নেব্রাস্কা সমাবেশে যুদ্ধের মূল্য নিয়ে ট্রাম্পের বিতর্কিত মন্তব্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া ক্যালিফোর্নিয়ায় উঠল
যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপকে সাময়িক মূল্য বলে মন্তব্য করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নেব্রাস্কার সমাবেশে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন আবারও।
নেব্রাস্কা সমাবেশে যুদ্ধের মূল্য নিয়ে ট্রাম্পের বিতর্কিত মন্তব্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া ক্যালিফোর্নিয়ায় উঠল
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সোমবার নেব্রাস্কার গ্র্যান্ড আইল্যান্ডে রিপাবলিকান সমর্থকদের এক নির্বাচনী সমাবেশে যুদ্ধ, জ্বালানির মূল্য, মূল্যস্ফীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য দেন। বক্তব্যের এক পর্যায়ে ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি এমন মন্তব্য করেন, যা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ব্যাপক রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে তার দাবি, এই মূল্যবৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী হবে না এবং সংঘাত শেষ হলে দাম দ্রুত কমে আসবে। তিনি যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপকে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য গ্রহণযোগ্য মূল্য হিসেবে তুলে ধরেন।
এরপর বক্তব্যের সবচেয়ে বিতর্কিত অংশে ট্রাম্প বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কোনো একটি শহরে হামলা চালাতে পারে এবং লস অ্যাঞ্জেলেস বা সান ডিয়েগোর মতো শহরের কথা উল্লেখ করেন। তিনি এই সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতিকেও তুলনামূলকভাবে ‘ছোট মূল্য’ হিসেবে বর্ণনা করেন। তার বক্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর ক্যালিফোর্নিয়ার রাজনৈতিক নেতাদের পাশাপাশি কয়েকজন রিপাবলিকান নেতাও এর সমালোচনা করেন।
তবে বক্তব্যটির ব্যাখ্যা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় রয়েছে। ট্রাম্প সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের কোনো শহরে হামলা চালানোর আহ্বান জানিয়েছেন এমন দাবি পুরো বক্তব্যের প্রেক্ষাপটের সঙ্গে মেলে না। তার বক্তব্যের মূল প্রসঙ্গ ছিল ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ঠেকানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যুদ্ধের অর্থনৈতিক মূল্য নিয়ে আলোচনা। পরে হোয়াইট হাউসের যোগাযোগবিষয়ক পরিচালক স্টিভেন চিয়াং বলেন, ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোতে হামলা সমর্থন করেননি; বরং তিনি ইরানের সম্ভাব্য হুমকি প্রতিরোধের প্রসঙ্গ তুলে ধরছিলেন।
তবে এটিও সত্য যে ট্রাম্পের ব্যবহৃত শব্দগুলো ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট এবং বিতর্কিত। তিনি লস অ্যাঞ্জেলেস ও সান ডিয়েগোর মতো জনবহুল মার্কিন শহরের নাম সরাসরি উল্লেখ করেছেন। ফলে বক্তব্যটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও রাজনৈতিক মহলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকে এটিকে নাগরিক নিরাপত্তার বিষয়ে অসংবেদনশীল মন্তব্য হিসেবে দেখেন।
গ্র্যান্ড আইল্যান্ডের সমাবেশটি মূলত নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পক্ষে জনসমর্থন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে আয়োজন করা হয়। নেব্রাস্কা ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হলেও এবারের নির্বাচনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে সিনেটর পিট রিকেটসের আসন ধরে রাখা এবং রাজ্যের অন্যান্য নির্বাচনী প্রতিযোগিতা নিয়ে রিপাবলিকান শিবিরে উদ্বেগ রয়েছে। ট্রাম্পের এই সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল দলের ভোটারদের সক্রিয় করা এবং নির্বাচনে তার প্রশাসনের নীতিকে কেন্দ্রীয় ইস্যুতে পরিণত করা।
সমাবেশে ট্রাম্প জ্বালানি ও কৃষি খাতের ব্যয় কমানোর উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন। তিনি কৃষিকাজ ও অন্যান্য নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ব্যবহৃত রঙিন ডিজেল জ্বালানির করমুক্ত ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানোর জন্য একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়, এর ফলে কৃষক ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যবহারকারীদের ব্যয় কমতে পারে এবং পণ্যের সামগ্রিক মূল্য কমানোর ক্ষেত্রে কিছুটা সহায়তা মিলতে পারে।
তবে জ্বালানির মূল্য কমানোর এই উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশ্লেষকদের মধ্যে প্রশ্ন রয়েছে। জ্বালানির বাজারে সরবরাহ, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি এবং অপরিশোধিত তেলের দামের মতো বিষয়গুলো অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শুধু কর কমানো বা করমুক্ত ব্যবহারের সুযোগ বাড়ালেই সব ধরনের পণ্যের দাম দ্রুত কমে যাবে এমন নিশ্চয়তা নেই।
সমাবেশে ট্রাম্প আরও দাবি করেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাত দ্রুত শেষ হবে এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে তেল ও জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর কার্যক্রম এবং ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টির বিষয়েও বক্তব্য দেন। তবে এসব বক্তব্যের অনেকটাই ছিল রাজনৈতিক বক্তব্য ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে তার পূর্বাভাস; এগুলোকে নিশ্চিত অর্থনৈতিক ফলাফল হিসেবে দেখা যায় না।
মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে ট্রাম্প তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দায়ী করেন। তিনি দাবি করেন, আগের সরকারের সময় যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি ও জ্বালানির দাম অত্যন্ত বেড়েছিল। একই সঙ্গে তিনি বলেন, তার প্রশাসনের সময়ে দাম কমানোর চেষ্টা চলছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতির প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণে নির্দিষ্ট সরকারি অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান প্রয়োজন; রাজনৈতিক সমাবেশে দেওয়া বক্তব্য একা অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্র প্রমাণ করে না।
তথ্য যাচাই করে বলা যায়, নেব্রাস্কার গ্র্যান্ড আইল্যান্ডে ৫ অক্টোবর ট্রাম্প সত্যিই যুদ্ধের অর্থনৈতিক চাপ এবং জ্বালানির মূল্য নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন এবং লস অ্যাঞ্জেলেস ও সান ডিয়েগোর সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির কথাও বলেছেন। এ বক্তব্যের অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তার বক্তব্যের পূর্ণ প্রতিলিপিও প্রকাশিত হয়েছে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যদি এটিকে এমনভাবে প্রচার করা হয় যে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোতে ইরানের হামলা চেয়েছেন বা শহর ধ্বংসকে সরাসরি সমর্থন করেছেন, সেটি তার বক্তব্যের পূর্ণ প্রেক্ষাপটকে অতিরঞ্জিত করে। নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, তিনি সম্ভাব্য হামলার উদাহরণ দিয়ে যুদ্ধের মূল্য ও জাতীয় নিরাপত্তার যুক্তি তুলে ধরেছিলেন; পরে হোয়াইট হাউসও একই ব্যাখ্যা দিয়েছে।
সুতরাং মূল ঘটনাটি সত্য, কিন্তু বক্তব্যের ব্যাখ্যায় সতর্কতা প্রয়োজন। ট্রাম্পের মন্তব্য যেমন বাস্তব এবং বিতর্কিত, তেমনি এটিকে সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের শহরে হামলার আহ্বান হিসেবে উপস্থাপন করাও সম্পূর্ণ তথ্যনির্ভর নয়। তার বক্তব্যের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ, জাতীয় নিরাপত্তা, জ্বালানি ব্যয় এবং আসন্ন নির্বাচনের আগে অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলার রাজনৈতিক বার্তা।