রিয়াদে ক্ষেপণাস্ত্রের হুমকি, সৌদির প্রতিরোধের দাবি ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন উত্তেজনা বাড়ছে
রিয়াদে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধের দাবি সৌদি জোটের, নতুন সতর্কতা জারি হলেও হামলার দায় স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হয়নি, আকাশপথে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদকে লক্ষ্য করে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিহত ও ধ্বংস করার দাবি করেছে ইয়েমেনের হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট। শনিবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি জানান, হুথি গোষ্ঠীর ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রটি রিয়াদের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় প্রতিহত করা হয়। একই দিনে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলে একটি চালকবিহীন আকাশযানও ধ্বংস করার কথা জানানো হয়েছে। তবে ক্ষেপণাস্ত্রটির উৎক্ষেপণস্থল, নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু এবং প্রতিহত করার স্থান সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
সৌদি আরবের সরকারি সতর্কতা ব্যবস্থার মাধ্যমে রিয়াদসহ কয়েকটি অঞ্চলের বাসিন্দাদের সম্ভাব্য আকাশপথের হুমকি সম্পর্কে সতর্ক করা হয়। সৌদি নাগরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ রিয়াদ, নাজরান এবং ওয়াদি আল-দাওয়াসির এলাকায় সতর্কবার্তা জারি করে। পরে কর্তৃপক্ষ জানায়, সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে তাৎক্ষণিক বিপদের আশঙ্কা কেটে গেছে। সতর্কবার্তা জারির পর রিয়াদে বিস্ফোরণের মতো শব্দ শোনা গেছে বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব শব্দের সুনির্দিষ্ট কারণ সম্পর্কে স্বাধীনভাবে বিস্তারিত নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বক্তব্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রটি লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছানোর আগেই ধ্বংস করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় কোনো হতাহত বা স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কি না, সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তাই ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবিকে কেন্দ্র করে কোনো বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি ঘটেছে বলে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। একইভাবে ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ কোথাও পড়েছে কি না, সে বিষয়েও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর মধ্যে সীমান্তপারের হামলা ও পাল্টা হামলা নিয়ে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সৌদি আরবের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, বিমানবন্দর এবং জ্বালানি অবকাঠামোকে ঘিরে নিরাপত্তা উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এর ফলে দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, জরুরি সতর্কীকরণ কার্যক্রম এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এর আগেও অক্টোবর মাসে রিয়াদকে লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার চেষ্টা প্রতিহত করার দাবি জানিয়েছিল সৌদি কর্তৃপক্ষ। ২৩ অক্টোবর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী রিয়াদ ও খামিস মুশাইতকে লক্ষ্য করে ছোড়া দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার কথা জানায়। একই সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের দিকে পাঠানো দুটি চালকবিহীন আকাশযান প্রতিহত করার দাবিও জানানো হয়েছিল। ধারাবাহিক এসব ঘটনার কারণে সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠী দেশটির রাজধানী সানাসহ জনবহুল বেশ কয়েকটি অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে। গোষ্ঠীটি ২০১৪ সালে সানা দখলের পর থেকে ইয়েমেনের সংঘাতে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে। ২০১৫ সাল থেকে সৌদি আরব আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকারকে সমর্থন দিয়ে সামরিক জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে। দীর্ঘদিনের সংঘাতের ফলে ইয়েমেনে ব্যাপক প্রাণহানি, বাস্তুচ্যুতি এবং মানবিক সংকট সৃষ্টি হয়েছে।
২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পর ইয়েমেনের সংঘাতের তীব্রতা কিছুটা কমেছিল। তবে ২০২৬ সালে নতুন করে লড়াই তীব্র হওয়ায় পরিস্থিতি আবারও অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে। ইয়েমেনের বিভিন্ন অঞ্চলে সরকারি বাহিনী ও হুথি যোদ্ধাদের মধ্যে সংঘর্ষ এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযান ব্যবহারের অভিযোগ আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ এবং আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলেরও গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। দেশটি বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি উৎপাদক ও রপ্তানিকারক। দেশটির গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি স্থাপনা, বিমানবন্দর বা পরিবহন অবকাঠামো আক্রান্ত হলে তার প্রভাব আঞ্চলিক অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক বাজারে পড়তে পারে। তবে সর্বশেষ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ঘটনায় জ্বালানি সরবরাহ বা আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে—এমন তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
এ ঘটনায় ইরানের ভূমিকা নিয়েও আঞ্চলিক রাজনীতিতে আলোচনা রয়েছে। হুথিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের এবং সৌদি আরব অতীতে গোষ্ঠীটিকে সমর্থন দেওয়ার জন্য তেহরানের সমালোচনা করেছে। তবে হুথিদের প্রতিটি হামলার ক্ষেত্রে ইরানের সরাসরি নির্দেশ বা অংশগ্রহণের প্রমাণ আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। শুধু ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার ঘোষণার ভিত্তিতে ইরানের সরাসরি সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা যায় না।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের জন্য এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ে কি না এবং পাল্টাপাল্টি হামলা নতুন সংঘাতের দিকে গড়ায় কি না। একই সঙ্গে বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা এবং ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী মানবিক সংকট মোকাবিলার বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাচ্ছে।
২৪ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবির সমর্থন পাওয়া গেলেও উৎক্ষেপণস্থল, নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তু এবং ঘটনার সব সামরিক বিবরণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। হুথিদের পক্ষ থেকে এই নির্দিষ্ট ঘটনার দায় স্বীকারের নির্ভরযোগ্য তথ্যও পাওয়া যায়নি। ফলে ঘটনাটিকে সৌদি জোটের ঘোষণার ভিত্তিতে প্রতিবেদন করা হলেও হামলার প্রতিটি বিবরণ নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়। পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও তথ্য পাওয়া গেলে হতাহত, ক্ষয়ক্ষতি এবং হামলার উৎস নিয়ে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যেতে পারে।





