যুক্তরাষ্ট্রে তেলেগু ছাত্রকে দাস বানানোর অপরাধে তিন প্রবাসী ভারতীয়র কারাদণ্ড
পড়তে এসে দাসত্বের শিকার তেলেগু ছাত্র, খাবার-ঘুম-বাথরুম বন্ধ করে অমানুষিক নির্যাতনের অবসান।
যুক্তরাষ্ট্রের মিসৌরি অঙ্গরাজ্যে এক চাঞ্চল্যকর মানব পাচার ও জোরপূর্বক শ্রমের মামলায় তিনজন তেলেগু বংশোদ্ভূত প্রবাসী ভারতীয়কে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই ঘটনা পুরো ভারতীয় প্রবাসী সম্প্রদায়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। প্রধান অভিযুক্ত ভেঙ্কটেশ সাত্তারুকে পঞ্চাশ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে, তার দুই সহযোগী নিখিল পেনমাটসা এবং শ্রাবণ পেনুমেচাকে যথাক্রমে সাঁইত্রিশ মাস এবং ত্রিশ মাসের জেল দেওয়া হয়েছে। আদালত আজ সকালে এই রায় ঘোষণা করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত দুই হাজার বাইশ সালে। অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে আসা বিশ বছর বয়সী এক তরুণ উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন নিয়ে আমেরিকায় এসেছিলেন। তিনি ভেঙ্কটেশ সাত্তারুর নিজের চাচাতো ভাই। কিন্তু আমেরিকায় পৌঁছানোর পর তার স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। অভিযুক্তরা তার পাসপোর্ট এবং অভিবাসনের কাগজপত্র কেড়ে নেয়, তাকে তিনটি ভিন্ন স্থানে বেসমেন্টে প্রায় সাত মাস ধরে তালাবদ্ধ করে রাখে। তাকে দিয়ে জোর করে বাড়ির সব কাজ করানো হতো, ঠিক যেন একজন দাস।
তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, ভুক্তভোগীকে পর্যাপ্ত খাবার দেওয়া হতো না, বাথরুম ব্যবহার করতে দেওয়া হতো না, ঘুমাতেও দেওয়া হতো না। তার ওপর নিয়মিত শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো। এর ফলে তার শরীরে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং তার ওজন অস্বাভাবিকভাবে কমে গিয়েছিল। সে একেবারে ভেঙে পড়েছিল।
এই ভয়াবহ ঘটনা প্রথম প্রকাশ্যে আসে দুই হাজার তেইশ সালের শেষের দিকে, যখন একজন সচেতন নাগরিক সন্দেহজনক কার্যকলাপ দেখে স্থানীয় পুলিশকে খবর দেয়। পুলিশ তদন্ত শুরু করলে পুরো ঘটনা বেরিয়ে আসে। তারা ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করে এবং অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করে।
আদালতে প্রমাণিত হয়েছে যে এই তিনজন মিলে একটি সংঘবদ্ধ মানব পাচার চক্র পরিচালনা করছিল। তারা ভুক্তভোগীর দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছিল। সে নতুন দেশে এসেছিল, তার কোনো পরিচিত ছিল না, ভাষার সমস্যা ছিল এবং তার অভিবাসন কাগজপত্র তাদের হাতে ছিল। এই সুযোগে তারা তাকে ভয় দেখিয়ে এবং নির্যাতন করে কাজ করাতো।
এই রায়ের পর তেলেগু এনআরআই সম্প্রদায়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। অনেকে বলছেন, এই ধরনের ঘটনা পুরো সম্প্রদায়ের বদনাম করছে। যুক্তরাষ্ট্রে লক্ষ লক্ষ ভারতীয় সৎভাবে কাজ করছেন এবং দেশের সুনাম বাড়াচ্ছেন, কিন্তু কয়েকজনের অপরাধে সবার ওপর কালিমা লাগছে। আবার অনেকে এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছেন এবং বলেছেন, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভুক্তভোগী এখন নিরাপদে আছে এবং তাকে পুনর্বাসনের জন্য সাহায্য করা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রে মানব পাচার একটি গুরুতর অপরাধ। প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ এই অপরাধের শিকার হন। বিশেষ করে অভিবাসী ছাত্র এবং শ্রমিকরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। অনেক সময় তাদের ভালো চাকরি বা শিক্ষার লোভ দেখিয়ে আনা হয়, তারপর তাদের কাগজপত্র কেড়ে নিয়ে জোর করে কাজ করানো হয়।
এই মামলাটি আবারও প্রমাণ করে যে আমেরিকার আইন কতটা কঠোর। কেউ যদি মনে করে সে তার নিজের আত্মীয় বা দেশের মানুষকে নির্যাতন করে পার পেয়ে যাবে, তবে সে ভুল করছে। আমেরিকার বিচার ব্যবস্থা ভুক্তভোগীর পক্ষে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্যও এটি একটি শিক্ষা। যুক্তরাষ্ট্রে যারা নতুন যাচ্ছেন, তাদের উচিত নিজেদের কাগজপত্র নিজের কাছে রাখা, কোনো সমস্যা হলে সাথে সাথে ৯১১ বা স্থানীয় মানব পাচার হটলাইনে যোগাযোগ করা। মনে রাখবেন, আমেরিকায় কেউ আপনার কাগজপত্র কেড়ে নিতে পারে না, আপনাকে জোর করে কাজ করাতে পারে না। এটি আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
আদালত অভিযুক্তদের কারাদণ্ডের পাশাপাশি ভুক্তভোগীকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছে। ভুক্তভোগীর আইনজীবী বলেছেন, তার মক্কেল এখন ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠছে এবং আবার পড়াশোনা শুরু করতে চায়।




