ট্রাম্পের ক্ষোভে কাঁপছে কিয়েভ, রুশ তেল হামলায় বন্ধ হচ্ছে কি মার্কিন গোয়েন্দা সহায়তা?
রুশ তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের নতুন হামলায় ক্ষুব্ধ ট্রাম্প প্রশাসন, গোয়েন্দা সহায়তা নিয়ে বাড়ছে অনিশ্চয়তা, আর জ্বালানি বাণিজ্য ঘিরে তীব্র হচ্ছে দুই মিত্রের বিরোধ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের সম্পর্কে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনের হামলা, রুশ ডিজেল বাণিজ্য এবং সামরিক গোয়েন্দা সহায়তা নিয়ে মতবিরোধের জেরে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনের রুশ তেল শোধনাগারে হামলার সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন, রাশিয়া ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে গেলে কিয়েভের পক্ষে পাল্টা আক্রমণ বন্ধ রাখা সম্ভব নয়।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি দাবিতে বলা হয়েছে, জেলেনস্কি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন এবং ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হয়ে ইউক্রেনের সঙ্গে সব ধরনের গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন। একই দাবিতে বলা হচ্ছে, রুশ ডিজেল বহনকারী জাহাজসহ বিশ্বের সব তেলবাহী জাহাজ এখন ইউক্রেনের হামলার লক্ষ্যবস্তু। নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন ও তথ্য যাচাইয়ের ফলাফল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এসব বক্তব্যের সব কটি সত্য নয়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের ১৭ অক্টোবরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প ও জেলেনস্কির মধ্যে বিরোধ ক্রমেই গভীর হচ্ছে। রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় ইউক্রেনের হামলা বন্ধে ওয়াশিংটনের চাপ, রুশ জ্বালানি রপ্তানিতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিলের সিদ্ধান্ত এবং ইউক্রেনের সামরিক যোগাযোগব্যবস্থায় সীমাবদ্ধতা দুই দেশের সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে। পরিস্থিতির কারণে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সহায়তা ও ভবিষ্যৎ গোয়েন্দা সহযোগিতা নিয়ে উদ্বেগও বেড়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ১৩ অক্টোবর সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ওয়াশিংটন ইউক্রেনকে গোয়েন্দা তথ্য দেওয়া অব্যাহত রেখেছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের অবসান ঘটাতে কাজ করছে এবং দুই পক্ষকে সমাধানের পথে নিয়ে যেতে চায়। ফলে সব ধরনের গোয়েন্দা সহযোগিতা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে—এমন দাবি তাঁর প্রকাশ্য বক্তব্যের সঙ্গে মেলে না।
এদিকে, মার্কিন প্রশাসন ইউক্রেনকে রাশিয়ার ভেতরে দূরপাল্লার চালকবিহীন উড়োজাহাজ দিয়ে তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ করার বিষয়ে সতর্ক করেছিল বলে ১৪ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গণমাধ্যম এনপিআরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, হামলা অব্যাহত থাকলে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান বন্ধ করার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। অর্থাৎ, সহযোগিতা বন্ধের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা ও চাপের খবর রয়েছে; কিন্তু সব ধরনের গোয়েন্দা সহায়তা ইতিমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ নেই।
বিরোধের আরেকটি বড় কারণ রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানি। ট্রাম্প প্রশাসন রুশ ডিজেল সরবরাহের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এর পক্ষে যুক্তি হিসেবে জ্বালানির উচ্চমূল্য কমানোর কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু ইউক্রেনের আশঙ্কা, রাশিয়ার জ্বালানি বিক্রি থেকে পাওয়া অর্থ দেশটির যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতা বাড়াতে পারে। জেলেনস্কি এই সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেছেন, রাশিয়াকে অর্থনৈতিক সুবিধা দেওয়া হলে তা যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারেও এই বিরোধের প্রভাব নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেলের সরবরাহ কমে গেলে বিভিন্ন দেশে মূল্য বাড়তে পারে। রাশিয়ার শোধনাগারে হামলার কারণে উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাহত হলে বৈশ্বিক বাজারে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে জ্বালানির দামের ওঠানামার পেছনে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, পরিবহনপথের ঝুঁকি এবং শোধনাগারের উৎপাদনক্ষমতার মতো একাধিক কারণও কাজ করে।
১৫ অক্টোবর রাশিয়ার রিয়াজান অঞ্চলে একটি তেল শোধনাগারে ইউক্রেনের হামলার খবর প্রকাশিত হয়। রয়টার্স ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প ঘোষিত জ্বালানিসংক্রান্ত যুদ্ধবিরতির পরও রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা চলছিল। ইউক্রেনের বক্তব্য ছিল, রাশিয়া তাদের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে যাওয়ায় একতরফাভাবে হামলা বন্ধ রাখা কঠিন।
এই হামলার পর ট্রাম্প ইউক্রেনের পদক্ষেপের কঠোর সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, রুশ তেল শোধনাগারে আঘাত হানলে জ্বালানির বৈশ্বিক সরবরাহে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অন্যদিকে, কিয়েভের যুক্তি, রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামো দেশটির যুদ্ধ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং ইউক্রেনের ওপর আক্রমণ বন্ধ না হলে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে।
তবে রাশিয়ার তেলবাহী জাহাজের বিরুদ্ধে ইউক্রেন বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ ঘোষণা করেছে, কিংবা রুশ ডিজেল বহনকারী সব জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করার নির্দেশ দিয়েছে—এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। জর্জিয়ার তথ্য যাচাইকারী সংস্থা মিথ ডিটেক্টর ১২ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর জন্য নির্ধারিত রুশ ডিজেল ধ্বংসের নির্দেশ জেলেনস্কি দিয়েছেন—এমন দাবির পক্ষে প্রকাশ্য কোনো প্রমাণ নেই। সংস্থাটি দাবিটিকে মিথ্যা বলে চিহ্নিত করেছে।
এর অর্থ এই নয় যে রুশ তেল স্থাপনা ও জাহাজ কখনো ইউক্রেনের হামলার শিকার হয়নি। এর আগেও রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনা এবং আজভ সাগরে তেলবাহী জাহাজে ইউক্রেনের হামলার খবর প্রকাশিত হয়েছে। তবে নির্দিষ্ট স্থাপনা বা জাহাজে হামলার ঘটনা এবং বিশ্বের সব তেলবাহী জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু ঘোষণা করা এক বিষয় নয়। এই দুই দাবিকে এক করে প্রচার করলে প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউক্রেনের বর্তমান বিরোধের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে সামরিক সহায়তা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, জ্বালানি নীতি এবং যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনার ওপর। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা সীমিত হলে ইউক্রেনের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম সতর্কতা, সামরিক পরিকল্পনা ও প্রতিরক্ষা কার্যক্রম চাপে পড়তে পারে। অন্যদিকে, রাশিয়ার জ্বালানি রপ্তানি বাড়লে মস্কোর অর্থনৈতিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হতে পারে।
ওয়াশিংটন ও কিয়েভের মধ্যে গুরুতর মতবিরোধের খবর সত্য হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত সব অভিযোগ সত্য বলে প্রমাণিত হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সহায়তা সম্পূর্ণ বন্ধ এবং বিশ্বব্যাপী সব তেলবাহী জাহাজকে ইউক্রেনের লক্ষ্যবস্তু ঘোষণার দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। তাই এসব বক্তব্যকে নিশ্চিত সংবাদ হিসেবে প্রচার না করে যাচাইকৃত তথ্যের ভিত্তিতে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করাই জরুরি।





