ইরান যুদ্ধে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের বিশাল ব্যবহার, মার্কিন সামরিক মজুত নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ
ইরান যুদ্ধের কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের বিপুল ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে, তবে দেশটির সব ক্ষেপণাস্ত্র শেষ হওয়ার দাবি নিশ্চিত নয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চলমান যুদ্ধে আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য ব্যবহৃত প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের বিপুল ব্যয় নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন প্রকাশিত প্রতিবেদন ও সামরিক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, যুদ্ধের কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্রের এই ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি দাবিতে বলা হয়েছে, ২০০১ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত মার্কিন সেনাবাহিনীকে যত প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করা হয়েছিল, ইরান যুদ্ধে কয়েক মাসেই প্রায় সমপরিমাণ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। তবে এই হিসাবের ব্যাখ্যা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক সামরিক সক্ষমতা সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিসের ২০২৬ সালের ৫ অক্টোবর হালনাগাদ করা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযান শুরুর পর দেশটির ক্ষেপণাস্ত্র ও অন্যান্য গোলাবারুদের মজুত নিয়ে আইনপ্রণেতাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর যুদ্ধের সময় নির্দিষ্ট ধরনের কতটি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, তার পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভুল সংখ্যা প্রকাশ করেনি। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত সংখ্যাকে সরকারি নিশ্চিত হিসাব হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক হবে না।
প্রকাশিত বিভিন্ন বিশ্লেষণে যুদ্ধ চলাকালে প্রায় ১ হাজার ৮০০টি প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের একটি অনুমান উঠে এসেছে। এই সংখ্যা ২০০১ থেকে ২০২০ সালের মে মাস পর্যন্ত মার্কিন সেনাবাহিনীতে সরবরাহ করা ১ হাজার ৭৯৫টি ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। তুলনাটি সামরিক সরঞ্জাম ব্যবহারের ব্যাপকতা বোঝাতে গুরুত্বপূর্ণ হলেও দুটি সংখ্যা একই সময়ের মজুত বা একই ধরনের হিসাব নির্দেশ করে না। একটি হলো দীর্ঘ সময়ে সরবরাহের সংখ্যা, অন্যটি যুদ্ধকালীন ব্যবহারের একটি অনুমান।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০২০ সালের পরও যুক্তরাষ্ট্রে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত ছিল। প্রকাশিত পরিসংখ্যানের একটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ ২০০১ সাল থেকে মোট সরবরাহের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৩১৪-তে পৌঁছেছিল। সে হিসাবে যুদ্ধে আনুমানিক ১ হাজার ৮০০টি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের দাবি সত্য হলে তা ওই সময় পর্যন্ত মোট সরবরাহের প্রায় ৫৪ শতাংশের সমান। তবে সরবরাহের মোট সংখ্যা এবং বর্তমানে ব্যবহারযোগ্য মজুত এক বিষয় নয়। এর মধ্যে আগের যুদ্ধের ব্যবহার, বিদেশে সরবরাহ, প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যান্য সামরিক প্রয়োজনের হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত নিয়ে উদ্বেগের পেছনে আরও তথ্য রয়েছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ২০২৬ সালের জুলাইয়ের বিশ্লেষণে বলা হয়, ইরান যুদ্ধের কারণে যুদ্ধ শুরুর আগের মজুতের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ প্যাট্রিয়ট প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র ব্যয় হয়ে থাকতে পারে। প্রতিষ্ঠানটির হিসাব অনুযায়ী, তখন এক হাজারের কম ক্ষেপণাস্ত্র অবশিষ্ট থাকার আশঙ্কা ছিল। এটি সরকারি পূর্ণাঙ্গ মজুতের হিসাব নয়; প্রকাশ্যে পাওয়া তথ্য, উৎপাদনের হার এবং সম্ভাব্য ব্যবহার বিশ্লেষণ করে তৈরি একটি অনুমান।
একই ধরনের উদ্বেগ দেখা গেছে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেত্রেও। প্যাট্রিয়টের পাশাপাশি উচ্চগতির ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করতে ব্যবহৃত থাড ব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্রও যুদ্ধের সময় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যবহার এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত পুনরায় পূরণ করতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। প্রতিবেদনে উদ্ধৃত বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত পুনর্গঠনে অন্তত পাঁচ বছরও লাগতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো একই সঙ্গে চলমান যুদ্ধ পরিচালনা, মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা সেনাদের সুরক্ষা এবং ভবিষ্যতে অন্য কোনো বড় সংঘাতের জন্য পর্যাপ্ত অস্ত্র সংরক্ষণ করা। আকাশ প্রতিরক্ষার ক্ষেপণাস্ত্র সাধারণত ব্যয়বহুল এবং এগুলোর উৎপাদনপ্রক্রিয়া জটিল। ফলে দ্রুত অনেক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করার পর একই গতিতে নতুন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে মজুত পূরণ করা সহজ নয়।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে যাওয়া মানেই দেশটির সামরিক সক্ষমতা সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ভিত্তি নেই। যুক্তরাষ্ট্রের হাতে বিভিন্ন ধরনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, যুদ্ধবিমান, নৌবাহিনীর প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম এবং অন্যান্য ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। কোন পরিস্থিতিতে কোন অস্ত্র ব্যবহার করা হবে, সেটিও সামরিক পরিকল্পনার অংশ। প্যাট্রিয়টের মজুত কমে যাওয়া নির্দিষ্ট ধরনের হুমকি মোকাবিলায় চাপ বাড়াতে পারে, কিন্তু তা দিয়ে পুরো সামরিক বাহিনীর সক্ষমতা বিচার করা যায় না।
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক নেতৃত্বও মজুত নিয়ে বিতর্কের মধ্যে বলেছে, সামরিক বাহিনীর প্রয়োজনীয় অস্ত্র রয়েছে। অন্যদিকে প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ সতর্ক করেছেন, দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত চললে ক্ষেপণাস্ত্রের ঘাটতি ভবিষ্যতের সামরিক প্রস্তুতিকে দুর্বল করতে পারে। এই দুই অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য বুঝতে হলে সরকারি তথ্য, স্বাধীন গবেষণা এবং বাস্তব উৎপাদনক্ষমতা একসঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি।
ইরান যুদ্ধে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্রের ব্যাপক ব্যবহার এবং যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার আশঙ্কার পক্ষে উল্লেখযোগ্য তথ্য রয়েছে। কিন্তু ‘যুক্তরাষ্ট্রের সব ক্ষেপণাস্ত্র শেষ’ অথবা ‘যুদ্ধ শেষ করার মতো অস্ত্র আর নেই’ এমন সিদ্ধান্ত প্রকাশিত তথ্য দিয়ে নিশ্চিত করা যায় না। সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মূল্যায়ন হলো, যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি হয়েছে এবং সেগুলো পুনরায় পূরণ করতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে।





