মূল্যস্ফীতিতে দ্রুত ঋণ কমানোর ট্রাম্পের মন্তব্য, অর্থ ছাপানোর দাবি কতটা সত্য

ট্রাম্পের মূল্যস্ফীতিতে ঋণ কমানোর মন্তব্য ঘিরে বিতর্ক, তবে অর্থ ছাপিয়ে ঋণ মুছে ফেলার দাবির প্রমাণ এখনো মেলেনি।

মূল্যস্ফীতিতে দ্রুত ঋণ কমানোর ট্রাম্পের মন্তব্য, অর্থ ছাপানোর দাবি কতটা সত্য

মূল্যস্ফীতিতে দ্রুত ঋণ কমানোর ট্রাম্পের মন্তব্য, অর্থ ছাপানোর দাবি কতটা সত্য


যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৪০ লাখ কোটি ডলারের জাতীয় ঋণ মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে দ্রুত কমানো সম্ভব প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন মন্তব্যকে কেন্দ্র করে নতুন করে তীব্র অর্থনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি দাবিতে বলা হচ্ছে, ট্রাম্পের পরিকল্পনা হলো নতুন অর্থ ছাপানো, সেই অর্থ দিয়ে বাস্তব সম্পদ কেনা, সম্পদের দাম বাড়তে দেওয়া এবং মূল্যস্ফীতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল ঋণের বোঝা কমিয়ে ফেলা। তবে তথ্য যাচাই করে দেখা যাচ্ছে, এই দাবির একটি অংশ সত্য হলেও পুরো বক্তব্যটি ট্রাম্পের ঘোষিত নীতি হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক নয়।

সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ পরিশোধের উপায় নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে ঋণ কমানো সম্ভব। একই আলোচনায় তিনি আরও বলেন, “নির্দিষ্ট মাত্রার মূল্যস্ফীতিও সেই ঋণ খুব দ্রুত পরিশোধ করতে পারে।” তাঁর এই বক্তব্যের সত্যতা একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া গেছে।

অর্থাৎ ট্রাম্প সত্যিই মূল্যস্ফীতিকে জাতীয় ঋণের বোঝা কমানোর একটি সম্ভাব্য উপায় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এই অংশটি সত্য। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে অতিরিক্ত দাবি করা হচ্ছে ট্রাম্প অর্থ ছাপিয়ে বাস্তব সম্পদ কিনবেন এবং ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যাপক মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি করবেন তার পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো নির্দিষ্ট সরকারি পরিকল্পনা, নির্বাহী নির্দেশনা বা ঘোষিত অর্থনৈতিক কর্মসূচি পাওয়া যায়নি।

মূল বিষয়টি বুঝতে হলে মূল্যস্ফীতি ও সরকারি ঋণের সম্পর্ক বোঝা প্রয়োজন। কোনো দেশের পুরোনো ঋণের বড় অংশ যদি নির্দিষ্ট সুদে নেওয়া হয়, তাহলে সময়ের সঙ্গে মূল্যস্ফীতি বাড়লে সেই ঋণের প্রকৃত মূল্য কমে যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে, সরকার যদি বহু বছর আগে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ধার নেয় এবং পরবর্তী সময়ে পণ্য ও সেবার দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়, তাহলে আগের ধার করা অর্থের ক্রয়ক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কমে যায়। ফলে ঋণের প্রকৃত অর্থনৈতিক বোঝা কমতে পারে।

এই কারণেই অর্থনীতিবিদেরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, মূল্যস্ফীতি কোনো সরকারের পুরোনো ঋণের প্রকৃত মূল্য কমাতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে মূল্যস্ফীতি দিয়ে সহজেই পুরো জাতীয় ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব। বরং অতিরিক্ত মূল্যস্ফীতি নতুন সমস্যাও তৈরি করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণ ইতোমধ্যে ৪০ লাখ কোটি ডলার অতিক্রম করেছে। দেশটির অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৮ আগস্ট মোট সরকারি ঋণ ৪০ দশমিক শূন্য ৫ লাখ কোটি ডলারে পৌঁছেছিল। এক দশকেরও কম সময়ে ঋণের পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। সরকারের আয় অপেক্ষা ব্যয় বেশি হওয়ায় ঘাটতি পূরণ করতে নিয়মিত নতুন ঋণ নিতে হচ্ছে।

