গ্রিনকার্ডে বাধা দিলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সতর্ক করলেন মাইক্রোসফট প্রেসিডেন্ট
দক্ষ বিদেশি কর্মীদের গ্রিনকার্ডের সুযোগ সীমিত করার সিদ্ধান্তে উদ্বেগ বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতে। মাইক্রোসফট প্রেসিডেন্ট বলছেন, এতে মেধাবীরা অন্য দেশে চলে যেতে পারেন।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন দক্ষ বিদেশি কর্মীদের গ্রিনকার্ড পাওয়ার সুযোগ সীমিত করার পদক্ষেপ নেওয়ার পর প্রযুক্তি খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মাইক্রোসফটের ভাইস চেয়ারম্যান ও প্রেসিডেন্ট ব্র্যাড স্মিথ সতর্ক করে বলেছেন, উচ্চদক্ষ অভিবাসীদের যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ বন্ধ বা সংকুচিত করা হলে দেশটির প্রযুক্তি খাত দীর্ঘমেয়াদে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
রয়টার্সের ১৫ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজনৈতিক সংবাদমাধ্যম পলিটিকোর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে স্মিথ বলেন, দক্ষ বিদেশি কর্মীদের স্থায়ী বসবাসের পথ আটকে দেওয়ার পরিণতি এক প্রজন্মেরও বেশি সময় ধরে মার্কিন প্রযুক্তি খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। তাঁর বক্তব্যের মূল উদ্বেগ হলো, যুক্তরাষ্ট্র যদি বিশ্বের দক্ষ কর্মীদের ধরে রাখতে না পারে, তাহলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা,সফটওয়্যার, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিনকার্ডের জন্য ব্যবহৃত পার্মানেন্ট লেবার সার্টিফিকেশন বা পিইআরএম (PERM) কর্মসূচি। সাধারণত কোনো মার্কিন নিয়োগকর্তা বিদেশি কর্মীকে স্থায়ীভাবে চাকরিতে নিয়োগ দেওয়ার জন্য এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শ্রমবাজারে উপযুক্ত মার্কিন কর্মী পাওয়া যাচ্ছে কি না, তা প্রমাণ করেন। প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হওয়ার পর যোগ্যতার ভিত্তিতে গ্রিনকার্ডের পরবর্তী ধাপে যাওয়া সম্ভব হয়। তবে পিইআরএম অনুমোদন নিজেই গ্রিনকার্ড নয়; স্থায়ী বসবাসের জন্য আরও শর্ত ও ধাপ রয়েছে।
গত ৮ অক্টোবর মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ঘোষণা দেন, বিদেশি কর্মীদের গ্রিনকার্ডের জন্য পিইআরএম প্রক্রিয়ায় মাইক্রোসফটসহ একাধিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ স্থগিত করা হচ্ছে। প্রশাসনের অভিযোগ, কিছু প্রতিষ্ঠান এই কর্মসূচির অপব্যবহার করে মার্কিন কর্মীদের পরিবর্তে বিদেশি কর্মী নিয়োগ দিয়েছে। তবে এসব অভিযোগ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যকে পৃথকভাবে বিবেচনা করা জরুরি; অভিযোগ উঠলেই তা প্রমাণিত অপরাধ হয়ে যায় না।
এই সিদ্ধান্তে মাইক্রোসফটের পাশাপাশি অ্যাডোবি, কগনিজ্যান্ট, ইনফোসিস, টাটা কনসালট্যান্সি সার্ভিসেস, উইপ্রো, এইচসিএল টেকনোলজিস ও ক্যাপজেমিনির নাম বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীদের জন্য এর বাস্তব প্রভাব নির্ভর করতে পারে স্থগিতাদেশের পরিধি, তাঁদের আবেদন কোন পর্যায়ে রয়েছে এবং পরবর্তী প্রশাসনিক বা আইনি সিদ্ধান্তের ওপর।
ভ্যান্সের অভিযোগের জবাবে স্মিথ বলেছেন, মাইক্রোসফট এইচ-ওয়ান-বি (H-1B) ভিসা কর্মসূচির অপব্যবহার করেছে—এমন দাবি ভিত্তিহীন। বিদেশে জন্ম নেওয়া কর্মীদের মার্কিন কর্মীদের তুলনায় কম বেতন দেওয়া হয়, এমন অভিযোগও তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কর্মীদের অভিবাসন-অবস্থা নির্বিশেষে মাইক্রোসফট একই ধরনের বেতন কাঠামো অনুসরণ করে।
স্মিথ আরও জানান, গত বছর মাইক্রোসফট যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া ৯ হাজারের বেশি কর্মী নিয়োগ করেছে। তাঁর যুক্তি, বিদেশি কর্মীদের নিয়োগ নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি মার্কিন নাগরিকদের জন্য প্রতিষ্ঠানটির কর্মসংস্থান সৃষ্টির অবদানও বিবেচনায় নেওয়া উচিত। তবে এই সংখ্যাটি স্মিথের বক্তব্য হিসেবে প্রকাশিত হয়েছে; এটি দিয়ে একা কোম্পানির সব নিয়োগনীতি বা বেতনসংক্রান্ত অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করা যায় না।
এই বিতর্কের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত বাংলাদেশিসহ বিভিন্ন দেশের দক্ষ পেশাজীবীদের ভবিষ্যৎও জড়িত। অনেক বিদেশি কর্মী এইচ-ওয়ান-বি ভিসায় প্রযুক্তি বা বিশেষায়িত পেশায় কাজ করেন। তাঁদের কেউ কেউ নিয়োগকর্তার মাধ্যমে কর্মসংস্থানভিত্তিক গ্রিনকার্ডের আবেদন করেন। পিইআরএম প্রক্রিয়া আটকে গেলে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের স্থায়ী বসবাসের পরিকল্পনা বিলম্বিত বা অনিশ্চিত হতে পারে।
নীতিটির পক্ষে প্রশাসনের যুক্তি হলো, মার্কিন নাগরিকদের কর্মসংস্থান ও বেতন সুরক্ষিত রাখা এবং বিদেশি কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে অনিয়ম ঠেকানো। অন্যদিকে, স্মিথের মতো প্রযুক্তি খাতের নেতাদের আশঙ্কা, দক্ষ বিদেশি কর্মীদের দীর্ঘমেয়াদি কর্মজীবন ও স্থায়ী বসবাসের পথ অনিশ্চিত হলে তাঁরা কানাডা, ইউরোপ বা এশিয়ার অন্যান্য প্রযুক্তিকেন্দ্রিক দেশে সুযোগ খুঁজতে পারেন। এতে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্ভাবন, গবেষণা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এটি সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে স্মিথের সতর্কবার্তা—ভবিষ্যতে ঠিক কী প্রভাব পড়বে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যায় না।





