হাম ছড়ানোর মধ্যেই বড় উদ্যোগ, ৩৪ লাখ শিশুকে টিকা দিতে বাংলাদেশের পাশে যুক্তরাষ্ট্র

হাম-রুবেলার ঝুঁকি মোকাবিলায় বাংলাদেশে বড় টিকাদান অভিযান শুরু হয়েছে। দেশজুড়ে ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রায় ৩৪ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের এই উদ্যোগে ইউনিসেফের মাধ্যমে সহায়তা করছে যুক্তরাষ্ট্র। ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে বিশেষ এই টিকাদান কর্মসূচি।

হাম ছড়ানোর মধ্যেই বড় উদ্যোগ, ৩৪ লাখ শিশুকে টিকা দিতে বাংলাদেশের পাশে যুক্তরাষ্ট্র

হাম ছড়ানোর মধ্যেই বড় উদ্যোগ, ৩৪ লাখ শিশুকে টিকা দিতে বাংলাদেশের পাশে যুক্তরাষ্ট্র


বাংলাদেশে চলমান ভয়াবহ হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আবারও বড় পরিসরে টিকাদান অভিযান জোরদার করেছে সরকার। এবার দেশজুড়ে ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রায় ৩৪ লাখ শিশুকে হাম ও রুবেলার টিকার আওতায় আনার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এই বিশেষ কর্মসূচিতে ইউনিসেফের মাধ্যমে সহায়তা করছে যুক্তরাষ্ট্র। ৭ অক্টোবর ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস এ তথ্য জানিয়েছে।

মার্কিন দূতাবাসের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, America First Global Health Strategy-এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্র ইউনিসেফের মাধ্যমে বাংলাদেশের জাতীয় হাম-রুবেলা ক্যাচ-আপ টিকাদান কর্মসূচিতে সহায়তা করছে। চলমান হাম প্রাদুর্ভাবের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের সুরক্ষা দেওয়াই এই সহযোগিতার অন্যতম লক্ষ্য।

বুধবার ঢাকার কড়াইলের টিঅ্যান্ডটি মাঠে চলমান টিকাদান কার্যক্রম পরিদর্শন করেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স এরিক গিলান। সেখানে তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মোহাম্মদ আবদুল মুহিত, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী এবং ইউনিসেফ বাংলাদেশের কর্মকর্তারা।

সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, চলমান বিশেষ কর্মসূচিতে আরও প্রায় ৩৫ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। ৭ অক্টোবর পর্যন্ত জাতীয় হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রমে প্রায় ২ কোটি শিশু টিকার আওতায় এসেছে। তবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু আগের কর্মসূচিতে বাদ পড়ায় নতুন করে ক্যাচ-আপ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।

গত ২৬ সেপ্টেম্বর দেশব্যাপী ‘Intensified MR Catch-up Vaccination’ কর্মসূচি শুরু হয়। ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চলার কথা থাকা এই অভিযানের আওতায় ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের বিশেষভাবে টিকা দেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা আগের কর্মসূচিতে বাদ পড়া শিশুদের শনাক্ত করার পাশাপাশি সম্প্রতি ছয় মাস বয়স পূর্ণ করা শিশুদেরও তালিকাভুক্ত করছেন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, লক্ষ্য করা ৩৪ লাখ শিশুর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ শিশু সম্প্রতি ছয় মাস বয়সে পৌঁছেছে, আর প্রায় ২৪ লাখ শিশু আগের টিকাদান কার্যক্রমে বাদ পড়েছিল। ফলে এবারের অভিযান শুধু নতুন শিশুদের টিকা দেওয়া নয়, বরং পুরোনো টিকাদান ঘাটতিও পূরণের চেষ্টা।

বাংলাদেশে এবারের হাম পরিস্থিতির ভয়াবহতা এই বিশেষ অভিযানের অন্যতম কারণ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এপ্রিল মাসেই জানিয়েছিল, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতে হাম সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরাই আক্রান্তদের বড় অংশ। WHO তখন জাতীয় পর্যায়ে হাম পরিস্থিতির ঝুঁকি উচ্চ বলে মূল্যায়ন করেছিল।

পরবর্তীতে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়েছে। ২৬ সেপ্টেম্বর রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, মার্চের মাঝামাঝি থেকে বাংলাদেশে বিপুলসংখ্যক সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং এক হাজারের বেশি মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র বাংলাদেশের চলমান পরিস্থিতিকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাব হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

হাম পরিস্থিতির পাশাপাশি বাংলাদেশ বর্তমানে ডেঙ্গু নিয়েও চাপের মধ্যে রয়েছে। অক্টোবরের শুরুতে রয়টার্স জানিয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গুতে ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত মৃত্যুর সংখ্যা অন্তত ২৪৫-এ পৌঁছেছে। ফলে একই সময়ে দুটি সংক্রামক রোগের চাপ বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

