যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রোববার সন্ধ্যায় হোয়াইট হাউসে ফিরে সাংবাদিকদের প্রশ্নের মুখে পড়েছেন। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে সম্ভাব্য শীর্ষ বৈঠক নিয়ে সাংবাদিকেরা তাঁকে প্রশ্ন করেন। তবে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা না দিয়ে শুধু বলেন, ‘ভালোই এগোচ্ছে।’ এরপর সাংবাদিকদের দিকে আবার হাত নেড়ে তিনি হোয়াইট হাউসের ভেতরে চলে যান। ঘটনাটির সরবরাহ করা বিবরণে এই দৃশ্যের কথা বলা হলেও, নির্দিষ্ট সময়ের ভিডিও বা সরকারি বিবৃতি থেকে তাঁর বক্তব্যের পূর্ণ প্রেক্ষাপট স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। তবে তিন নেতার সম্ভাব্য বৈঠক নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা চলছে—এমন তথ্য বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। বিশেষ করে ইউক্রেন যুদ্ধ, রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, জ্বালানি সরবরাহ এবং পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসায় সম্ভাব্য বৈঠকটি আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন গুরুত্ব পেয়েছে। তবে বৈঠক নিয়ে আলোচনা হওয়া এবং বৈঠক চূড়ান্ত হওয়া এক বিষয় নয়। এখন পর্যন্ত প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে এটিকে সম্ভাব্য উদ্যোগ হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে সম্ভাব্য ত্রিপক্ষীয় বৈঠক নিয়ে সাম্প্রতিক আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইউক্রেন যুদ্ধের ভবিষ্যৎ। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুতিন ট্রাম্প ও শির সঙ্গে একটি বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছেন। আগামী নভেম্বরে চীনের শেনঝেনে এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংস্থার শীর্ষ সম্মেলনের সময় এমন বৈঠকের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে বৈঠকের চূড়ান্ত সময়সূচি, আলোচ্যসূচি এবং তিন নেতার অংশগ্রহণের বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি। রাশিয়ার পক্ষ থেকে সম্ভাব্য বৈঠকের বিষয়ে আগ্রহের ইঙ্গিত আগেও দেওয়া হয়েছে। গত ১ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে পুতিনের বক্তব্য তুলে ধরে বলা হয়, ট্রাম্প ও শির সঙ্গে বৈঠকের ধারণার বিষয়ে মস্কো ইতিবাচক। তবে পুতিন একই সঙ্গে আলোচনার বিষয়বস্তু নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছেন। অর্থাৎ, তিন দেশের নেতারা এক টেবিলে বসতে পারেন—এমন সম্ভাবনা থাকলেও কী নিয়ে আলোচনা হবে, সেটি এখনো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সম্ভাব্য বৈঠকের ক্ষেত্রে ইউক্রেন যুদ্ধ বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে। ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসনের পর থেকে ইউক্রেনের নিরাপত্তা, ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ এবং ইউরোপের সামরিক স্থিতিশীলতা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ওয়াশিংটনের সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত ইউক্রেনের যুদ্ধ পরিচালনা এবং আলোচনার সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করতে পারে।
অন্যদিকে রাশিয়া চায়, যুদ্ধের অবসান নিয়ে এমন আলোচনা হোক, যাতে মস্কোর নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় আসে। ইউক্রেনের অবস্থান হলো, দেশটির ভবিষ্যৎ এবং ভূখণ্ড নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ইউক্রেনকে বাদ দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। তাই পুতিন, ট্রাম্প ও শির মধ্যে কোনো বৈঠক হলে সেখানে ইউক্রেনের প্রতিনিধিত্ব থাকবে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক প্রশ্ন হয়ে উঠতে পারে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রস্তাবিত বৈঠকের একটি সম্ভাব্য রূপরেখায় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে অন্তর্ভুক্ত না করার বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে এটি এখনো সম্ভাব্য বৈঠকসংক্রান্ত প্রতিবেদনের অংশ, কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।
