ইরান সংঘাতের আগুনে জ্বলছে জ্বালানির বাজার, ক্যালিফোর্নিয়ায় ডিজেলের দাম গ্যালনপ্রতি ৮.৮০ ডলারের শঙ্কা!
যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সংঘাত, বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ সংকট, উচ্চ কর ও পরিশোধন ব্যয়ের চাপে ক্যালিফোর্নিয়ায় ডিজেলের দাম রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে ডিজেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। জ্বালানিচালিত পরিবহন, কৃষিকাজ এবং পণ্য সরবরাহের ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে এই মূল্যবৃদ্ধি। মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচলে বিঘ্ন, পরিশোধনাগারের সীমিত উৎপাদন এবং ক্যালিফোর্নিয়ার নিজস্ব জ্বালানি বাজারের কাঠামোগত সমস্যাকে এই পরিস্থিতির প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের গাড়িচালকদের সংগঠন এএএ-এর ১৮ অক্টোবরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ক্যালিফোর্নিয়ায় ডিজেলের দৈনিক গড় দাম ছিল গ্যালনপ্রতি ৮ ডলার ৫১ সেন্টের বেশি। আগের বছরের একই সময়ে এই দাম ছিল প্রায় ৫ ডলার ১৩ সেন্ট। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে গড় দাম বেড়েছে প্রায় ৬৬ শতাংশ। তবে দাম প্রতিদিন এবং অঞ্চলভেদে পরিবর্তিত হয়। তাই রাজ্যের সর্বত্র ডিজেলের দাম গ্যালনপ্রতি ৮ ডলার ৮০ সেন্ট এমন দাবি সঠিক নয়। কিছু এলাকায় এই দামের কাছাকাছি বা তার চেয়ে বেশি মূল্য দেখা যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের সাপ্তাহিক হিসাবেও মূল্যবৃদ্ধির চিত্র স্পষ্ট। ১২ অক্টোবর শেষ হওয়া সপ্তাহে ক্যালিফোর্নিয়ায় সড়কযানের ডিজেলের গড় খুচরা মূল্য ছিল গ্যালনপ্রতি ৮ ডলার ৯ সেন্টের কাছাকাছি। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গড় ছিল প্রায় ৬ ডলার ১৮ সেন্ট। অর্থাৎ ক্যালিফোর্নিয়ায় ডিজেলের দাম জাতীয় গড়ের চেয়ে প্রায় ১ ডলার ৯১ সেন্ট বেশি।
এই মূল্যবৃদ্ধির পেছনে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। রয়টার্সের ১৬ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা এবং রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোতে হামলার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়েছে। ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দর ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১১০ ডলার পর্যন্ত উঠেছিল। সরবরাহ কমে যাওয়ার আশঙ্কায় ব্যবসায়ীরা ভবিষ্যৎ বাজার নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। এর প্রভাব পরিশোধিত জ্বালানি, বিশেষ করে ডিজেলের বাজারেও পড়ছে।
হরমুজ প্রণালি এই সংকটের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। পারস্য উপসাগর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পরিবহনের জন্য এই জলপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংঘাতের কারণে সেখানে জাহাজ চলাচল বাধাগ্রস্ত হলে তেল পরিবহনের সময়, বীমা এবং পরিবহন ব্যয় বেড়ে যায়। সরবরাহ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামেও অতিরিক্ত চাপ পড়ে। ক্যালিফোর্নিয়ার জ্বালানি কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যাতেও এই সংঘাত এবং সমুদ্রপথে বিঘ্নকে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
তবে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিকে শুধু অপরিশোধিত তেলের দাম দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। অপরিশোধিত তেল থেকে ডিজেল উৎপাদনের জন্য পরিশোধনাগারের প্রয়োজন। বিভিন্ন অঞ্চলে পরিশোধনাগারের উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, রক্ষণাবেক্ষণ, সীমিত মজুত এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহ কমে যাওয়াও দাম বাড়াচ্ছে। রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বর্তমান সংকটে পরিশোধন সক্ষমতার ঘাটতি এবং কমে যাওয়া মজুত বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ক্যালিফোর্নিয়ার নিজস্ব বাজারের কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অঙ্গরাজ্যটিতে পরিবেশগত মানদণ্ড অনুযায়ী বিশেষ ধরনের জ্বালানি ব্যবহার করা হয়। এই নির্দিষ্ট মানের জ্বালানি উৎপাদন করতে পারে এমন পরিশোধনাগারের সংখ্যা সীমিত। পশ্চিম উপকূলের জ্বালানি বাজার যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য অঞ্চলের পাইপলাইন ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনামূলকভাবে কম সংযুক্ত হওয়ায় অন্য অঞ্চল থেকে দ্রুত জ্বালানি এনে ঘাটতি পূরণ করাও কঠিন। ফলে উৎপাদন বা পরিবহনে বিঘ্ন ঘটলে স্থানীয় বাজারে তার প্রভাব তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
কর ও পরিবেশগত কর্মসূচির ব্যয়ও খুচরা দামে প্রভাব ফেলে। ক্যালিফোর্নিয়ায় ডিজেলের ওপর অঙ্গরাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের কর রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরিশোধন, পরিবহন, সংরক্ষণ এবং বিক্রেতার পরিচালন ব্যয়। তবে ডিজেলের বর্তমান দাম বৃদ্ধির সম্পূর্ণ কারণ শুধু কর এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ নেই। আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা এবং পরিশোধিত জ্বালানির সরবরাহসংকটও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
এই পরিস্থিতির প্রভাব সরাসরি পড়ছে ট্রাক পরিবহন, কৃষি এবং নির্মাণশিল্পে। পণ্যবাহী ভারী ট্রাকের বড় অংশ ডিজেলচালিত। জ্বালানির দাম বাড়লে পণ্য পরিবহনের খরচ বাড়ে, যা শেষ পর্যন্ত খাদ্য, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও নির্মাণসামগ্রীর দামে প্রভাব ফেলতে পারে। কৃষকেরাও ফসল কাটার যন্ত্র, ট্রাক্টর এবং পণ্য পরিবহনে বেশি ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছেন। ফলে উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে।
ক্যালিফোর্নিয়ার কর্তৃপক্ষ জ্বালানি বাজার পর্যবেক্ষণ এবং মূল্যসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে। তবে স্বল্পমেয়াদে দাম কতটা কমবে, তা নির্ভর করবে আন্তর্জাতিক সংঘাতের গতিপ্রকৃতি, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল, অপরিশোধিত তেলের দর এবং পরিশোধনাগারের উৎপাদন পরিস্থিতির ওপর। সরবরাহ স্বাভাবিক হলেও খুচরা বাজারে তার প্রভাব পড়তে কিছুটা সময় লাগতে পারে।
সব মিলিয়ে, ক্যালিফোর্নিয়ায় ডিজেলের দাম গ্যালনপ্রতি ৮ ডলার ৮০ সেন্ট এই বক্তব্য কিছু এলাকার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হলেও পুরো অঙ্গরাজ্যের গড় মূল্য হিসেবে সঠিক নয়। সর্বশেষ যাচাইযোগ্য দৈনিক হিসাবে রাজ্যটির গড় দাম ছিল প্রায় ৮ ডলার ৫১ সেন্ট। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, আন্তর্জাতিক সরবরাহে বিঘ্ন, পরিশোধন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং স্থানীয় বাজারের উচ্চ ব্যয় মিলেই এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে।





