বহিষ্কার ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতে মাহমুদ খালিদ, নতুন মোড় আইনি লড়াইয়ে
ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনকারী মাহমুদ খালিদের বহিষ্কার ও আটক নিয়ে আইনি লড়াই পৌঁছেছে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতে, যা অভিবাসী অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে
বহিষ্কার ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতে মাহমুদ খালিদ, নতুন মোড় আইনি লড়াইয়ে
৬ মিনিটে পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রে ফিলিস্তিনের পক্ষে আন্দোলনের পরিচিত মুখ মাহমুদ খালিদের বহিষ্কার ঠেকানোর আইনি লড়াই নতুন মোড় নিয়েছে। দেশটির সর্বোচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন তিনি। তাঁর আইনজীবীরা চান, অভিবাসনসংক্রান্ত মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই আটক, সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘন এবং সরকারি সিদ্ধান্তের বৈধতা নিয়ে সাধারণ ফেডারেল আদালতে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নিশ্চিত করা হোক। এই আবেদনের মধ্য দিয়ে শুধু খালিদের ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎ নয়, যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসীদের আইনি সুরক্ষা এবং রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক সামনে এসেছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ১৯ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, খালিদের আইনজীবীরা তৃতীয় আপিল আদালতের দেওয়া একটি সিদ্ধান্ত বাতিলের আবেদন জানিয়ে সর্বোচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন। ওই সিদ্ধান্তে বলা হয়েছিল, অভিবাসন আইন অনুযায়ী তাঁর আটক ও বহিষ্কারসংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে নিম্ন আদালতে বিচার চাওয়ার সুযোগ সীমিত। ফলে অভিবাসন কার্যক্রমের নির্দিষ্ট ধাপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁর অভিযোগের বিচার সাধারণ ফেডারেল আদালতে করা যাবে কি না, সেটিই এখন বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে। খালিদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের পদক্ষেপ শুরু হয় ২০২৫ সালের মার্চে। তিনি তখন নিউইয়র্কের কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের সাবেক শিক্ষার্থী এবং ফিলিস্তিনপন্থী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত সংগঠক। গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানবিরোধী আন্দোলন এবং বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে প্রচারের কারণে তিনি আলোচনায় আসেন। ২০২৫ সালের মার্চে নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ভবনে তাঁকে গ্রেপ্তার করে অভিবাসন কর্মকর্তারা। সে সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের বৈধ অনুমতিপ্রাপ্ত ছিলেন। খালিদের জন্ম সিরিয়ার একটি ফিলিস্তিনি শরণার্থীশিবিরে। তিনি আলজেরিয়ার নাগরিক এবং যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতিধারী। তাঁর স্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। তাঁদের সন্তানও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। ফলে তাঁর আটক ও বহিষ্কারের প্রশ্নটি কেবল অভিবাসন আইনের বিষয় হয়ে থাকেনি; পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা এবং দীর্ঘদিনের বসবাসের দেশে থাকার অধিকার নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি