সুন্দরবন থেকে মোংলা বন্দর, উন্নয়নের নতুন দিগন্ত খুঁজতে কাল দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
সুন্দরবন পর্যবেক্ষণ, মোংলা বন্দরের কার্যক্রম পরিদর্শন এবং প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘিরে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়ন সম্ভাবনা যাচাই করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রাকৃতিক সম্পদ, বাণিজ্যিক সম্ভাবনা ও উন্নয়ন কার্যক্রম সরেজমিনে দেখতে আগামীকাল বৃহস্পতিবার খুলনা ও বাগেরহাট সফরে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এক দিনের সরকারি সফরে তিনি সুন্দরবন ও হিরণ পয়েন্ট আকাশপথে পর্যবেক্ষণ করবেন। পাশাপাশি মোংলা নৌঘাঁটিতে সভায় অংশ নেওয়া, মোংলা বন্দরের জেটি পরিদর্শন এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলের স্থান ঘুরে দেখার কর্মসূচি রয়েছে তাঁর।
প্রকাশিত সফরসূচি অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে হেলিকপ্টারে যাত্রা শুরু করার কথা প্রধানমন্ত্রীর। সকাল ১০টার দিকে আকাশপথে সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ এলাকা ও হিরণ পয়েন্ট পর্যবেক্ষণ করবেন তিনি। এরপর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে খুলনার দাকোপ উপজেলার নলিয়ান মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে অবতরণের কথা রয়েছে। সেখান থেকে নৌপথে বাগেরহাটের মোংলা নৌঘাঁটিতে পৌঁছাবেন প্রধানমন্ত্রী।
সফরের পরবর্তী কর্মসূচিতে মোংলা নৌঘাঁটির সভাকক্ষে বৈঠকে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। এতে খুলনা বিভাগের বিভাগীয় কমিশনার এবং খুলনা ও বাগেরহাটের জেলা প্রশাসকেরা উপস্থিত থাকতে পারেন বলে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। মধ্যাহ্নবিরতির পর প্রধানমন্ত্রী মোংলা বন্দরের জেটি ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিদর্শন করবেন। এরপর বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলের স্থান ঘুরে দেখার কথা রয়েছে। সফরসূচি অনুযায়ী, বিকেল ৪টার দিকে মোংলা থেকে হেলিকপ্টারে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা তাঁর।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে ঘিরে সুন্দরবন, দাকোপ, মোংলা নৌঘাঁটি ও বন্দর এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত সংবাদে বলা হয়েছে, বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী, পুলিশ, কোস্টগার্ড, গোয়েন্দা সংস্থা এবং সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সমন্বিতভাবে নিরাপত্তা প্রস্তুতি নিয়েছে। সফরের বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালনকারী সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ সুন্দরবন ও হিরণ পয়েন্ট পর্যবেক্ষণ। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন বাংলাদেশের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, উপকূলীয় সুরক্ষা এবং পর্যটনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাঘ, হরিণ, কুমিরসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণীর আবাসস্থল এই বন। একই সঙ্গে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব মোকাবিলায় উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য সুন্দরবনের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে সুন্দরবনকে কেন্দ্র করে উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিবেশ সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। পর্যটন বাড়াতে হলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নৌযানের চলাচল নিয়ন্ত্রণ, বন্য প্রাণীর আবাসস্থল রক্ষা এবং বননির্ভর জনগোষ্ঠীর জীবিকার বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখতে হবে। পর্যটন থেকে আয় বাড়ানোর পাশাপাশি বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের অন্যতম শর্ত।
অন্যদিকে মোংলা বন্দর বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত এই বন্দর দিয়ে পণ্য আমদানি-রপ্তানি, শিল্পের কাঁচামাল পরিবহন এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালিত হয়। বন্দরের জেটি, পণ্য ওঠানো-নামানোর ব্যবস্থা, নৌপথের নাব্যতা ও পণ্য পরিবহনের দক্ষতা বাড়ানো গেলে ব্যবসায়ীদের সময় ও ব্যয় কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে বন্দরের সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য শুধু জেটি সম্প্রসারণ যথেষ্ট নয়। সড়ক ও নৌপথে পণ্য পরিবহন, সংরক্ষণাগার, পণ্য খালাসের গতি, কাস্টমস কার্যক্রম এবং শিল্পাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নও জরুরি। এসব ক্ষেত্রে সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে মোংলা বন্দরকে ঘিরে নতুন ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড গড়ে উঠতে পারে। প্রধানমন্ত্রীর পরিদর্শনে এসব অবকাঠামোগত সম্ভাবনা ও উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা গুরুত্ব পেতে পারে।
সফরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল। পরিকল্পিত অর্থনৈতিক অঞ্চলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা গেলে নতুন শিল্পকারখানা স্থাপন, স্থানীয় পণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ, সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ বাড়তে পারে। বিশেষ করে কৃষি, মৎস্য, চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণ, খাদ্য সংরক্ষণ ও হালকা শিল্পের মতো খাতে স্থানীয় সম্পদভিত্তিক বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চল পরিদর্শন মানেই সেখানে বিনিয়োগ চূড়ান্ত হওয়া বা শিল্পকারখানা নির্মাণের কাজ শুরু হয়ে যাওয়া নয়। জমির প্রস্তুতি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ, পানি নিষ্কাশন, পরিবেশগত অনুমোদন, যোগাযোগব্যবস্থা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলো বাস্তবায়নের ওপর প্রকল্পের অগ্রগতি নির্ভর করবে। তাই সফরের পর কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত বা প্রকল্প অনুমোদনের ঘোষণা এলে তা সরকারি বক্তব্যের ভিত্তিতেই নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
এদিকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার মধ্যে রয়েছে খানজাহান আলী বিমানবন্দর প্রকল্পের অগ্রগতি। বাগেরহাটের রামপাল এলাকায় পরিকল্পিত এই বিমানবন্দর নিয়ে বহু বছর ধরে আলোচনা চলছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে খুলনা, মোংলা বন্দর এবং সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন ও ব্যবসায়িক যোগাযোগে সুবিধা বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলে আশা রয়েছে। তবে বিমানবন্দর চালুর নির্দিষ্ট সময়সীমা বা নতুন সিদ্ধান্ত সম্পর্কে সরকারি ঘোষণা ছাড়া নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।
সামগ্রিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর এই সফর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়ন সম্ভাবনা পর্যালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। সুন্দরবন সংরক্ষণ, মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ এবং স্থানীয় অবকাঠামোর উন্নয়নকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়া গেলে এ অঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়তে পারে। স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা, সফরের পর্যবেক্ষণ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় বাস্তব অগ্রাধিকার পাবে এবং উন্নয়নের সুফল কর্মসংস্থান, ব্যবসা-বাণিজ্য ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাবে।