এ অবস্থায় মূল্যস্ফীতি বাড়লে পুরোনো ঋণের প্রকৃত মূল্য কমতে পারে ঠিকই, কিন্তু নতুন ঋণের খরচও বেড়ে যেতে পারে। বিনিয়োগকারীরা যদি মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সহ্য করছে, তাহলে তারা সরকারি ঋণপত্র কেনার বিনিময়ে বেশি সুদ দাবি করতে পারেন। এতে সরকারের নতুন ঋণ নেওয়ার ব্যয় বাড়বে। ফলে একদিকে পুরোনো ঋণের প্রকৃত মূল্য কিছুটা কমলেও অন্যদিকে সুদ পরিশোধের চাপ আরও বাড়তে পারে।

সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ঋণপত্রের সুদের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অক্টোবরের শুরুতে ১০ বছর মেয়াদি সরকারি ঋণপত্রের সুদের হার পাঁচ শতাংশের ওপরে উঠেছে বলে সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ঋণের পরিমাণ, মূল্যস্ফীতি এবং সরকারের ধার নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা সবকিছু মিলিয়ে আর্থিক বাজারে উদ্বেগ বাড়ছে।

ট্রাম্প অবশ্য শুধু মূল্যস্ফীতির কথা বলেননি। তিনি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ঋণ কমানোর প্রধান উপায়ের একটি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এর আগে তিনি বলেছিলেন, ৪০ লাখ কোটি ডলারের ঋণ সময়ের সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে সামলানো হবে। অর্থাৎ তাঁর বক্তব্যের পূর্ণ প্রেক্ষাপট হলো প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং ঋণ ব্যবস্থাপনা শুধু অর্থ ছাপানো নয়। 

ট্রাম্পের জাতীয় অর্থনৈতিক উপদেষ্টার বক্তব্যও বিষয়টিকে আরও জটিল করেছে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রশাসনের ভেতরেই ট্রাম্পের মূল্যস্ফীতি-সংক্রান্ত মন্তব্যের ব্যাখ্যা নিয়ে ভিন্নতা রয়েছে। ফলে এটিকে সরাসরি সরকারের আনুষ্ঠানিক ‘মূল্যস্ফীতি দিয়ে ঋণ মুছে ফেলার পরিকল্পনা’ বলা এখনই যুক্তিসঙ্গত নয়। 

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো অর্থ ছাপানোর বিষয়টি। যুক্তরাষ্ট্রে নতুন অর্থের সরবরাহ ও মুদ্রানীতি মূলত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আওতায়। প্রেসিডেন্ট একতরফাভাবে ইচ্ছামতো অর্থ ছাপিয়ে সরকারি ঋণ পরিশোধ করতে পারেন এমন ধারণা বাস্তব ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি, সুদের হার এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের সিদ্ধান্ত আলাদা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়।

মূল্যস্ফীতি বেশি হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়ে। খাদ্য, বাসস্থান, জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে পারে। মজুরি একই গতিতে না বাড়লে মানুষের প্রকৃত আয় কমে যায়। ফলে সরকারের ঋণের প্রকৃত মূল্য কিছুটা কমানোর বিনিময়ে সাধারণ মানুষের ওপর বড় মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হতে পারে।

বিটকয়েন ও অন্যান্য ক্রিপ্টো সম্পদের প্রসঙ্গও এই কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় এসেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা থাকলে সীমিত সরবরাহের সম্পদ বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হতে পারে। তবে মূল্যস্ফীতি বাড়লেই বিটকয়েন বা অন্য কোনো ক্রিপ্টো সম্পদের দাম নিশ্চিতভাবে বাড়বে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই। এসব সম্পদের দাম সুদের হার, বাজারের তারল্য, বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি গ্রহণের মানসিকতা, নিয়ন্ত্রণনীতি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপরও নির্ভর করে।


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর