তারেক রহমানের নির্দেশে যুক্তরাষ্ট্রে ড. ইউনূসের নিরাপত্তা জোরদার, জানাল বাংলাদেশ
যুক্তরাষ্ট্রে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নিরাপত্তা ও আনুষ্ঠানিক প্রটোকল জোরদার করেছে বাংলাদেশ সরকার, জানিয়েছেন নিউইয়র্কে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল।
তারেক রহমানের নির্দেশে যুক্তরাষ্ট্রে ড. ইউনূসের নিরাপত্তা জোরদার, জানাল বাংলাদেশ
৫ মিনিটে পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নিরাপত্তা ও আনুষ্ঠানিক প্রটোকল জোরদার করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে তাঁর জন্য এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন নিউইয়র্কে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক পিটার। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে ড. ইউনূসকে ঘিরে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরির পর তাঁর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ড. ইউনূসের যুক্তরাষ্ট্র সফর, বিমানবন্দরে তাঁকে ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনা এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ এখন আলোচনার কেন্দ্রে রয়েছে। একাধিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক সরকারপ্রধান হিসেবে ড. ইউনূসের জন্য আনুষ্ঠানিক প্রটোকলের পাশাপাশি বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তবে এ নিরাপত্তা ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ বিবরণ, দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের সংখ্যা কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের বিস্তারিত প্রকাশ্যে আসেনি।
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ড. ইউনূসের যুক্তরাষ্ট্র সফরের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আগে থেকে অবহিত ছিল না। পরে সফরের বিষয়টি জানার পর তাঁর নিরাপত্তা ও প্রটোকল নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। নিউইয়র্কে বাংলাদেশের কনসাল জেনারেল জানিয়েছেন, ড. ইউনূসের সঙ্গে তাঁদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। তিনি নিউইয়র্কের বাইরে অন্য একটি অঙ্গরাজ্যে অবস্থান করছিলেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কনসাল জেনারেল নিজে তাঁকে সেখানে পৌঁছে দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন।
ঘটনার সূত্রপাত নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, গত ১২ অক্টোবর বিমানবন্দরে ড. ইউনূসকে একদল বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্যক্তি ঘিরে ধরে নানা ধরনের স্লোগান দেন। সে সময় তিনি হুইলচেয়ারে ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে কয়েকজনকে তাঁকে উদ্দেশ করে উচ্চস্বরে কথা বলতে ও আক্রমণাত্মক মন্তব্য করতে দেখা যায়। পরিস্থিতির মধ্যে ড. ইউনূস ও তাঁর সঙ্গীরা ভিড়ের কাছ থেকে সরে যান। পরে নিরাপত্তাকর্মীরা তাঁকে সরিয়ে নিতে সহায়তা করেন। ঘটনার ভিডিও প্রকাশ্যে আসার পর বাংলাদেশে ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। বিমানবন্দরের ওই ঘটনার পর বাংলাদেশ সরকার বিষয়টিকে গুরুত্বের সঙ্গে নেয়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মিশনকে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার উদ্যোগ নিতে বলা হয়। একই সঙ্গে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টিও সামনে আসে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির ১৩ অক্টোবর সাংবাদিকদের বলেন, সাবেক প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে এমন আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছে জোরালোভাবে তুলে ধরা হবে বলেও তিনি জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর উচিত ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া।
এ ঘটনায় বাংলাদেশের কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি বিদেশে অবস্থানরত বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নিরাপত্তা ও আনুষ্ঠানিক প্রটোকল নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে কোনো সাবেক সরকারপ্রধান ব্যক্তিগত সফরে বিদেশে গেলে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের দূতাবাস ও কনস্যুলেটের ভূমিকা কী হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে।
কূটনৈতিক প্রটোকল বলতে সাধারণত রাষ্ট্রীয় পদমর্যাদা, সরকারি দায়িত্ব, সফরের ধরন এবং আয়োজক দেশের সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে নির্ধারিত আনুষ্ঠানিক ব্যবস্থাকে বোঝায়। অন্যদিকে নিরাপত্তাব্যবস্থা নির্ভর করে ব্যক্তির ঝুঁকি, সফরের পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মূল্যায়নের ওপর। তাই আনুষ্ঠানিক প্রটোকল ও বাড়তি নিরাপত্তা একই বিষয় নয়। ড. ইউনূসের ক্ষেত্রে কোন কোন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত সরকারি তথ্য প্রকাশিত না হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে অতিরিক্ত কোনো অনুমান করা সমীচীন হবে না। তারেক রহমানের নির্দেশে নিরাপত্তা জোরদারের খবরটি প্রকাশিত হলেও নির্দেশটি ঠিক কখন দেওয়া হয়েছে, সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে কী কী পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয়ের সুনির্দিষ্ট কাঠামো কী—এসব প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর এখনো প্রকাশিত প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি। ফলে নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে সমর্থিত হলেও এর প্রতিটি খুঁটিনাটি আলাদাভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এদিকে ড. ইউনূসের যুক্তরাষ্ট্র সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তাঁর পূর্বনির্ধারিত আন্তর্জাতিক কর্মসূচি। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ১১ থেকে ১৩ অক্টোবর জার্মানির বার্লিনে অনুষ্ঠিতব্য তিন দিনের বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে তাঁর অংশ নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ মুহূর্তে তিনি সেই সফর বাতিল করেন। তবে বিমানবন্দরের ঘটনা, নিরাপত্তা পরিস্থিতি কিংবা অন্য কোনো কারণে তিনি সম্মেলনে যাননি কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য ছাড়া নির্দিষ্ট কারণ দাবি করা যাবে না। ড. ইউনূস বাংলাদেশের একজন পরিচিত অর্থনীতিবিদ এবং শান্তিতে নোবেল পুরস্কারপ্রাপ্ত ব্যক্তি। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করার কারণে দেশটির রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিসরেও তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সে কারণে বিদেশে তাঁর সঙ্গে ঘটে যাওয়া কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা কেবল ব্যক্তিগত নিরাপত্তার বিষয় নয়; এটি বাংলাদেশের ভাবমূর্তি, প্রবাসী সমাজের আচরণ এবং কূটনৈতিক সম্পর্কের আলোচনাতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে বিমানবন্দরে যাঁরা তাঁকে ঘিরে ধরেছিলেন, তাঁদের সবার পরিচয়, উদ্দেশ্য কিংবা রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা কেবল ভিডিও দেখে নিশ্চিত করা যায় না। সরকারি বক্তব্যে কয়েকজনের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে অভিযোগ উঠলেও, অভিযোগ ও প্রমাণিত তথ্যের মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যাচাই হওয়া উচিত। একইভাবে ঘটনার ভিডিওতে যা স্পষ্টভাবে দেখা যায়, তার বাইরে কোনো বক্তব্য বা উদ্দেশ্য নিশ্চিত সত্য হিসেবে প্রচার করাও ঠিক নয়।
বিদেশের মাটিতে কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে সংশ্লিষ্ট দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার পাশাপাশি বাংলাদেশের দূতাবাস ও কনস্যুলেট প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা দিতে পারে। তবে বিদেশের ভূখণ্ডে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা মূলত সেই দেশের কর্তৃপক্ষের হাতে থাকে। বাংলাদেশের কূটনৈতিক মিশন যোগাযোগ, সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে ভূমিকা রাখতে পারে। ড. ইউনূসের ঘটনা ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, তা এই কূটনৈতিক প্রক্রিয়ারই অংশ।
সার্বিকভাবে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে নিরাপত্তা ও আনুষ্ঠানিক প্রটোকল জোরদারের খবর একাধিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। নিউইয়র্কের বিমানবন্দরে তাঁকে ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনার পর বাংলাদেশ সরকার নিন্দা জানিয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগের কথা জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে নিরাপত্তা ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়টি কনসাল জেনারেলের বক্তব্যের বরাতে প্রকাশিত হলেও, নিরাপত্তার সুনির্দিষ্ট বিবরণ এখনো স্পষ্ট নয়। তাই যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, ঘটনাটির পর ড. ইউনূসের নিরাপত্তা ও প্রটোকল নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের তৎপরতা বেড়েছে; তবে এর বাইরে অতিরঞ্জিত বা অপ্রমাণিত দাবি এড়িয়ে চলাই দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশনের অংশ।