থাকলেই যে কোনো পরিস্থিতিতে বহিষ্কারের প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ অব্যাহতি পাওয়া যায়, এমন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনে নির্দিষ্ট শর্তে স্থায়ী বাসিন্দার বিরুদ্ধেও বহিষ্কারের ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বক্তব্যের কেন্দ্রে রয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা, ইহুদি শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং পররাষ্ট্রনীতিসংক্রান্ত স্বার্থ। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও অভিবাসন আইনের একটি বিশেষ বিধান ব্যবহার করে খালিদের অবস্থানকে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির জন্য ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচনা করেছিলেন। সরকারের অভিযোগ, কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০২৪ সালে ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলন ও সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড ইহুদি শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিকূল পরিবেশ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছিল। তবে সরকারের অভিযোগ এবং আদালতে প্রমাণিত অপরাধ এক বিষয় নয়। খালিদ তাঁর বিরুদ্ধে নেওয়া পদক্ষেপকে রাজনৈতিক মতপ্রকাশের কারণে শাস্তি দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। তাঁর আইনজীবীদের বক্তব্য, ফিলিস্তিনিদের অধিকারের পক্ষে কথা বলার কারণে কাউকে আটক বা বহিষ্কারের লক্ষ্যবস্তু করা হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানপ্রদত্ত বাক্স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। গ্রেপ্তারের পর খালিদকে লুইজিয়ানার একটি অভিবাসন আটককেন্দ্রে নেওয়া হয়। সেখানে তিনি তিন মাসের বেশি সময় আটক ছিলেন। তাঁর মুক্তির জন্য আইনজীবীরা নিউ জার্সির ফেডারেল আদালতে আবেদন করেন। বিচারক মাইকেল ফারবিয়ার্জ ২০২৫ সালের জুনে তাঁকে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ দেন। একই সময়ে আদালত তাঁর বহিষ্কারের বিরুদ্ধে সুরক্ষামূলক আদেশও দেন। ফলে অভিবাসনসংক্রান্ত কার্যক্রম চললেও তাঁকে অবিলম্বে দেশ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পথ বাধাগ্রস্ত হয়। খালিদের পক্ষের যুক্তি ছিল, সরকারের পদক্ষেপের সাংবিধানিক বৈধতা পরীক্ষা করার জন্য আদালতের হস্তক্ষেপ জরুরি।
কিন্তু পরবর্তী সময়ে মামলাটি জটিল হয়ে ওঠে। ২০২৬ সালের ১৫ জানুয়ারি তৃতীয় আপিল আদালতের তিন বিচারকের একটি বেঞ্চ দুই-এক ভোটে নিম্ন আদালতের এখতিয়ার নিয়ে সরকারের পক্ষে সিদ্ধান্ত দেয়। আদালতের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারকদের মতে, বহিষ্কারপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত আইনি প্রশ্নগুলো নির্দিষ্ট আপিলপদ্ধতির মধ্য দিয়ে নিষ্পত্তি করতে হবে। ফলে জেলা আদালতে খালিদের করা আবেদন এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়। এরপর তাঁর আইনজীবীরা আপিল আদালতের সব বিচারককে নিয়ে পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন। ২২ মে ২০২৬ আদালত ছয়-চার নয়, বরং ছয়-জনের বিপরীতে পাঁচ-জনের ভোটে পুনর্বিবেচনার আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। এর পরই সর্বোচ্চ আদালতে যাওয়ার প্রস্তুতি চূড়ান্ত হয়। ১৯ অক্টোবর ২০২৬ খালিদের আইনজীবীরা সর্বোচ্চ আদালতে নতুন আবেদন জমা দেন। তাঁদের মূল প্রশ্ন হলো, অভিবাসন আইন কি সত্যিই সাধারণ ফেডারেল আদালতকে এমন অভিযোগ শুনতে বাধা