কানাডার অভিবাসননীতিতে কড়াকড়ি, কমছে অস্থায়ী বাসিন্দা; আবাসন ও চাকরির বাজারে কী প্রভাব?
কানাডায় অভিবাসনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনায় কমছে নতুন অস্থায়ী বাসিন্দাদের আগমনের লক্ষ্যমাত্রা। আবাসন, কর্মসংস্থান ও বিদেশি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতে পড়তে পারে এর প্রভাব।
কানাডার অভিবাসননীতিতে নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপের প্রভাব পড়তে পারে বিদেশি শিক্ষার্থী, অস্থায়ী কর্মী, নতুন অভিবাসনপ্রত্যাশী এবং আবাসন ও শ্রমবাজারে। দেশটির সরকারের ২০২৬ থেকে ২০২৮ সালের অভিবাসন পরিকল্পনায় নতুন অস্থায়ী বাসিন্দাদের আগমন কমানো, স্থায়ী বাসিন্দা গ্রহণের সংখ্যা স্থিতিশীল রাখা এবং অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপের অর্থ এই নয় যে কানাডায় অভিবাসন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
কানাডার অভিবাসন, শরণার্থী ও নাগরিকত্ববিষয়ক বিভাগের প্রকাশিত পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ সালে নতুন অস্থায়ী বাসিন্দাদের আগমনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৮৫ হাজার। ২০২৭ ও ২০২৮ সালে এই লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে প্রতি বছর ৩ লাখ ৭০ হাজার করার পরিকল্পনা রয়েছে। এসব লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ও অস্থায়ী বিদেশি কর্মীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
অন্যদিকে, ২০২৬ থেকে ২০২৮ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর ৩ লাখ ৮০ হাজার স্থায়ী বাসিন্দা গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে। অর্থাৎ, অস্থায়ী বাসিন্দাদের আগমনে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হলেও স্থায়ী অভিবাসন পুরোপুরি বন্ধ করা হচ্ছে না। সরকারের পরিকল্পনায় অর্থনৈতিক অভিবাসন, পারিবারিক পুনর্মিলন এবং মানবিক বিবেচনায় অভিবাসনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
আবাসনসংকট কমানোর লক্ষ্য
কানাডার অভিবাসননীতিতে পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হিসেবে আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য জনসেবার ওপর চাপ কমানোর বিষয়টি উল্লেখ করেছে দেশটির সরকার। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং আবাসনের চাহিদা নিয়ে উদ্বেগের প্রেক্ষাপটে অভিবাসনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারের ঘোষিত লক্ষ্য হলো, ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ দেশের মোট জনসংখ্যার মধ্যে অস্থায়ী বাসিন্দাদের অংশ ৫ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা। পাশাপাশি ২০২৭ সালের পর স্থায়ী বাসিন্দাদের বার্ষিক আগমন মোট জনসংখ্যার ১ শতাংশের নিচে রাখার লক্ষ্যও রয়েছে।
তবে অভিবাসনসংখ্যা কমলেই বাড়িভাড়া বা বাড়ির দাম দ্রুত কমে যাবে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। আবাসনের সরবরাহ, নতুন বাড়ি নির্মাণ, সুদের হার, স্থানীয় জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং অঞ্চলভেদে চাহিদার মতো বিষয়ও আবাসনবাজারকে প্রভাবিত করে। তাই নতুন নীতির কারণে বাড়িভাড়া কতটা কমবে, তা নির্দিষ্ট করে বলার মতো নিশ্চিত তথ্য এখনো নেই।
বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য কী অর্থ বহন করছে
কানাডায় উচ্চশিক্ষার জন্য যেতে আগ্রহী বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য নতুন পরিকল্পনাটি গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী, ২০২৬ সালে নতুন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আগমনের সংখ্যা ১ লাখ ৫৫ হাজার এবং ২০২৭ ও ২০২৮ সালে প্রতি বছর ১ লাখ ৫০ হাজার নির্ধারণ করা হয়েছে।
