তিব্বতে ভয়াবহ ভূমিকম্পে নিহত ১৬, আহত ৬৫, ধসে পড়েছে শতাধিক বাড়িঘর
চীনের তিব্বতে সাত মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে প্রাণহানি, আহত বহু মানুষ, শত শত ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত, উদ্ধার তৎপরতা চলছে দুর্গত এলাকায়।
চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় তিব্বত অঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ১৬ জন নিহত হয়েছেন। আহতের সংখ্যা বেড়ে ৬৫ জনে পৌঁছেছে বলে শুক্রবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে রয়টার্স। বৃহস্পতিবার রাতে আঘাত হানা সাত মাত্রার এই ভূমিকম্পে শত শত ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্গত এলাকায় উদ্ধার অভিযান, আহতদের চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির হিসাবের সঙ্গে পরবর্তী তথ্যের পার্থক্য থাকায় পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া এবং স্থানীয় প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতের নাগকু শহরের বাকেন জেলায় স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার রাত ১০টা ৩৩ মিনিটে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। ভূমিকম্পটির কেন্দ্রস্থল ছিল মারু এলাকায়। অঞ্চলটি পাহাড়ি এবং জনবসতি তুলনামূলকভাবে কম। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান ও উচ্চতার কারণে সেখানে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করা কঠিন হয়ে উঠেছে।
প্রাথমিক হিসাবে শুক্রবার রাত ২টা ২৫ মিনিট পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায় এবং আহত ছিলেন ৩২ জন। তাঁদের মধ্যে ১১ জন গুরুতর আহত এবং ২১ জন সামান্য আহত ছিলেন। পরে সকাল ৫টা ২০ মিনিটের হিসাব অনুযায়ী আহতের সংখ্যা বেড়ে ৪৬ জনে দাঁড়ায়। এরপর রয়টার্সের প্রকাশিত প্রতিবেদনে আহতের সংখ্যা ৬৫ বলে জানানো হয়। নিহতের সংখ্যা ১৬ থাকলেও আহতের সংখ্যা বাড়তে থাকায় উদ্ধারকাজের অগ্রগতি এবং নতুন করে পাওয়া তথ্যের ওপর নজর রাখছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সিনহুয়া ও স্থানীয় প্রশাসনের পরবর্তী তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পে অন্তত ৩৩৯টি বাড়িঘর ধসে পড়েছে অথবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ২০টি গবাদিপশু রাখার ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। তবে সব স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব এখনো সম্পন্ন হয়নি। দুর্গত এলাকার বিভিন্ন গ্রামে উদ্ধারকর্মীরা বাড়িঘর পরিদর্শন করছেন এবং কোথাও কেউ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়েছেন কি না, তা যাচাই করছেন।
ভূমিকম্পের পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক মানুষ ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসেন। কেউ কেউ নিজেদের গাড়িতে আশ্রয় নেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত দৃশ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ভবন, ভেঙে পড়া দেয়াল এবং উদ্ধারকর্মীদের তৎপরতা দেখা গেছে। কিছু এলাকায় ভবনের দেয়ালে ফাটল দেখা দেওয়ার খবরও পাওয়া গেছে।
ভূমিকম্পের প্রভাবে কয়েকটি এলাকায় বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। এতে উদ্ধারকারী দলগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ এবং ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার প্রকৃত অবস্থা যাচাইয়ের কাজ জটিল হয়ে পড়ে। স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী উদ্ধারকর্মী ও সহায়তা পাঠাচ্ছে।
চীনের বিভিন্ন সরকারি সংস্থার উদ্ধারকর্মী, দমকল বাহিনী এবং নিরাপত্তাকর্মীদের দুর্গত এলাকায় পাঠানো হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উদ্ধার ও জরুরি সহায়তার জন্য তিন শতাধিক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, এক হাজার ছয় শতাধিক কর্মী উদ্ধার তৎপরতায় যুক্ত হয়েছেন। আহতদের চিকিৎসা, ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা পরিদর্শন এবং বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
দুর্গত মানুষের অস্থায়ী আশ্রয়ের জন্য তাঁবু, শয্যা, শীতবস্ত্র, আলো জ্বালানোর সরঞ্জাম এবং অস্থায়ী আবাসন পাঠানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। উচ্চভূমির এই অঞ্চলে রাতের তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় আশ্রয়হীন মানুষদের জন্য উষ্ণ পোশাক ও নিরাপদ থাকার ব্যবস্থা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ভূমিকম্পের কারণে সড়ক যোগাযোগেও সমস্যা দেখা দিয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় পাথর গড়িয়ে পড়ার ঘটনায় জাতীয় সড়ক ৩১৭-এর একটি অংশে চলাচল সীমিত করা হয়েছে। উদ্ধারকাজ ও জরুরি সহায়তার যানবাহনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক পরিষ্কার করা এবং নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করার কাজ চলছে। রেল চলাচলেও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ভূমিকম্পের পর আশপাশের এলাকায় একাধিক পরাঘাতও রেকর্ড করা হয়েছে। চীনের ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ সংস্থার তথ্য উদ্ধৃত করে রয়টার্স জানিয়েছে, শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ৪১৩টি পরাঘাত নথিভুক্ত করা হয়েছিল। এর মধ্যে কয়েকটির মাত্রা ছিল উল্লেখযোগ্য। মূল ভূমিকম্পের পর আবার কাঁপুনি অনুভূত হলে ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে অবস্থান করা মানুষের জন্য ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই কর্তৃপক্ষ ভবনের অবস্থা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে।
চীনের কেন্দ্রীয় কর্তৃপক্ষ দুর্যোগ মোকাবিলায় জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। উদ্ধারকাজ ত্বরান্বিত করা, চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উদ্ধারকারী দলগুলো দুর্গম গ্রামগুলোতে পৌঁছে ক্ষয়ক্ষতি যাচাই করছে। তবে প্রত্যন্ত এলাকায় যোগাযোগের সমস্যা থাকায় সব তথ্য একসঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে না।
তিব্বত অঞ্চলটি ভূতাত্ত্বিকভাবে সক্রিয় এলাকায় অবস্থিত। অতীতেও এই অঞ্চলে শক্তিশালী ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে তিব্বতের অন্য একটি এলাকায় শক্তিশালী ভূমিকম্পে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। তবে আগের ঘটনার সঙ্গে এবারের ভূমিকম্পের স্থান ও পরিস্থিতি আলাদা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো ধ্বংসস্তূপে আটকে পড়া ব্যক্তিদের সন্ধান, আহতদের দ্রুত চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা। উদ্ধারকাজ অব্যাহত থাকায় হতাহত ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব আরও পরিবর্তিত হতে পারে। তাই সর্বশেষ সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।





