মুম্বাইয়ে টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি, আহত ২, তদন্তে পুলিশ
৬ মিনিটে পড়ুন
মুম্বাইয়ের জুহু এলাকায় বলিউড অভিনেতা টাইগার শ্রফের গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। ২০২৬ সালের ১৮ অক্টোবর, রবিবার সন্ধ্যায় ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় অভিনেতা প্রাণে বেঁচে গেলেও তাঁর গাড়িচালকসহ দুজন আহত হয়েছেন। ঘটনাটির পর থেকে হামলাকারীদের শনাক্ত করতে তদন্ত শুরু করেছে মুম্বাই পুলিশ। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, সন্দেহভাজন হামলাকারীদের গতিবিধি জানতে এলাকার নিরাপত্তা ক্যামেরার ফুটেজ পরীক্ষা করা হচ্ছে। অন্যদিকে, একটি অপরাধী চক্রের পক্ষ থেকে হামলার দায় স্বীকারের দাবি সামনে এলেও পুলিশ এখনো সেটি নিশ্চিত করেনি।
ঘটনাটি শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতার নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে না, বরং মুম্বাইয়ের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং বিনোদনজগতের তারকাদের নিরাপত্তা নিয়েও নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, রবিবার সন্ধ্যা সাতটার দিকে মুম্বাইয়ের জুহু এলাকার পুষ্প নারসি পার্কের কাছে গুলির ঘটনা ঘটে। টাইগার শ্রফ ফুটবল খেলা শেষে গাড়িতে করে বাড়ির দিকে ফিরছিলেন। এ সময় তাঁর গাড়ির আশপাশে কয়েকজন হামলাকারী এসে গুলি চালায় বলে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ এবং সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ঘটনার দৃশ্য থেকে জানা যায়, গুলির শব্দে আশপাশে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে উপস্থিত লোকজন নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেন। হামলার সময় টাইগার শ্রফ গাড়ির ভেতরে ছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর গাড়িকে লক্ষ্য করে একাধিক গুলি ছোড়া হয়। তবে গুলির সঠিক সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদনে কিছু পার্থক্য রয়েছে। কোথাও চারটি, কোথাও পাঁচটি, আবার কোনো প্রতিবেদনে সাতটি গুলি ছোড়ার কথা বলা হয়েছে। ফলে তদন্তকারী পুলিশের চূড়ান্ত বক্তব্য ছাড়া গুলির সংখ্যা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
প্রাথমিকভাবে জানানো হয়েছিল, টাইগার শ্রফ গুলির আঘাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন। তবে পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত কিছু ছবিতে তাঁর কাঁধ, বুক ও ডান হাতে ব্যান্ডেজ দেখা যায়। মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে তাঁর বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করেন। এসব ছবিতে ব্যান্ডেজ দেখা গেলেও ঠিক কী ধরনের আঘাত লেগেছে, তা নিয়ে বিস্তারিত চিকিৎসা-তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তাই তাঁকে সরাসরি গুলিবিদ্ধ বলা সঠিক হবে না। পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যে বলা হয়েছিল, তিনি গুলির আঘাত পাননি। এই ঘটনায় আহত হয়েছেন টাইগার শ্রফের গাড়িচালক এবং ঘটনাস্থলের কাছে থাকা আরেক ব্যক্তি। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাড়িচালক ফিরদৌসের বাম হাতে গুলির আঘাত লাগে। আহত অন্য ব্যক্তিকে কয়েকটি প্রতিবেদনে অটোরিকশাচালক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়। পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, গাড়িচালকের অবস্থা আশঙ্কামুক্ত ছিল। দ্বিতীয় আহত ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সব সংবাদমাধ্যমে একভাবে প্রকাশিত হয়নি। ঘটনার পর মুম্বাই পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে এলাকা ঘিরে ফেলে। তদন্তকারীরা সেখান থেকে গুলির খোসাসহ সম্ভাব্য আলামত সংগ্রহ করেন। অপরাধস্থলের আশপাশে থাকা নিরাপত্তা ক্যামেরার ধারণ করা দৃশ্যও পরীক্ষা করা হচ্ছে। এসব দৃশ্যের ভিত্তিতে দুই সন্দেহভাজন ব্যক্তির ছবি পাওয়া গেছে বলে ১৯ অক্টোবরের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করার বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, হামলাকারীরা মোটরসাইকেলে করে এসেছিল। গুলি চালানোর পর তারা মোটরসাইকেলে করেই পালিয়ে যায় বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। পরে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি আন্ধেরি পশ্চিমের একটি রেলস্টেশনের বাইরে ফেলে যাওয়ার তথ্যও