দেয়, যেখানে কোনো ব্যক্তির দাবি, তাঁকে সংবিধানসুরক্ষিত বক্তব্যের কারণে আটক করা হয়েছে? তাঁরা চান, আদালত স্পষ্ট করুক যে অভিবাসন কার্যক্রম চলমান থাকলেও বেআইনি আটক এবং মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ বিচার করার সাংবিধানিক সুযোগ থাকতে পারে। তাঁদের মতে, অভিবাসন আদালতে সব অভিযোগের কার্যকর প্রতিকার পাওয়া কঠিন হতে পারে, কারণ ওই আদালতগুলো বিচার বিভাগের স্বাধীন কাঠামোর বাইরে থেকে বিচার বিভাগের পরিবর্তে নির্বাহী বিভাগের অধীনে পরিচালিত হয়।
এই মামলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। সর্বোচ্চ আদালতে আবেদন করা মানেই আদালত মামলাটি শুনতে সম্মত হয়েছে, এমন নয়। প্রথমে বিচারপতিরা বিবেচনা করবেন, মামলাটি গ্রহণ করে পূর্ণাঙ্গ শুনানি করা হবে কি না। তাঁরা মামলা গ্রহণ করলে উভয় পক্ষের লিখিত বক্তব্য, আইনি যুক্তি এবং প্রয়োজনে মৌখিক শুনানি হতে পারে। এরপর আদালত সিদ্ধান্ত দেবেন। আবার মামলা গ্রহণ না করলে আপিল আদালতের সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পথ খুলে যেতে পারে। ফলে আবেদন জমা দেওয়ার ঘটনাকে খালিদের পক্ষে চূড়ান্ত বিজয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে খালিদের বিরুদ্ধে বহিষ্কারসংক্রান্ত আরেকটি আইনি প্রক্রিয়াও চলছে। অভিবাসন বিচারক ২০২৫ সালে তাঁর বহিষ্কারের পক্ষে সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। পরে অভিবাসন আপিল বোর্ডও তাঁর আপত্তি প্রত্যাখ্যান করে। ২০২৬ সালের এপ্রিলের সিদ্ধান্তের পর তাঁকে আলজেরিয়া অথবা সিরিয়ায় পাঠানোর আশঙ্কা তৈরি হয়। তাঁর আইনজীবীরা ওই বহিষ্কার আদেশের বিরুদ্ধেও পৃথক আইনি লড়াই চালাচ্ছেন। আগস্ট ২০২৬-এ তাঁরা পঞ্চম আপিল আদালতে বহিষ্কারসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন। অর্থাৎ, সর্বোচ্চ আদালতে আটকসংক্রান্ত মামলাটি এবং বহিষ্কার আদেশের বিরুদ্ধে আপিল দুটি পৃথক আইনি পথ। একটি মামলায় অগ্রগতি ঘটলেই অন্যটির নিষ্পত্তি হয়ে যাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
এই লড়াইয়ের প্রভাব খালিদের বাইরেও বিস্তৃত হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনে অংশ নেওয়া বিদেশি শিক্ষার্থী ও গবেষকদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে ইতিমধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সর্বোচ্চ আদালত যদি বলেন, অভিবাসনপ্রক্রিয়া চললেও আটক ও সাংবিধানিক অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ সাধারণ ফেডারেল আদালতে তোলা সম্ভব, তাহলে একই ধরনের মামলায় অন্য অভিবাসীরাও সেই সিদ্ধান্তের সুবিধা পেতে পারেন। অন্যদিকে আদালত যদি সরকারের অবস্থানকে সমর্থন করেন, তাহলে অভিবাসন কার্যক্রম শেষ হওয়ার আগে এ ধরনের অভিযোগের বিচার পাওয়া আরও কঠিন হতে পারে। তবে সম্ভাব্য প্রভাব কতটা বিস্তৃত হবে, তা নির্ভর করবে আদালতের চূড়ান্ত রায়ের ভাষা ও পরিধির ওপর। খালিদ সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, তাঁর লড়াই কেবল যুক্তরাষ্ট্রে নিজের থাকার অধিকার নিয়ে নয়; ফিলিস্তিনিদের পক্ষে কথা বলার স্বাধীনতা নিয়েও। তাঁর আইনজীবীদের যুক্তি, রাজনৈতিক বক্তব্যের কারণে কাউকে শাস্তি দেওয়ার অভিযোগ উঠলে স্বাধীন বিচারিক পর্যালোচনা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যদিকে সরকার বলছে, অভিবাসন আইন ও পররাষ্ট্রনীতিসংক্রান্ত সিদ্ধান্তের নিজস্ব আইনি কাঠামো রয়েছে এবং সেই কাঠামো অনুসরণ করেই মামলাগুলোর নিষ্পত্তি হওয়া উচিত। এই দুই অবস্থানের সংঘাত এখন সর্বোচ্চ আদালতের সামনে।