এই পরিসংখ্যান নতুন শিক্ষার্থীদের আগমনের লক্ষ্যমাত্রা নির্দেশ করে। এটি কানাডায় ইতিমধ্যে অধ্যয়নরত সব বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা নয়। একইভাবে, লক্ষ্যমাত্রা কমানোর অর্থ এই নয় যে সব শিক্ষার্থীর অনুমতি বাতিল হবে অথবা প্রত্যেক আবেদনকারী প্রত্যাখ্যাত হবেন।
তবে আবেদনকারীদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্বাচন, পড়াশোনার খরচ, আর্থিক সামর্থ্যের প্রমাণ এবং প্রযোজ্য অনুমতিপত্রের শর্ত পূরণ করা গুরুত্বপূর্ণ। আবেদন করার আগে কানাডা সরকারের সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করা প্রয়োজন। কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হলেই পড়াশোনার অনুমতি নিশ্চিত হয়ে যায় না।
চাকরির বাজারে কী পরিবর্তন আসতে পারে
কানাডার পরিকল্পনায় বিদেশি কর্মীদের আগমন নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নির্দিষ্ট খাতে দক্ষ জনশক্তি আকর্ষণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষ কারিগরি পেশা এবং উদীয়মান প্রযুক্তির মতো খাতে প্রয়োজনীয় কর্মী ধরে রাখা ও নিয়োগের বিষয়টি সরকারের অগ্রাধিকারের মধ্যে রয়েছে।
২০২৬ সালের পরিকল্পনায় নতুন অস্থায়ী কর্মীদের আগমনের লক্ষ্যমাত্রা ২ লাখ ৩০ হাজার। ২০২৭ ও ২০২৮ সালে তা কমিয়ে প্রতি বছর ২ লাখ ২০ হাজার করার কথা বলা হয়েছে। তবে এই সংখ্যা দিয়ে কানাডার সব ধরনের চাকরির বাজারে কর্মীর চাহিদা বা বেকারত্বের হার নির্ধারণ করা যায় না।
অভিবাসনসংখ্যা কমানোর ফলে কিছু ক্ষেত্রে কর্মী নিয়োগের প্রতিযোগিতা কমতে পারে, আবার বিদেশি কর্মীর ওপর নির্ভরশীল কিছু শিল্পে কর্মী পাওয়া কঠিনও হতে পারে। কোন খাতে কী প্রভাব পড়বে, তা নির্ভর করবে স্থানীয় কর্মীর প্রাপ্যতা, মজুরি, দক্ষতার ঘাটতি এবং সংশ্লিষ্ট অভিবাসন কর্মসূচির নিয়মের ওপর।
দক্ষ কর্মীদের স্থায়ী হওয়ার সুযোগ
পরিকল্পনায় কানাডায় ইতিমধ্যে বসবাস ও কাজ করছেন এমন নির্দিষ্ট দক্ষ অস্থায়ী কর্মীদের স্থায়ী বাসিন্দা হওয়ার সুযোগ সম্প্রসারণের উদ্যোগও রয়েছে। সরকারের ঘোষণায় ২০২৬ ও ২০২৭ সালে দুই বছরে সর্বোচ্চ ৩৩ হাজার দক্ষ অস্থায়ী কর্মীকে স্থায়ী বাসিন্দায় রূপান্তরের কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে স্থানীয় জনগোষ্ঠীতে প্রতিষ্ঠিত এবং প্রয়োজনীয় খাতে কর্মরত ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে।
এটি সবার জন্য স্বয়ংক্রিয় স্থায়ী বসবাসের অনুমতি নয়। কারা যোগ্য হবেন, তা সংশ্লিষ্ট কর্মসূচির শর্ত এবং সরকারি প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করবে। আবেদনকারীদের নিজেদের যোগ্যতা ও প্রযোজ্য নিয়ম যাচাই করতে হবে।
অভিবাসনপ্রত্যাশীদের করণীয়
বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশ থেকে কানাডায় যেতে আগ্রহীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত অসম্পূর্ণ বা অতিরঞ্জিত তথ্যের ওপর নির্ভর না করা। অভিবাসননীতির লক্ষ্যমাত্রা, আবেদন গ্রহণের নিয়ম এবং ব্যক্তিগত যোগ্যতা এক বিষয় নয়।
শিক্ষার্থী, কর্মী কিংবা স্থায়ী বসবাসের আবেদনকারী সবারই আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মসূচির সর্বশেষ শর্ত দেখা উচিত। চাকরির প্রস্তাব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি কিংবা স্থায়ী বসবাসের নিশ্চয়তা দেওয়ার নামে অর্থ দাবি করা মধ্যস্থতাকারীদের ব্যাপারেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
কানাডার ২০২৬–২০২৮ সালের পরিকল্পনা অভিবাসন বন্ধ করার পরিবর্তে অভিবাসনের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনীতির জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার দিকে এগোচ্ছে। আবাসন ও জনসেবার ওপর চাপ কমানো সরকারের ঘোষিত উদ্দেশ্য হলেও বাস্তবে বাড়িভাড়া, চাকরি এবং নতুন অভিবাসীদের সুযোগ কতটা পরিবর্তিত হবে, তা পরবর্তী সরকারি পরিসংখ্যান ও বাস্তব পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে।





