরিয়ে উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত জীবনের নতুন সুযোগের সন্ধানে ১৯৯৭ সালে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমান। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র ১৮ বছর। অস্ট্রেলিয়ায় গিয়ে তিনি সিডনির প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসা ও হিসাববিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা করেন। পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টার বিজনেস স্কুল থেকে ব্যবসা প্রশাসনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। তাঁর শিক্ষাজীবন তাঁকে ব্যবসায়িক হিসাব, অর্থায়ন, ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিষ্ঠানের প্রবৃদ্ধি পরিকল্পনা সম্পর্কে ধারণা দেয়। পরবর্তী সময়ে বৃহৎ প্রযুক্তি অবকাঠামো নির্মাণের মতো ব্যয়বহুল উদ্যোগে অর্থের হিসাব ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনের ক্ষেত্রে এই দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফোর্বসের জীবনীতে তাঁর উচ্চশিক্ষার তথ্যের সমর্থন পাওয়া যায়। বিদেশে এসে তাঁর পথ অবশ্য শুরু থেকেই মসৃণ ছিল না। ফোর্বস অস্ট্রেলিয়ার প্রকাশিত জীবনী অনুযায়ী, পড়াশোনা ও জীবনযাপনের খরচ চালাতে তিনি সিডনির একটি হোটেলে থালাবাসন পরিষ্কারের কাজও করেছিলেন। তাঁর প্রথম দিকের লক্ষ্য ছিল স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ পাওয়া এবং একটি নিরাপদ পেশাগত জীবন গড়ে তোলা। পরবর্তী সময়ে হিসাবরক্ষণ ও টেলিযোগাযোগ খাতে কাজ করার মধ্য দিয়ে তিনি ব্যবসার বাস্তব দিকগুলো বুঝতে শুরু করেন। কর্মজীবনে তিনি ফুজিৎসু, পাইপ নেটওয়ার্কস এবং নেক্সটডিসির মতো প্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করেন। এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে গিয়ে প্রযুক্তিগত প্রয়োজন, বিনিয়োগের হিসাব এবং ব্যবসা সম্প্রসারণের মধ্যে সম্পর্ক বুঝতে পারেন। বিশেষ করে তথ্যকেন্দ্র ব্যবসায় বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করতে হয়, অথচ সেই বিনিয়োগের সুফল পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে। ফলে প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি অর্থায়ন ও ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা এই খাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নেক্সটডিসিতে কাজ করার সময় তিনি বুঝতে পারেন, ভবিষ্যতে ইন্টারনেটভিত্তিক সেবা, অনলাইন ব্যবসা এবং দূরবর্তী কম্পিউটিং ব্যবস্থার জন্য আরও বড় তথ্যকেন্দ্র প্রয়োজন হবে। বিশ্বের বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বিপুল পরিমাণ তথ্য সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াকরণ এবং অনলাইন সেবা পরিচালনার জন্য নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো খুঁজছিল। প্রচলিত ছোট তথ্যকেন্দ্র দিয়ে ভবিষ্যতের এই চাহিদা পূরণ করা কঠিন হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
এই উপলব্ধিই তাঁকে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান গড়ার পথে নিয়ে যায়। ২০১৫ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন এয়ারট্রাঙ্ক। প্রতিষ্ঠানটির মূল লক্ষ্য ছিল বড় প্রযুক্তি ও মেঘভিত্তিক কম্পিউটিং সেবাদাতাদের জন্য বিশাল আকারের তথ্যকেন্দ্র তৈরি করা। এসব কেন্দ্রে বিপুলসংখ্যক কম্পিউটার ও তথ্য সংরক্ষণের যন্ত্রপাতি রাখা হয়। এগুলোকে সচল রাখতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, উন্নত শীতলীকরণ ব্যবস্থা, দ্রুতগতির যোগাযোগ নেটওয়ার্ক এবং শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রয়োজন। সাধারণ মানুষের কাছে তথ্যকেন্দ্রের ব্যবসা দৃশ্যমান না হলেও আধুনিক অর্থনীতিতে এর গুরুত্ব অনেক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, অনলাইন কেনাকাটা, ব্যাংকিং সেবা, ভিডিও প্রচার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা পরিচালনার পেছনে এই অবকাঠামোর ভূমিকা রয়েছে। ফলে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ ও পরিচালনা একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। রবিন খুদা এই চাহিদা বাড়ার আগেই বড় পরিসরে বিনিয়োগের সুযোগটি শনাক্ত করেছিলেন। তবে সম্ভাবনাময় ধারণা থাকলেই যে বড় ব্যবসা দাঁড় করানো যায়, তাঁর অভিজ্ঞতা তা বলে না। এয়ারট্রাঙ্ক প্রতিষ্ঠার পর প্রথম বড় প্রকল্পের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে গিয়ে তাঁকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। প্রায় ৪০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয়ের একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ জোগাড় করা সহজ ছিল না। সেই সময় বড় আকারের তথ্যকেন্দ্র নির্মাণের ব্যবসায় এত বিপুল অর্থ বিনিয়োগের বিষয়ে অনেক বিনিয়োগকারীই সতর্ক ছিলেন। রবিন খুদা নিজের ধারণার ওপর আস্থা রেখে ব্যক্তিগত অর্থ বিনিয়োগ করেন। ফোর্বস অস্ট্রেলিয়ার প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি নিজের সঞ্চয়ের পাশাপাশি অবসরকালীন তহবিলের অর্থও এই উদ্যোগে কাজে লাগিয়েছিলেন। এর ফলে প্রকল্পটি ব্যর্থ হলে শুধু ব্যবসা নয়, তাঁর ব্যক্তিগত আর্থিক ভবিষ্যৎও বিপর্যস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
২০১৬ সালের ডিসেম্বর নাগাদ পরিস্থিতি এতটাই কঠিন হয়ে পড়ে যে তাঁকে দেউলিয়াত্বসংক্রান্ত পরামর্শ নিতে হয়েছিল। অর্থাৎ, যে প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে তিনি বড় স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেটি টিকিয়ে রাখাই তখন অনিশ্চিত হয়ে উঠেছিল। উদ্যোক্তার জীবনে এমন পরিস্থিতি বিরল নয়, কিন্তু নিজের সঞ্চয় ও ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে রেখে বহু কোটি ডলারের প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া যে কতটা কঠিন, তাঁর অভিজ্ঞতা তার উদাহরণ।
পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে ২০১৭ সালের শুরুর দিকে। প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত হওয়ার পর এয়ারট্রাঙ্ক বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন ও ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ পায়। ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটি অস্ট্রেলিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে এশিয়ার অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বাজারে প্রবেশ করে। জাপান, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর ও হংকংয়ের মতো বাজারে প্রতিষ্ঠানটির উপস্থিতি তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে অঞ্চলজুড়ে বৃহৎ তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ ও পরিচালনার ক্ষেত্রে এয়ারট্রাঙ্ক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। প্রতিষ্ঠানটির দ্রুত সম্প্রসারণের পেছনে একটি বড় কারণ ছিল অনলাইন সেবা ও তথ্য সংরক্ষণের চাহিদা বৃদ্ধি। পরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার এই খাতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বড় বড় ব্যবস্থা প্রশিক্ষণ ও পরিচালনার জন্য বিপুল কম্পিউটিং ক্ষমতা প্রয়োজন হয়। আর সেই ক্ষমতা সরবরাহ করতে পারে বৃহৎ তথ্যকেন্দ্র। তবে এই ব্যবসার সঙ্গে বিদ্যুৎ সরবরাহ, পানির ব্যবহার, পরিবেশগত প্রভাব এবং নির্মাণ ব্যয়ের মতো চ্যালেঞ্জও জড়িত। প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য শুধু বড় স্থাপনা তৈরি করাই যথেষ্ট নয়, সেগুলো দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা করাও জরুরি।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে রবিন খুদার প্রতিষ্ঠানের জন্য আসে বড় ধরনের ব্যবসায়িক মোড়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাকস্টোন এবং কানাডার পেনশন তহবিল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান কানাডা পেনশন প্ল্যান ইনভেস্টমেন্টস যৌথভাবে এয়ারট্রাঙ্ক অধিগ্রহণের চুক্তি ঘোষণা করে। চুক্তিতে প্রতিষ্ঠানটির মোট ব্যবসায়িক মূল্য নির্ধারণ করা হয় ২৪ বিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলারের বেশি। ২০২৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর অধিগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার ঘোষণা দেয় এয়ারট্রাঙ্ক।
এই অঙ্কের গুরুত্ব বোঝার জন্য একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। ২৪ বিলিয়ন অস্ট্রেলীয় ডলার হলো প্রতিষ্ঠানটির ঘোষিত মোট ব্যবসায়িক মূল্য। অন্যদিকে ফোর্বসের বিভিন্ন প্রতিবেদনে একই অধিগ্রহণের মূল্য প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। দুটি অঙ্ক আলাদা মুদ্রায় প্রকাশিত হলেও একই লেনদেনের মূল্যায়ন বোঝায়। তাই এগুলোকে পরস্পরবিরোধী তথ্য হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। অধিগ্রহণের পরও রবিন খুদা এয়ারট্রাঙ্কের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্বে থাকেন এবং প্রতিষ্ঠানটিতে তাঁর মালিকানার অংশ বজায় থাকে। ফলে কোম্পানিটি বিক্রি হওয়ার পরও ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণের সঙ্গে তাঁর সম্পদের মূল্য ওঠানামার সুযোগ রয়ে যায়। তবে প্রতিষ্ঠানের মোট মূল্য আর প্রতিষ্ঠাতার ব্যক্তিগত সম্পদ এক বিষয় নয়। ব্যবসার মূল্য থেকে ঋণ, অন্যান্য আর্থিক দায়, মালিকানার অনুপাত এবং সংশ্লিষ্ট হিসাব সমন্বয় করে ব্যক্তিগত সম্পদের আনুমানিক পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়।
ফোর্বস অস্ট্রেলিয়ার ২০২৬ সালের ধনী ব্যক্তিদের তালিকায় রবিন খুদাকে ৩৮তম স্থানে রাখা হয়েছে। তাঁর সম্পদের আনুমানিক মূল্য ২০০ কোটি মার্কিন ডলার। এই অবস্থান তাঁকে অস্ট্রেলিয়ার প্রযুক্তি খাতের অন্যতম ধনী উদ্যোক্তার মর্যাদা দিয়েছে। তবে এ ধরনের তালিকায় সম্পদের হিসাব বাজারদর, ব্যবসায়িক মূল্যায়ন এবং অন্যান্য আর্থিক তথ্যের ওপর নির্ভর করে। তাই তালিকায় প্রকাশিত অর্থকে নির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবে থাকা নগদ অর্থ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। রবিন খুদার জীবনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো শিক্ষা ও সামাজিক উন্নয়নে তাঁর পরিবারের উদ্যোগ। ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি খুদা ফ্যামিলি ফাউন্ডেশন অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়কে ১০ কোটি অস্ট্রেলীয় ডলার অনুদানের প্রতিশ্রুতি দেয়। এই অর্থ দিয়ে পশ্চিম সিডনির মেয়েদের বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত বিষয়ে পড়াশোনা এবং পেশাগত ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি পরিচালনা করা হবে।
সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এই অনুদান বিশ্ববিদ্যালয়টির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক অনুদান। কর্মসূচিটির পরিকল্পনা ২০ বছর মেয়াদি। এতে সপ্তম শ্রেণি থেকে মেয়েদের সহায়তা দেওয়ার কথা রয়েছে। শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত পাঠদান, পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা, উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের প্রস্তুতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য বৃত্তির সুযোগ রাখা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর বিষয়ে মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং উচ্চশিক্ষা থেকে কর্মজীবন পর্যন্ত তাঁদের এগিয়ে যেতে সহায়তা করা। এই উদ্যোগের গুরুত্ব রয়েছে সামাজিক বাস্তবতার কারণেও। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অনেক ক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ এখনও তুলনামূলকভাবে কম। বিশেষ করে গণিত, প্রকৌশল এবং প্রযুক্তিনির্ভর পেশায় শিক্ষার সুযোগ, আর্থিক সহায়তা ও উপযুক্ত দিকনির্দেশনার অভাব অনেক শিক্ষার্থীর অগ্রযাত্রায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি এই কর্মসূচির মাধ্যমে স্কুলজীবন থেকেই মেয়েদের আগ্রহ তৈরি করা এবং উচ্চশিক্ষা শেষ করে পেশাজীবনে প্রবেশের পথ সহজ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগত পার্থক্যও রয়েছে। ১০ কোটি অস্ট্রেলীয় ডলারের এই অর্থকে ইতিমধ্যে সব শিক্ষার্থীর মধ্যে বিতরণ করা নগদ অনুদান বলা ঠিক হবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষণা অনুযায়ী, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচির জন্য দেওয়া অনুদানের প্রতিশ্রুতি। কর্মসূচির বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থ ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। বাংলাদেশের সঙ্গে রবিন খুদার সম্পর্ক তাঁর জন্ম ও শিক্ষাজীবনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু তাঁর ব্যবসায়িক সাফল্য গড়ে উঠেছে অস্ট্রেলিয়ায়, যেখানে তিনি উচ্চশিক্ষা নিয়েছেন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন এবং পরে নিজস্ব প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। তাঁকে বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া অস্ট্রেলীয় উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচয় করানো তথ্যগতভাবে যথাযথ। তবে তাঁর বর্তমান নাগরিকত্ব, বাংলাদেশে নিয়মিত ব্যবসায়িক কার্যক্রম বা বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগের বিষয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া অতিরিক্ত দাবি করা উচিত নয়। তাঁর জীবন থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, ব্যবসায়িক সাফল্য কেবল একটি ভালো ধারণার ওপর নির্ভর করে না। বাজারের ভবিষ্যৎ চাহিদা বুঝতে পারা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন এবং কঠিন সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। রবিন খুদার ক্ষেত্রে এসব দক্ষতার সঙ্গে ব্যক্তিগত আর্থিক ঝুঁকিও যুক্ত হয়েছিল। তবে তাঁর অভিজ্ঞতাকে এমনভাবে দেখা ঠিক হবে না যে প্রত্যেক উদ্যোক্তারই ব্যক্তিগত সঞ্চয় বা অবসরকালীন অর্থ ঝুঁকিতে রাখা উচিত। বরং এটি দেখায়, বড় ব্যবসায়িক উদ্যোগে সম্ভাবনার পাশাপাশি ক্ষতির ঝুঁকিও বাস্তব।