সামনে এসেছে। এই সূত্র ধরে পুলিশ হামলাকারীদের যাতায়াতের পথ, পরিচয় এবং সম্ভাব্য সহযোগীদের খুঁজছে। তবে হামলার পরিকল্পনা কীভাবে করা হয়েছিল এবং অভিযুক্তরা আগে থেকে অভিনেতার চলাফেরার সময়সূচি জানত কি না, তা এখনো তদন্তের বিষয়। তদন্তের পরিধি বাড়াতে পুলিশ একাধিক দল গঠন করেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে ১৫টি তদন্তকারী দলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এসব দল নিরাপত্তা ক্যামেরার দৃশ্য, ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামত এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য বিশ্লেষণ করছে। তদন্তকারীরা হামলার উদ্দেশ্য, হামলাকারীদের পরিচয় এবং এর পেছনে কোনো সংগঠিত অপরাধী চক্রের যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন। প্রাথমিক পর্যায়ে সন্দেহভাজনদের শনাক্ত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বার্তা ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে লরেন্স বিষ্ণোইয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে পরিচয় দেওয়া একটি অপরাধী চক্রের পক্ষ থেকে হামলার দায় স্বীকারের দাবি করা হয়। বার্তাটিতে অনিল পণ্ডিত ও হারমান সান্ধুর নামও এসেছে বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত কোনো বার্তা বা দায় স্বীকারের দাবি নিজে থেকেই অপরাধে জড়িত থাকার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়। মুম্বাই পুলিশ এখনো ওই দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেনি। প্রকাশিত ওই বার্তায় বলিউড অভিনেতা সালমান খানের সঙ্গে কাজ করা এবং কথিত সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার প্রসঙ্গও এসেছে বলে প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই বক্তব্যের সত্যতা, বার্তাটি কারা তৈরি করেছে এবং হামলার সঙ্গে এর বাস্তব কোনো সম্পর্ক আছে কি না, তা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে হামলার জন্য দায়ী বলে চূড়ান্তভাবে উল্লেখ করা উচিত নয়।
মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী একনাথ শিন্ডে ঘটনার পর টাইগার শ্রফ ও তাঁর বাবা, প্রবীণ অভিনেতা জ্যাকি শ্রফের সঙ্গে দেখা করেন। তিনি ঘটনাটিকে গুরুতর ও নিন্দনীয় বলে উল্লেখ করেন এবং মুম্বাইয়ে অপরাধী চক্রের তৎপরতা বরদাশত করা হবে না বলে জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, তারকা, ব্যবসায়ী কিংবা সাধারণ নাগরিক—সবার নিরাপত্তাই গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে ভয় দেখিয়ে আইন নিজের হাতে তুলে নিতে দেওয়া হবে না বলেও তিনি সতর্ক করেন। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফডণবীসও ঘটনাটির বিষয়ে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন বলে সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। হামলার তদন্ত দ্রুত এগিয়ে নেওয়া এবং দায়ীদের শনাক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও আলোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধী দলের নেতারা মুম্বাইয়ের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তবে তদন্তের ফল প্রকাশের আগেই প্রশাসনের ব্যর্থতা বা কোনো গোষ্ঠীর দায় নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। টাইগার শ্রফের মতো জনপ্রিয় অভিনেতাকে ঘিরে এ ধরনের ঘটনা বিনোদনজগতের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তারকাদের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত, জনসমাগমে তাঁদের উপস্থিতি এবং নিয়মিত চলাফেরার সময়সূচি অপরাধীদের কাছে কীভাবে পৌঁছায়, তা নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তবে এই ঘটনায় হামলাকারীরা সত্যিই অভিনেতার দৈনন্দিন রুটিন জানত কি না, সে বিষয়ে পুলিশের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশিত হয়নি।
এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য, নিরাপত্তা ক্যামেরার দৃশ্য, অস্ত্রসংক্রান্ত আলামত এবং সন্দেহভাজনদের গতিবিধি মিলিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবি যাচাই না করে প্রচার করলে ভুল তথ্য ছড়ানোর ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে কোনো অপরাধী চক্রের দায় স্বীকারের বার্তা প্রচারিত হলে সেটির উৎস, সত্যতা এবং তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্য আলাদা করে যাচাই করা জরুরি।