ট্রাম্প প্রশাসনের সাম্প্রতিক রাশিয়াসংক্রান্ত সিদ্ধান্তও এই আলোচনার গুরুত্ব বাড়িয়েছে। রয়টার্সের ১৮ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাশিয়ার বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা ও শুল্ক কার্যকরের বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন সাময়িক বিরতি দিয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, এসব ব্যবস্থার অর্থনৈতিক প্রভাব মূল্যায়নে ৬০ দিন পর্যন্ত সময় নেওয়া হতে পারে। প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী, সিদ্ধান্তটির সঙ্গে জ্বালানির বাজার, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এবং রাশিয়াকে আলোচনার টেবিলে রাখার বিষয়গুলো জড়িত। এই সিদ্ধান্ত অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। রাশিয়ার ওপর চাপ কমালে ইউক্রেন যুদ্ধে মস্কোর অবস্থান শক্তিশালী হতে পারে বলে সমালোচকেরা আশঙ্কা করছেন। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিও নিষেধাজ্ঞা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর আশঙ্কা, রাশিয়ার ওপর অর্থনৈতিক চাপ কমে গেলে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি, আলোচনার সুযোগ ধরে রাখা এবং জ্বালানি সরবরাহের পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি বাণিজ্য নিয়েও সাম্প্রতিক সময়ে নতুন আলোচনা হয়েছে। ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে রাশিয়ার ডিজেল সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে। প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, এই ব্যবস্থা জ্বালানির বাজারে সরবরাহ বাড়াতে এবং ভোক্তাদের ওপর মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমাতে সহায়তা করতে পারে। তবে সমালোচকেরা মনে করছেন, এমন সমঝোতা রাশিয়ার রাজস্ব আয় বাড়াতে পারে এবং ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মস্কোর ওপর চাপ প্রয়োগের প্রচেষ্টাকে দুর্বল করতে পারে। ফলে জ্বালানি বাণিজ্য এখন শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সম্ভাব্য অংশগ্রহণও এই কূটনৈতিক উদ্যোগকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি এবং রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে চীনের অবস্থান ইউক্রেন যুদ্ধসংক্রান্ত আলোচনায় প্রভাব ফেলতে পারে। বেইজিং একদিকে রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখছে, অন্যদিকে ইউরোপ ও ক)যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনান করে। ফলে কোনো ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত চীনেরজন্যও কৌশলগত ভারসাম্যের বিষয় হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্কেও সাম্প্রতিক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি এবং মতপার্থক্য—দুই-ই দেখা গেছে। গত সেপ্টেম্বরে শির যুক্তরাষ্ট্র সফরের সময় দুই দেশের নেতারা বাণিজ্য, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সামরিক যোগাযোগ এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করেন। ওই সফরে দুই দেশ বাণিজ্যিক বিরতি বাড়ানোর পাশাপাশি সামরিক পর্যায়ে সংকট মোকাবিলার যোগাযোগ জোরদার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাজনিত ঝুঁকি নিয়ে আলোচনার বিষয়ে সম্মত হয়েছিল। তবে তাইওয়ান, প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ এবং বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতার মতো বিষয়গুলোতে দুই দেশের মতপার্থক্য রয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে ট্রাম্পের ‘ভালোই এগোচ্ছে’ মন্তব্যটি সম্ভাব্য বৈঠক নিয়ে আশাবাদের ইঙ্গিত দিতে পারে। কিন্তু বক্তব্যটি ঠিক কোন প্রশ্নের জবাবে দেওয়া হয়েছিল, তা পূর্ণাঙ্গ ভিডিও ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তাই মন্তব্যটিকে তিন নেতার বৈঠক চূড়ান্ত হওয়ার ঘোষণা হিসেবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। কূটনৈতিক আলোচনায় নেতাদের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য অনেক সময় চলমান যোগাযোগের ইঙ্গিত দেয়, কিন্তু আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের জন্য সাধারণত সময়সূচি, আলোচ্যসূচি এবং সংশ্লিষ্ট সরকারের নিশ্চিতকরণ প্রয়োজন হয়। আগামী নভেম্বরে চীনে অনুষ্ঠেয় এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংস্থার সম্মেলনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আগ্রহ বাড়ছে। ওই সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের নেতাদের উপস্থিতির সম্ভাবনা থাকায় দ্বিপক্ষীয় কিংবা ত্রিপক্ষীয় আলোচনার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে সম্মেলনের আয়োজন এবং এর ফাঁকে আলাদা বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়া এক বিষয় নয়। তিন নেতার সম্ভাব্য বৈঠক বাস্তবে রূপ নেবে কি না, তা নির্ভর করবে তাঁদের অংশগ্রহণ, আলোচনার উদ্দেশ্য এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সম্মতির ওপর।