নেতানিয়াহুকে ফের প্রধানমন্ত্রী দেখতে চান ট্রাম্প, নির্বাচনের আগে দিলেন জোরালো প্রকাশ্য সমর্থন
ইসরায়েলের নির্বাচনের আগে নেতানিয়াহুর প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানালেন ট্রাম্প। ইরানবিরোধী সামরিক সহযোগিতার প্রশংসার পাশাপাশি বাড়ল ইসরায়েলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা।
নেতানিয়াহুকে ফের প্রধানমন্ত্রী দেখতে চান ট্রাম্প, নির্বাচনের আগে দিলেন জোরালো প্রকাশ্য সমর্থন
৬ মিনিটে পড়ুন
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়ে দেশটির আসন্ন নির্বাচনের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। রোববার, ১৮ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে একজন ‘মহান যোদ্ধা প্রধানমন্ত্রী’ এবং ইরানের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ‘শান্তির আরও বড় অংশীদার’ হিসেবে বর্ণনা করেন। আগামী ২৭ অক্টোবর ইসরায়েলের জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। নির্বাচনের মাত্র নয় দিন আগে ট্রাম্পের এই ঘোষণা নেতানিয়াহুর জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সমর্থন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রয়টার্স ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও এই সমর্থনের খবর প্রকাশিত হয়েছে। ট্রাম্প তাঁর বার্তায় নেতানিয়াহুর নেতৃত্বের প্রশংসা করে বলেন, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী প্রচণ্ড বিরোধিতার মধ্যেও শক্তিশালী, সাহসী ও বিচক্ষণ অবস্থান ধরে রেখেছেন। এমনকি নিজ দেশের ভেতর থেকেও তিনি বিরোধিতার মুখোমুখি হয়েছেন বলে উল্লেখ করেন ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, কঠিন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ যেখানে চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে পারে, নেতানিয়াহু সেখানে আরও দৃঢ় হয়েছেন। ট্রাম্প আরও স্পষ্টভাবে জানান, আসন্ন নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার দৌড়ে নেতানিয়াহুর প্রতি তাঁর পূর্ণাঙ্গ সমর্থন রয়েছে। ইসরায়েলের জনগণের উদ্দেশে দেওয়া বার্তায় তিনি নেতানিয়াহুকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশিত অংশীদার হিসেবে তুলে ধরেন। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক সহযোগিতাকে এই সমর্থনের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে সামনে আনেন তিনি। নেতানিয়াহুও ট্রাম্পের এই সমর্থনের জবাব দিয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ধন্যবাদ জানিয়ে দুই দেশের যৌথ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তাঁর সংক্ষিপ্ত বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল, তাঁরা একসঙ্গে কাজটি শেষ করবেন। দুই নেতার এই কথাবার্তা থেকে স্পষ্ট যে ইরানকে কেন্দ্র করে তাঁদের কৌশলগত সহযোগিতা এখনো তাঁদের রাজনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। তবে ট্রাম্পের এই সমর্থন এমন এক সময়ে এল, যখন নেতানিয়াহুকে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আগামী নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন লিকুদ দল এবং সম্ভাব্য জোট সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিভিন্ন জনমত জরিপে কোনো পক্ষেরই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত দেখা যাচ্ছে না। ইসরায়েলের সংসদে সরকার গঠনের জন্য ১২০টি আসনের মধ্যে অন্তত ৬১টি আসনের সমর্থন প্রয়োজন। ফলে শুধু জনপ্রিয়তা নয়, নির্বাচনের পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে জোট গঠনের সমীকরণও নেতানিয়াহুর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। ইসরায়েলের নির্বাচন সাধারণ সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের পদ্ধতিতে হয় না। ভোটাররা সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য ভোট দেন। এরপর সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন অর্জনের ভিত্তিতে সরকার গঠিত হয়। এ কারণে কোনো দলের ভোটের হার বেশি হলেও তারা এককভাবে সরকার গঠনের মতো আসন না পেলে অন্য দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা করতে হয়। নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণেও এই বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। ট্রাম্পের সমর্থন নেতানিয়াহুর প্রচারণায় কিছুটা সুবিধা এনে দিতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। বিশেষ করে যেসব ভোটার নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব নিয়ে দ্বিধায় রয়েছেন, তাঁদের একটি অংশকে আবার তাঁর পক্ষে আনতে এই সমর্থন ভূমিকা রাখতে পারে। তবে শুধু বিদেশি নেতার প্রশংসা নির্বাচনের ফল বদলে দেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ইসরায়েলের ভোটারদের কাছে নিরাপত্তা, যুদ্ধের পরিণতি, অর্থনৈতিক চাপ, জিম্মিদের ভবিষ্যৎ এবং সরকারের জবাবদিহির মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলা ইসরায়েলের নিরাপত্তাব্যবস্থা ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে গভীর প্রশ্নের মুখে ফেলে। ওই হামলায় ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে এবং বহু মানুষকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর ইসরায়েল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। সংঘাত পরে লেবানন ও ইরানকেন্দ্রিক বৃহত্তর আঞ্চলিক সংকটের সঙ্গেও যুক্ত হয়। এই সময়ে ইসরায়েলের নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা নিয়ে দেশটির ভেতরে ব্যাপক সমালোচনা দেখা দেয়। নেতানিয়াহুর সমালোচকেরা অভিযোগ করে আসছেন, ২০২৩ সালের হামলার আগে নিরাপত্তা ঝুঁকি যথাযথভাবে মোকাবিলা করা হয়নি। তাঁদের মতে, হামলার জন্য রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, সাবেক জিম্মি এবং বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের একটি অংশও ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত ও দায় নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আসছেন। অন্যদিকে নেতানিয়াহু তাঁর নেতৃত্বে ইসরায়েলের সামরিক প্রতিক্রিয়া ও আঞ্চলিক অবস্থানকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেন। ফলে আসন্ন নির্বাচন তাঁর সরকারের নিরাপত্তানীতির ওপর জনমতের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠেছে। নেতানিয়াহুর সরকারের বিরুদ্ধে আরেকটি বড় সমালোচনা হলো ফিলিস্তিনিদের প্রতি আচরণ এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা। গাজায় দীর্ঘ সংঘাত, বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি এবং মানবিক সংকট ইসরায়েলকে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যাপক সমালোচনার মুখে ফেলেছে। একই সঙ্গে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা, জমি দখল এবং বসতি সম্প্রসারণ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। রোববার প্রকাশিত অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পশ্চিম তীরে জলপাই সংগ্রহের সময় ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় ওয়াশিংটন পোস্টের আলোকচিত্রী হেইডি লেভিন গুরুতর আহত হন। তাঁর কয়েকটি মেরুদণ্ডের হাড় ভেঙে যায় এবং শরীরে ছুরিকাঘাতের ক্ষত হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। লেভিন অভিযোগ করেন, ফিলিস্তিনিদের রক্ষার পরিবর্তে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী অনেক সময় বসতি স্থাপনকারীদের সুরক্ষা দিচ্ছে। নেতানিয়াহু ঘটনাটিকে কথিত হামলা হিসেবে উল্লেখ করায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন। ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ এবং সাবেক নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের কয়েকজন এ ধরনের সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছেন। এই ঘটনাগুলো নেতানিয়াহু সরকারের জন্য নির্বাচনের আগে নতুন চাপ তৈরি করেছে। পশ্চিম তীরে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা এবং অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনার প্রশ্নটি এখন আন্তর্জাতিক আলোচনার অংশ। ইউরোপীয় কূটনীতিকদের ওপর হামলার খবরও পরিস্থিতির গুরুত্ব বাড়িয়েছে। সমালোচকদের মতে, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে ইসরায়েলের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তবে সরকারের সমর্থকেরা নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও ইসরায়েলের স্বার্থ রক্ষার যুক্তি সামনে রেখে বর্তমান নেতৃত্বের অবস্থানকে সমর্থন করেন।
গাজা যুদ্ধ নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনাও নেতানিয়াহুর জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। যুদ্ধের ফলে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনি নিহত ও বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, আবাসন ও স্বাস্থ্যব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং খাদ্য ও চিকিৎসার সংকট তৈরি হয়েছে। এসব কারণে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। নেতানিয়াহু ও তাঁর সরকার হামাসের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস এবং ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে অভিযানের লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলেছেন, দীর্ঘ সংঘাতের পরও স্থায়ী নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সমাধানের পথ কতটা এগিয়েছে। ট্রাম্পের সমর্থনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক সম্পর্ক। ট্রাম্প তাঁর বার্তায় ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেতানিয়াহুর ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। দুই দেশের যৌথ সামরিক পদক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। এই সংঘাতের প্রভাব জ্বালানি বাজার, আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতেও পড়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইরান দ্রুত তার অবস্থান পরিবর্তন না করলে সামরিক অভিযান শেষ করার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
তবে ইরান ইস্যুতে দুই নেতার সম্পর্ক সব সময় একরকম ছিল না। যুদ্ধের কৌশল, আলোচনার পথ এবং সংঘাতের পরিণতি নিয়ে তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্যের খবর আগেও প্রকাশিত হয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ট্রাম্প নেতানিয়াহুকে নির্বাচনে সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে প্রকাশ্যে নিশ্চিত অবস্থান নেননি। সেই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে তাঁর এই ঘোষণা বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে। এটি একদিকে নেতানিয়াহুর প্রতি রাজনৈতিক আস্থার প্রকাশ, অন্যদিকে ইরানবিরোধী নীতিতে দুই দেশের সহযোগিতা অব্যাহত রাখার বার্তা। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির দিক থেকেও এই সমর্থন গুরুত্বপূর্ণ। ইরান যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন জনগণের মধ্যে অসন্তোষের খবর রয়েছে। নভেম্বরের কংগ্রেস নির্বাচন সামনে থাকায় ট্রাম্প প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়েও বিতর্ক চলছে। ফলে নেতানিয়াহুর প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন ইসরায়েলের নির্বাচনী রাজনীতির পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক আলোচনাতেও প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে বিদেশি নির্বাচনে সরাসরি কোনো প্রার্থীকে সমর্থন জানানোর মাধ্যমে ট্রাম্প দীর্ঘদিনের প্রচলিত কূটনৈতিক রীতির বাইরে গেছেন বলে বিশ্লেষকেরা উল্লেখ করেছেন।