নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসনে চ্যালেঞ্জ, ইসরায়েলের নির্বাচনে বাড়ছে ডানপন্থী বিরোধীদের শক্তি
২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব বড় পরীক্ষার মুখে। বিরোধীদের উত্থান, নিরাপত্তা সংকট ও রাজনৈতিক বিভাজন নির্ধারণ করতে পারে ইসরায়েলের ভবিষ্যৎ।
ইসরায়েলে আগামী ২৭ অক্টোবর ২০২৬ অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সাধারণ নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়ছে। দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট এবার ক্ষমতা ধরে রাখতে পারবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে তাঁর জোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলো নির্বাচনে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নেতানিয়াহুর দীর্ঘ শাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার হতে পারে তাঁর বিরুদ্ধে শক্তিশালী ডানপন্থী বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির উত্থান। তবে নির্বাচনের ফলাফল এখনো নিশ্চিত নয়।
নেতানিয়াহু ইসরায়েলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রী। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের কেন্দ্রে রয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা, সামরিক শক্তি, ইহুদি রাষ্ট্রের পরিচয় এবং ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সংঘাত মোকাবিলায় কঠোর নীতি। তাঁর সমর্থকদের মতে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় তিনি অভিজ্ঞ নেতা। অন্যদিকে, সমালোচকদের অভিযোগ, তাঁর দীর্ঘ শাসনামলে ইসরায়েলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন বেড়েছে এবং ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সংঘাতের স্থায়ী সমাধান আরও কঠিন হয়েছে।
২০২২ সালের নির্বাচনের পর নেতানিয়াহু কট্টর ডানপন্থী ও ধর্মীয় দলগুলোর সমর্থনে সরকার গঠন করেন। তাঁর সরকারের বিচারব্যবস্থা সংস্কারের উদ্যোগ দেশজুড়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে। সমালোচকেরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এসব পরিবর্তন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং সরকারের ক্ষমতার ওপর প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করতে পারে। অন্যদিকে, সরকারপন্থীদের বক্তব্য ছিল, সংস্কারের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতা ও বিচার বিভাগের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হবে। এই বিতর্ক ইসরায়েলের রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও বাড়িয়ে দেয়।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলা নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থানের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। হামলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষ নিহত হন এবং ২৫০ জনের বেশি মানুষকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যাওয়া হয় বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হামলার পর ইসরায়েলের নিরাপত্তাব্যবস্থার ব্যর্থতা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে। বিরোধী নেতারা সরকারের কাছে জবাবদিহি দাবি করেন। নেতানিয়াহুর সমালোচকেরা মনে করেন, হামলার আগে নিরাপত্তা পরিস্থিতি মূল্যায়ন ও প্রতিরোধে ব্যর্থতার দায় রাজনৈতিক নেতৃত্বকে নিতে হবে।
এরপর গাজায় যুদ্ধ এবং লেবানন ও ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনা ইসরায়েলের রাজনীতিতে নিরাপত্তাকে অন্যতম প্রধান নির্বাচনী ইস্যুতে পরিণত করেছে। সরকার সামরিক অভিযানের মাধ্যমে নিরাপত্তা পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বললেও বিরোধীরা প্রশ্ন তুলছেন, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের ফলে দেশটি প্রকৃতপক্ষে কতটা নিরাপদ হয়েছে। জিম্মিদের মুক্তি, যুদ্ধের মানবিক মূল্য, সামরিক ব্যয় এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর সংঘাতের প্রভাবও ভোটারদের আলোচনায় রয়েছে।
নেতানিয়াহুর গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোট। তাঁর নেতৃত্বাধীন ইয়াশার দল বিরোধী রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবস্থান তৈরি করেছে। সামরিক অভিজ্ঞতা এবং নিরাপত্তাবিষয়ক দক্ষতার কারণে তিনি নেতানিয়াহুর বিকল্প হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। তাঁর সমর্থকেরা সরকার পরিচালনায় জবাবদিহি, জাতীয় ঐক্য এবং নীতিগত পরিবর্তনের ওপর গুরুত্ব দেন। তবে বিরোধী শিবিরের ভেতরেও বিভিন্ন বিষয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। ফলে নেতানিয়াহুবিরোধী ভোট বাড়লেও নতুন সরকার গঠনের পথ সহজ হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলো নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত প্রকাশিত একটি জরিপ-সংকলনের গড় হিসাবে নেতানিয়াহুর জোটের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা প্রায় ৫০ দশমিক ৭। অন্যদিকে, গাদি আইজেনকোটের ইয়াশার দলের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা প্রায় ২১ দশমিক ৭ বলে ওই সংকলনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এগুলো জরিপভিত্তিক অনুমান, নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল নয়। বিভিন্ন জরিপে দলগুলোর সম্ভাব্য আসনসংখ্যায় পার্থক্য রয়েছে। তাই কোনো একটি জরিপের ফল দেখে নির্বাচনে কে জিতবেন, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
ইসরায়েলের সংসদে মোট ১২০টি আসন রয়েছে। সরকার গঠনের জন্য অন্তত ৬১ জন সংসদ সদস্যের সমর্থন প্রয়োজন। দেশটির বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থায় একক দলের পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন কঠিন হওয়ায় জোট গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নেতানিয়াহুর দল নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসন পেলেও সহযোগী দলগুলোর সমর্থন ছাড়া সরকার গঠন করতে সমস্যায় পড়তে পারে। একইভাবে, বিরোধীরা সম্মিলিতভাবে বেশি আসন পেলেও তাদের মধ্যে মতৈক্য না থাকলে স্থিতিশীল সরকার গঠন কঠিন হতে পারে।
বিরোধী দলগুলোর সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো নীতিগত মতপার্থক্য। নিরাপত্তা, বিচারব্যবস্থা, ধর্মীয় নীতি এবং ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে সব বিরোধী দলের অবস্থান এক নয়। আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সম্ভাব্য ভূমিকা এবং তাদের সঙ্গে জোট গঠনের বিষয়ে অন্যান্য দলের অবস্থানও নির্বাচনের পর সরকার গঠনের সমীকরণে প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে নির্বাচনী প্রচারে নেতানিয়াহুর বিরোধিতা গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিই একমাত্র রাজনৈতিক ঐক্যের ভিত্তি হবে, এমনটা ধরে নেওয়া যায় না।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কও এই নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। গাজা ও পশ্চিম তীরের পরিস্থিতি, ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণ এবং আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে ইসরায়েলের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সম্পর্ক নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিরোধী নেতারা আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং কিছু নীতিতে পরিবর্তনের কথা বলছেন। তবে সরকার পরিবর্তন হলেও নিরাপত্তাকেন্দ্রিক নীতিতে দ্রুত ও মৌলিক পরিবর্তন আসবে কি না, তা অনিশ্চিত। কারণ ইসরায়েলের রাজনীতিতে সামরিক নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক হুমকি মোকাবিলার প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২৭ অক্টোবরের নির্বাচন নেতানিয়াহুর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। তিনি ক্ষমতায় ফিরলে বর্তমান জোটের নীতি অব্যাহত রাখার সম্ভাবনা থাকবে। অন্যদিকে, বিরোধীরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে সরকার পরিচালনা, বিচারব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে জোটের অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য নতুন সরকারের স্থায়িত্বকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে। শেষ পর্যন্ত ভোটারদের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, নেতানিয়াহু আবারও ক্ষমতায় ফিরবেন, নাকি ইসরায়েলের রাজনীতিতে নতুন নেতৃত্বের সূচনা হবে।