হাম প্রতিরোধে টিকাদানের গুরুত্ব বিশেষভাবে বেশি, কারণ রোগটি অত্যন্ত সংক্রামক। WHO-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক টিকাদান ঘাটতির পেছনে ২০২৪ ও ২০২৫ সালে হাম-রুবেলা টিকার সরবরাহ ঘাটতি এবং নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বিভিন্ন ধরনের ঘাটতি ভূমিকা রেখেছে। এর ফলে একটি বড়সংখ্যক শিশু পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ছাড়াই থেকে গেছে।

এবারের কর্মসূচিতে শিশুদের কাছে পৌঁছাতে শুধু নির্ধারিত টিকাকেন্দ্রের ওপর নির্ভর করা হচ্ছে না। স্বাস্থ্যকর্মী ও স্বেচ্ছাসেবকেরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের টিকা নেওয়ার তথ্য যাচাই করছেন। ইউনিয়ন পর্যায়ে টিকাদান কেন্দ্র চালু করা হয়েছে। কর্মজীবী বাবা-মায়ের সুবিধার জন্য কিছু এলাকায় সন্ধ্যার পরও টিকাদান কার্যক্রম রাখা হয়েছে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও বাদ পড়া শিশুদের খুঁজে বের করতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রয়োজন অনুযায়ী লক্ষ্যভিত্তিক প্রচার ও বিশেষ পরিবহন সুবিধার মাধ্যমে টিকাদান কেন্দ্রে শিশুদের নিয়ে আসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

ইউনিসেফ বলছে, চলমান কর্মসূচির সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হলো কোনো ঝুঁকিপূর্ণ শিশুকে টিকার বাইরে না রাখা। সংস্থাটি সরকারের সঙ্গে পরিকল্পনা, টিকা সরবরাহ, ঠান্ডা সংরক্ষণ ব্যবস্থা, জনসচেতনতা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নে কাজ করছে। এর আগে এপ্রিলের দেশব্যাপী কর্মসূচিতেও ইউনিসেফ জানিয়েছিল, অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে সুরক্ষার আওতায় আনা জরুরি।

শুধু বর্তমান হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ নয়, ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রাদুর্ভাব যাতে আবার বড় আকার ধারণ না করে, সে বিষয়েও নতুন করে পর্যালোচনা শুরু করেছে বাংলাদেশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ২০২৬ সালের হাম প্রাদুর্ভাবের পর দেশের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির একটি স্বাধীন পর্যালোচনা শুরু হয়েছে।

এই পর্যালোচনায় টিকার সরবরাহ, সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যকর্মী, টিকাদানের আওতা, তথ্যব্যবস্থা, রোগ নজরদারি এবং ভবিষ্যৎ প্রাদুর্ভাব মোকাবিলার সক্ষমতা পরীক্ষা করা হচ্ছে। দেশের আটটি বিভাগেই মাঠপর্যায়ে পর্যালোচনা চালানো হচ্ছে। প্রাথমিক ফলাফল ১৪ অক্টোবর এবং খসড়া প্রতিবেদন ও কর্মপরিকল্পনা নভেম্বরে দেওয়ার কথা রয়েছে।

এদিকে ৭ অক্টোবরের অনুষ্ঠানে মার্কিন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স এরিক গিলান বলেন, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের চলমান হাম পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিকে সমর্থন করতে পেরে সন্তুষ্ট। যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা শুধু বর্তমান প্রাদুর্ভাব মোকাবিলা নয়, ভবিষ্যতে রোগ প্রতিরোধ ও মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতেও সহায়ক হবে বলে মার্কিন দূতাবাস জানিয়েছে।

বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো টিকার আওতার বাইরে থাকা প্রতিটি শিশুকে শনাক্ত করা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের টিকা দেওয়া। কারণ টিকাদান কর্মসূচি যত দ্রুত ও ব্যাপকভাবে বাস্তবায়ন করা যাবে, হাম সংক্রমণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের সংখ্যা তত দ্রুত কমানো সম্ভব হবে।

৩১ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে বর্তমান বিশেষ অভিযান। ৩৪ লাখ শিশুকে লক্ষ্য করে নেওয়া এই কর্মসূচি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে চলমান হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে টিকাদান ব্যবস্থার স্বাধীন পর্যালোচনা থেকে পাওয়া সুপারিশ বাস্তবায়ন করা গেলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের শিশুদের হাম ও রুবেলার মতো প্রতিরোধযোগ্য রোগ থেকে আরও কার্যকরভাবে সুরক্ষা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর