গ্র্যান্ড আইল্যান্ডে ট্রাম্পের সমাবেশে উত্তাল জনতা, মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জোরালো ডাক
নেব্রাস্কার গ্র্যান্ড আইল্যান্ডে ট্রাম্পের সমাবেশে সমর্থকদের উচ্ছ্বাস, মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চাইলেন তিনি, অর্থনীতি ও জ্বালানি দামেও বার্তা।
গ্র্যান্ড আইল্যান্ডে ট্রাম্পের সমাবেশে উত্তাল জনতা, মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জোরালো ডাক
যুক্তরাষ্ট্রের নেব্রাস্কা অঙ্গরাজ্যের গ্র্যান্ড আইল্যান্ড শহরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্বাচনী সমাবেশকে ঘিরে ব্যাপক জনসমাগম ও উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। ৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে বিপুলসংখ্যক সমর্থক জড়ো হন এবং ট্রাম্প মঞ্চে ওঠার সময় উপস্থিত জনতার মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস তৈরি হয়। তবে প্রচারিত দাবিতে সমাবেশটিকে চলতি মধ্যবর্তী নির্বাচনী প্রচারের সূচনা হিসেবে বর্ণনা করা হলেও তথ্য যাচাই করে দেখা যাচ্ছে, এটি ছিল তাঁর ইতোমধ্যে শুরু হওয়া দেশব্যাপী নির্বাচনী প্রচারাভিযানের নেব্রাস্কা পর্ব, একেবারে সূচনা নয়।
নেব্রাস্কার গ্র্যান্ড আইল্যান্ডের পিনাকল ব্যাংক এক্সপো কেন্দ্রে এই সমাবেশের আয়োজন করা হয়। আয়োজকদের প্রকাশিত কর্মসূচি অনুযায়ী, স্থানীয় সময় দুপুর আড়াইটায় প্রবেশের দরজা খোলার কথা ছিল, বিকেল সাড়ে চারটায় অনুষ্ঠান শুরু এবং সন্ধ্যা ছয়টায় ট্রাম্পের বক্তব্য দেওয়ার সময় নির্ধারিত ছিল। সমাবেশের আগেই দীর্ঘ সারিতে সমর্থকদের অপেক্ষা করতে দেখা যায়। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনুষ্ঠানের জন্য অতিরিক্ত চেয়ারও আনা হয়েছিল এবং হলের বিভিন্ন অংশে আসন পূর্ণ হয়ে যায়।
ট্রাম্পের এই সফরের প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল নেব্রাস্কার রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে সমর্থন জোরদার করা। বিশেষ করে বর্তমান রিপাবলিকান সিনেটর পিট রিকেটসের নির্বাচনী প্রচারে ট্রাম্প সরাসরি অংশ নেন। রিকেটস স্বতন্ত্র প্রার্থী ড্যান অসবর্নের মুখোমুখি হচ্ছেন। ফলে ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত নেব্রাস্কাতেও দলটি আসন্ন নির্বাচনে ভোটারদের সক্রিয় রাখতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
ট্রাম্প সমাবেশে উপস্থিত সমর্থকদের উদ্দেশে নভেম্বরের নির্বাচনে তাঁকে যেন ভোটের প্রার্থী হিসেবে কল্পনা করার আহ্বান জানান। তিনি মূলত ভোটারদের বোঝাতে চান, মধ্যবর্তী নির্বাচনকে তাঁর প্রশাসনের কাজ ও নীতির ওপর এক ধরনের গণরায় হিসেবে দেখা উচিত। যদিও মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্প নিজে প্রার্থী নন, তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব এবং জনপ্রিয়তা রিপাবলিকান প্রার্থীদের প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
যুক্তরাষ্ট্রে আগামী ৩ নভেম্বর মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের সব ৪৩৫টি আসন এবং সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনের জন্য ভোট হবে। নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করবে আগামী দুই বছর কংগ্রেসের দুই কক্ষে কোন রাজনৈতিক দল সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকবে। তাই ট্রাম্পের জন্য এই নির্বাচন শুধু স্থানীয় প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ের বিষয় নয়; তাঁর প্রশাসনের রাজনৈতিক শক্তি ও ভবিষ্যৎ নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রেও এর বড় প্রভাব রয়েছে।
সমাবেশে অর্থনীতি ও জ্বালানির মূল্যও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। নেব্রাস্কার কৃষক ও পরিবহন খাতের মানুষের জন্য জ্বালানির দাম বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাম্প গ্র্যান্ড আইল্যান্ডের সমাবেশ থেকেই করমুক্ত রঞ্জিত ডিজেল ব্যবহারের ওপর থাকা কিছু সীমাবদ্ধতা শিথিল করার নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন। তাঁর দাবি, এর ফলে কৃষক ও অন্যান্য ব্যবহারকারীরা জ্বালানি ব্যয়ে সুবিধা পাবেন এবং পণ্য পরিবহনের খরচ কমলে সামগ্রিকভাবে নিত্যপণ্যের দামের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।
তবে এই পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ জ্বালানির মূল্য শুধু করের ওপর নির্ভর করে না; সরবরাহ, আন্তর্জাতিক বাজার, পরিশোধন ক্ষমতা ও বৈশ্বিক সংঘাতও এতে বড় ভূমিকা রাখে। ফলে করমুক্ত জ্বালানির সুযোগ বাড়ালেই সাধারণ মানুষের জ্বালানি ব্যয় কতটা কমবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
ট্রাম্পের নেব্রাস্কা সফরের আরেকটি তাৎপর্য হলো, অঙ্গরাজ্যটি ঐতিহাসিকভাবে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হলেও এবারের কিছু প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনী লড়াই দলটির জন্য বাড়তি গুরুত্ব পেয়েছে। ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প নেব্রাস্কায় বিশাল ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন। গ্র্যান্ড আইল্যান্ড-অন্তর্ভুক্ত হল কাউন্টিতেও তিনি সাম্প্রতিক কয়েকটি নির্বাচনে শক্তিশালী ফল করেছেন। তারপরও জাতীয় পর্যায়ে অর্থনীতি, মূল্যবৃদ্ধি ও জ্বালানির দাম নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষের কারণে রিপাবলিকান নেতৃত্ব এই অঞ্চলে ভোটার উপস্থিতি বাড়াতে সক্রিয় হচ্ছে।
সমাবেশের বাইরে অবশ্য ট্রাম্পবিরোধী বিক্ষোভও হয়েছে। স্থানীয় প্রতিবেদনে সমর্থকদের পাশাপাশি বিরোধীদের উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে। ফলে পুরো আয়োজনটি শুধু সমর্থকদের উচ্ছ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; ট্রাম্পের নীতির বিরোধিতাকারীরাও নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করেছেন। স্থানীয় পর্যায়ে কৃষি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারের অর্থনৈতিক নীতি নিয়ে ভিন্নমতও প্রকাশ পায়।
ট্রাম্পের এই নেব্রাস্কা সমাবেশ তাঁর দীর্ঘ নির্বাচনী প্রচারযাত্রার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তিনি ঘোষণা করেছেন, ৩ নভেম্বরের ভোট পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে গিয়ে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে প্রচার চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে তিনি টেক্সাস, ওকলাহোমা, আলাবামা ও ওহাইওসহ বিভিন্ন এলাকায় সমাবেশ করেছেন। সামনে আরও কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে তাঁর প্রচারণা চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে জাতীয় জনমত ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের জন্য পুরোপুরি স্বস্তিদায়ক নয়। রয়টার্স ও ইপসোসের সাম্প্রতিক জরিপে ট্রাম্পের অনুমোদনের হার ৩২ শতাংশে নেমে এসেছে এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনে কোন দলকে সমর্থন করবেন এ প্রশ্নে নিবন্ধিত ভোটারদের মধ্যে ডেমোক্র্যাটদের তুলনায় রিপাবলিকানদের সমর্থন কম দেখা গেছে। যদিও এসব জরিপ জাতীয় চিত্র তুলে ধরে এবং কোনো নির্দিষ্ট আসনের ফলাফল নিশ্চিত করে না, তবু রিপাবলিকানদের জন্য নির্বাচনী মাঠ যে সহজ নয়, তা বোঝা যায়।
গ্র্যান্ড আইল্যান্ডের সমাবেশে ট্রাম্পের সমর্থকদের ব্যাপক উপস্থিতি ও উচ্ছ্বাসের দাবি সত্য। সমাবেশটি বাস্তবেই অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং বিপুলসংখ্যক সমর্থক সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তবে এটিকে মধ্যবর্তী নির্বাচনী প্রচারের একেবারে সূচনা বলা সঠিক নয়, কারণ ট্রাম্প এর আগেই বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে প্রচার শুরু করেছিলেন। বরং নেব্রাস্কার এই সমাবেশকে তাঁর চলমান দেশব্যাপী নির্বাচনী প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্ব হিসেবে বর্ণনা করাই বেশি নির্ভুল। একই সঙ্গে জ্বালানি মূল্য কমানোর উদ্যোগ এবং রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে সরাসরি ভোট চাওয়া প্রমাণ করে, নভেম্বরের নির্বাচন ঘিরে ট্রাম্প তাঁর রাজনৈতিক প্রভাবকে সর্বোচ্চভাবে কাজে লাগাতে চাইছেন।