ট্রাম্পের আমেরিকাল্যান্ড ছবি ঘিরে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে জল্পনা বাস্তবতা নাকি কৃত্রিম রাজনৈতিক প্রচারণা

ট্রাম্পের ছবি গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার বাস্তব ঘোষণা নয় তবে নিরাপত্তা চুক্তিতে ওয়াশিংটনের সামরিক প্রভাব বেড়েছে আর্কটিক অঞ্চলে দ্রুত ভাবে

ট্রাম্পের আমেরিকাল্যান্ড ছবি ঘিরে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে জল্পনা বাস্তবতা নাকি কৃত্রিম রাজনৈতিক প্রচারণা

ট্রাম্পের আমেরিকাল্যান্ড ছবি ঘিরে গ্রিনল্যান্ড নিয়ে জল্পনা বাস্তবতা নাকি কৃত্রিম রাজনৈতিক প্রচারণা


মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত গ্রিনল্যান্ডকেন্দ্রিক নতুন ছবি ঘিরে আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। ছবির সঙ্গে ‘আমেরিকাল্যান্ড’ নামটি ব্যবহার করে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একীভূত করার একটি কল্পিত দৃশ্য তুলে ধরা হয়েছে। তবে তথ্য যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া যায়, গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি এবং ‘আমেরিকাল্যান্ড’ নামে কোনো সরকারি অঞ্চলও তৈরি হয়নি।

ছবিটি মূলত রাজনৈতিক প্রচারণা ও কল্পনাপ্রসূত উপস্থাপনার অংশ হিসেবে দেখা উচিত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো ছবি প্রকাশিত হওয়া নিজে থেকে কোনো ভূখণ্ডের মালিকানা পরিবর্তনের প্রমাণ নয়। বিশেষ করে গ্রিনল্যান্ডের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দ্বীপটি এখনো ডেনমার্কের রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত স্বশাসিত অঞ্চল। সাম্প্রতিক নিরাপত্তা চুক্তিতেও এই অবস্থান পরিবর্তন করা হয়নি।

তবে ছবিটির পেছনে যে বাস্তব ভূরাজনৈতিক ঘটনা রয়েছে, সেটি যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। ২২ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র, ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের নেতারা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় একটি নতুন নিরাপত্তা চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। চুক্তির উদ্দেশ্য হলো গ্রিনল্যান্ড ও বৃহত্তর আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদার করা এবং রাশিয়া ও চীনের মতো প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির সম্ভাব্য সামরিক উপস্থিতি ঠেকানো। 

চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি আরও বিস্তৃত করার সুযোগ। বিদ্যমান পিতুফিক মহাকাশ ঘাঁটির কার্যক্রম আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের পাশাপাশি নতুন প্রতিরক্ষা এলাকা তৈরির সুযোগ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে আর্কটিক অঞ্চলে উত্তর আটলান্টিক জোটের সামরিক উপস্থিতিও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। ডেনমার্কের প্রতিরক্ষামন্ত্রী বলেছেন, ভবিষ্যতে ওই অঞ্চলে জোটের বর্ধিত সামরিক উপস্থিতি স্থায়ী হতে পারে। 

কিন্তু এখানেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তিকর দাবির সঙ্গে বাস্তবতার পার্থক্য স্পষ্ট। চুক্তির মূল নথিতে ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারও স্বীকৃত হয়েছে। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের মালিক হয়ে যায়নি এবং দ্বীপটি মার্কিন অঙ্গরাজ্য বা নতুন মার্কিন অঞ্চলও হয়নি। 

চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে গ্রিনল্যান্ড স্বাধীনতা অর্জন করলেও বর্তমান নিরাপত্তা ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো বহাল থাকবে। স্বাধীনতা অর্জনের ক্ষেত্রে নতুন রাষ্ট্রকে উত্তর আটলান্টিক জোটের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়ে সম্মত হতে হবে এবং বর্তমান চুক্তির নির্দিষ্ট অধিকার ও দায়িত্ব গ্রহণ করতে হবে। ফলে চুক্তিটি শুধু বর্তমান পরিস্থিতি নয়, গ্রিনল্যান্ডের সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ স্বাধীনতার বিষয়টিও বিবেচনায় রেখেছে।

ট্রাম্প অবশ্য চুক্তিটিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় কৌশলগত সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেছেন। হোয়াইট হাউসের ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তির মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ ও সামরিক সুবিধা পেয়েছে। তবে একই সরকারি নথিতেই ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব এবং গ্রিনল্যান্ডের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার স্বীকার করা হয়েছে। তাই ‘নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ’ এবং ‘ভূখণ্ডের মালিকানা’—এই দুটি বিষয়কে এক করে দেখা সঠিক নয়।

গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের আগ্রহ অবশ্য নতুন নয়। তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নেওয়ার পর দ্বীপটির কৌশলগত গুরুত্ব নিয়ে তিনি একাধিকবার কথা বলেছেন। আর্কটিক অঞ্চলে রাশিয়া ও চীনের ক্রমবর্ধমান তৎপরতা, নতুন নৌপথের সম্ভাবনা, সামরিক অবস্থান এবং প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্রের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নতুন চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব বাস্তবেই বেড়েছে। বিশেষ করে সামরিক ঘাঁটি সম্প্রসারণ, প্রতিরক্ষা অবকাঠামো এবং আর্কটিক অঞ্চলে নজরদারি ও প্রতিরোধ সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ ওয়াশিংটনকে কৌশলগত সুবিধা দেবে। একই সঙ্গে ডেনমার্ক ও উত্তর আটলান্টিক জোটও আর্কটিক নিরাপত্তায় নিজেদের ভূমিকা আরও জোরদার করছে।

তবে ‘আমেরিকাল্যান্ড’ কোনো স্বীকৃত সরকারি নাম নয়। গ্রিনল্যান্ডের পতাকা, প্রশাসন, আন্তর্জাতিক অবস্থান বা সার্বভৌমত্ব যুক্তরাষ্ট্রের হাতে চলে যাওয়ার কোনো ঘোষণা নেই। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিটিকে দেখে যদি কেউ দাবি করেন যে ট্রাম্প ইতোমধ্যে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ বানিয়ে ফেলেছেন, সেটি হবে বিভ্রান্তিকর তথ্য।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর