উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক আলোচনার প্রস্তাব দক্ষিণ কোরিয়ার, সীমান্ত উত্তেজনা কমাতে উদ্যোগ
সীমান্ত উত্তেজনা কমাতে উত্তর কোরিয়াকে সামরিক আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। সীমারেখা নির্ধারণ, যোগাযোগ পুনরুদ্ধার ও সংঘর্ষ প্রতিরোধই মূল লক্ষ্য।
কোরীয় উপদ্বীপে সামরিক উত্তেজনা কমানো এবং সীমান্তে অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষের ঝুঁকি ঠেকাতে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সামরিক পর্যায়ে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ উদ্যোগের কথা জানায়। প্রস্তাবে দুই দেশের মধ্যবর্তী স্থলসীমার সুনির্দিষ্ট অবস্থান যৌথভাবে যাচাই করা, সামরিক যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধার এবং সীমান্ত এলাকায় সংঘর্ষ এড়ানোর উপায় নিয়ে আলোচনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী কিম হং-চোল বলেন, দুই দেশের মধ্যে সামরিক সীমারেখার অবস্থান নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। এই মতপার্থক্য দূর করা না গেলে সীমান্তে দায়িত্ব পালনরত সেনাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি থেকে সংঘর্ষের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরাসরি সামরিক সংলাপ জরুরি।
সীমান্ত নিয়ে বিরোধ কেন
দক্ষিণ কোরিয়া ও উত্তর কোরিয়াকে পৃথক করেছে সামরিক সীমারেখা এবং এর আশপাশের অসামরিকীকৃত অঞ্চল, যা ডিমিলিটারাইজড জোন বা ডিএমজেড নামে পরিচিত। ১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সালের কোরীয় যুদ্ধের পর যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় এই অঞ্চল প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে সীমান্তের কয়েকটি অংশের সুনির্দিষ্ট অবস্থান নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মতপার্থক্য রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তাদের দাবি, উত্তর কোরিয়ার সেনারা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্ত এলাকায় রাস্তা ও বেড়া নির্মাণ, মাইন পুঁতে রাখা এবং সামরিক অবস্থান শক্তিশালী করার কাজ চালিয়েছে। এসব কার্যক্রমের সময় উত্তর কোরিয়ার সেনারা সামরিক সীমারেখা অতিক্রম করেছে বলেও অভিযোগ করেছে সিউল।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২১ সেপ্টেম্বর ডিএমজেডের ভেতরে একটি মাইন বিস্ফোরণে তাদের তিনজন সেনা আহত হন। দক্ষিণ কোরিয়ার তদন্তকারীরা ঘটনাটির জন্য উত্তর কোরিয়ার পুঁতে রাখা মাইনকে দায়ী করেছেন। তবে পিয়ংইয়ং এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
ঘটনার পর দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য ও সামরিক সতর্কতা বেড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তারা বলছেন, সীমান্তের অবস্থান নিয়ে মতপার্থক্য বজায় থাকলে ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা আরও গুরুতর সংঘর্ষের কারণ হতে পারে।
সামরিক যোগাযোগ পুনরুদ্ধারের উদ্যো
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রস্তাবের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো দুই দেশের মধ্যে সামরিক যোগাযোগের পথ পুনরায় চালু করা। অতীতে সামরিক হটলাইন ও সরাসরি যোগাযোগব্যবস্থা সীমান্তে উত্তেজনা দেখা দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করত। কিন্তু দুই দেশের সম্পর্ক অবনতির সঙ্গে সঙ্গে এসব যোগাযোগব্যবস্থার অধিকাংশ বন্ধ হয়ে গেছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আলোচনার মাধ্যমে যোগাযোগব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করা গেলে সীমান্তে কোনো ঘটনা ঘটার পর দ্রুত তথ্য আদান-প্রদান সম্ভব হবে। এতে ভুল হিসাব, ভুল সংকেত বা অনিচ্ছাকৃত সামরিক সংঘর্ষের ঝুঁকি কমতে পারে।
প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, প্রয়োজনে জাতিসংঘ কমান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করে ত্রিপক্ষীয় আলোচনা করা যেতে পারে। কোরীয় যুদ্ধের যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাস্তবায়ন ও সীমান্তসংক্রান্ত বিষয় তদারকিতে জাতিসংঘ কমান্ডের ভূমিকা রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়া প্রস্তাব দিয়েছে, আলোচনার তারিখ ও স্থান নিয়ে পানমুনজমের মাধ্যমে যোগাযোগ করা যেতে পারে। এটি ডিএমজেডের ভেতরে অবস্থিত একটি প্রতীকী যুদ্ধবিরতি গ্রাম, যেখানে অতীতে দুই পক্ষের মধ্যে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে।
উত্তর কোরিয়া কী প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে
দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন প্রস্তাবের বিষয়ে উত্তর কোরিয়ার ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে—এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য এখনো প্রকাশিত হয়নি। দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গত বছরও একই ধরনের সামরিক আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু পিয়ংইয়ং তাতে সাড়া দেয়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের বোন কিম ইয়ো জং সীমান্তে সামরিক প্রস্তুতি ও দক্ষিণ কোরিয়ার কর্মকাণ্ড নিয়ে কঠোর বক্তব্য দিয়েছেন। উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে সীমান্তে নতুন সেনা ইউনিটকে গুলিবর্ষণের অবস্থানে নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্ককে শত্রুতাপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করছে এবং সীমান্তে প্রতিরক্ষা অবকাঠামো জোরদার করেছে। ফলে সামরিক আলোচনার প্রস্তাব বাস্তবায়িত হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত।
আঞ্চলিক নিরাপত্তায় সম্ভাব্য প্রভাব
দক্ষিণ কোরিয়ার এই উদ্যোগ মূলত সীমান্তে ভুল বোঝাবুঝি ও অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষ প্রতিরোধের লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে। দুই পক্ষ আলোচনায় বসতে রাজি হলে সামরিক যোগাযোগ পুনরুদ্ধার এবং সীমান্তের অবস্থান নিয়ে বিরোধ কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে আলোচনার প্রস্তাব মানেই দুই দেশের বৃহত্তর রাজনৈতিক বিরোধের সমাধান নয়। পারমাণবিক অস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, সামরিক মহড়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দক্ষিণ কোরিয়ার নিরাপত্তা সহযোগিতার মতো বিষয়গুলো দুই দেশের সম্পর্কে দীর্ঘদিনের উত্তেজনার অংশ।
বর্তমানে দক্ষিণ কোরিয়া উত্তর কোরিয়ার প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। প্রস্তাবিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হলে তার সময়সূচি, আলোচনার পরিধি এবং জাতিসংঘ কমান্ডের অংশগ্রহণের বিষয়গুলো পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হবে। আপাতত সিউলের লক্ষ্য হলো সীমান্তে উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ করা এবং এমন পরিস্থিতি এড়ানো, যা দুই কোরিয়ার মধ্যে বৃহত্তর সামরিক সংঘর্ষের দিকে গড়াতে পার





