চীনের পারমাণবিক ডুবোজাহাজ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা, বিশ্বজুড়ে বাড়ছে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ও উদ্বেগ
প্রশান্ত মহাসাগরে পারমাণবিক শক্তিচালিত ডুবোজাহাজ থেকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে চীন। সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শনের এই ঘটনায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
চীনের সামরিক সক্ষমতা ও পারমাণবিক প্রতিরোধব্যবস্থা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। দেশটির নৌবাহিনী ২০২৬ সালের ৬ জুলাই একটি পারমাণবিক শক্তিচালিত কৌশলগত ডুবোজাহাজ থেকে দূরপাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ চালায়। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রশান্ত মহাসাগরের নির্ধারিত জলসীমায় গিয়ে পড়ে। পরীক্ষায় সক্রিয় পারমাণবিক ওয়ারহেড ব্যবহার করা হয়েছিল এমন কোনো নিশ্চিত তথ্য প্রকাশ্যে নেই।
চীনের সরকারি বক্তব্য অনুযায়ী, এই পরীক্ষা দেশটির নৌবাহিনীর নিয়মিত সামরিক প্রশিক্ষণের অংশ। বেইজিং দাবি করেছে, পরীক্ষাটি আন্তর্জাতিক আইন ও প্রচলিত রীতিনীতি মেনে পরিচালিত হয়েছে এবং কোনো নির্দিষ্ট দেশকে লক্ষ্য করে করা হয়নি। চীনা কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, উৎক্ষেপণের আগে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোকে অবহিত করা হয়েছিল।
তবে এই পরীক্ষার তাৎপর্য কেবল একটি ক্ষেপণাস্ত্রের সফল উৎক্ষেপণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। সামরিক বিশ্লেষকদের কাছে এটি চীনের সমুদ্রভিত্তিক পারমাণবিক প্রতিরোধক্ষমতার অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। স্থলভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্র ও কৌশলগত বোমারু বিমানের পাশাপাশি ডুবোজাহাজ থেকে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের সক্ষমতা একটি দেশের পারমাণবিক সামরিক ব্যবস্থাকে আরও বহুমুখী করে তোলে।
এ ধরনের ডুবোজাহাজের বিশেষ সুবিধা হলো, সেগুলো দীর্ঘ সময় সমুদ্রের গভীরে অবস্থান করতে পারে। ফলে প্রতিপক্ষের পক্ষে সেগুলোর অবস্থান শনাক্ত করা এবং সম্ভাব্য হামলার আগেই নিষ্ক্রিয় করা কঠিন হতে পারে। কোনো দেশ প্রথমে পারমাণবিক হামলার শিকার হলেও সমুদ্রের গভীরে অবস্থানরত ডুবোজাহাজ থেকে পাল্টা আঘাত হানার সক্ষমতা ধরে রাখতে পারে। সামরিক পরিভাষায় এই সক্ষমতাকে দ্বিতীয় দফার পাল্টা আঘাতের ক্ষমতা বলা হয়।
চীনের এই পরীক্ষায় ঠিক কোন শ্রেণির ডুবোজাহাজ ব্যবহার করা হয়েছে, সে বিষয়ে প্রকাশ্য তথ্য পর্যাপ্ত নয়। একইভাবে ক্ষেপণাস্ত্রটির নির্দিষ্ট নামও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। বিভিন্ন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণে ধারণা করা হয়েছে, এটি জে এল-২ অথবা আরও দূরপাল্লার জে এল-৩ ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র হতে পারে। তবে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে কোন ক্ষেপণাস্ত্রটি ব্যবহৃত হয়েছে, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ জে এল-২ ও জে এল-৩ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এক নয়। জে এল-৩ ক্ষেপণাস্ত্রের সম্ভাব্য পাল্লা ১০ হাজার কিলোমিটারের বেশি বলে বিভিন্ন বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে পরীক্ষায় কোন ক্ষেপণাস্ত্রটি ব্যবহার করা হয়েছে, তা নিশ্চিত না হওয়ায় এর প্রকৃত পাল্লা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যাচ্ছে না।
বিশ্লেষকদের মতে, পরীক্ষাটি চীনের সামরিক আধুনিকায়নের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বৃহত্তর কৌশলগত প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটেও গুরুত্বপূর্ণ। সমুদ্রভিত্তিক ক্ষেপণাস্ত্রের সক্ষমতা বাড়লে চীন তার পারমাণবিক প্রতিরোধব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার সুযোগ পায়। একই সঙ্গে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামরিক ভারসাম্য, নিরাপত্তা ও আস্থা নিয়ে নতুন প্রশ্ন দেখা দিতে পারে।
পরীক্ষাটি ঘিরে আঞ্চলিক দেশগুলোর উদ্বেগের আরেকটি কারণ হলো ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের আগাম সতর্কতা ও স্বচ্ছতা। চীন আগাম অবহিত করার কথা বললেও, অন্যান্য দেশের উদ্বেগ পুরোপুরি দূর হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর কাছে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা শুধু সামরিক প্রশিক্ষণের বিষয় নয়; এটি তাদের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এ ধরনের পরীক্ষার তথ্য যথাসময়ে জানানো হলে ভুল বোঝাবুঝি ও অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনার ঝুঁকি কমতে পারে। বিপরীতে, পরীক্ষার উদ্দেশ্য ও গতিপথ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা থাকলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার করার উদ্যোগ নিতে পারে।
চীনের বক্তব্য, তাদের পারমাণবিক সক্ষমতা জাতীয় নিরাপত্তা রক্ষা এবং কৌশলগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখার উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা হচ্ছে। অন্যদিকে সমালোচকদের আশঙ্কা, এ ধরনের সক্ষমতা প্রদর্শন প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর মধ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে এই পরীক্ষার প্রভাব মূল্যায়নে শুধু ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়, এর কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত পরিণতিও বিবেচনা করা জরুরি।
চীনের ডুবোজাহাজ থেকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার ঘটনাটি দেশটির সমুদ্রভিত্তিক সামরিক সক্ষমতা নিয়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তবে পরীক্ষায় চীনের সবচেয়ে উন্নত ডুবোজাহাজ ব্যবহারের দাবি কিংবা নির্দিষ্ট ক্ষেপণাস্ত্রের পরিচয় প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত নয়। তাই ঘটনাটিকে নতুন অস্ত্রের চূড়ান্ত শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ হিসেবে না দেখে, চীনের পারমাণবিক প্রতিরোধব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কৌশলগত প্রতিযোগিতার অংশ হিসেবে দেখা অধিক যুক্তিসংগত।





