গুলি চালিয়ে ১৩ জনকে হত্যার মামলায় সাবেক মেজরের মৃত্যুদণ্ডে ট্রাম্পের চূড়ান্ত অনুমোদন
ফোর্ট হুড হামলায় ১৩ জন নিহতের মামলায় সাবেক মেজর নিডাল হাসানের গুলিবর্ষণকারী দলের মৃত্যুদণ্ডে অনুমোদন দিয়েছেন ট্রাম্প, যা ইতিহাসে বিরল।
গুলি চালিয়ে ১৩ জনকে হত্যার মামলায় সাবেক মেজরের মৃত্যুদণ্ডে ট্রাম্পের চূড়ান্ত অনুমোদন
নিডাল মালিক হাসান ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর একজন মনোরোগ চিকিৎসক ও মেজর। ২০০৯ সালের ৫ নভেম্বর টেক্সাসের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে তিনি সহকর্মী সেনাসদস্যদের ওপর গুলি চালান। ওই হামলায় ১৩ জন নিহত হন এবং আরও ৩২ জন আহত হন। নিহতদের মধ্যে সক্রিয় দায়িত্বে থাকা সেনাসদস্যদের পাশাপাশি একজন অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্যও ছিলেন। হামলাটি সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সামরিক ঘাঁটিতে সংঘটিত সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলাগুলোর একটি হিসেবে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
হামলার সময় হাসান একটি সামরিক চিকিৎসাকেন্দ্রে প্রবেশ করে সেনাদের লক্ষ্য করে গুলি চালান। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা এবং আদালতের নথি অনুযায়ী, তিনি হামলার সময় ধর্মীয় স্লোগান উচ্চারণ করেছিলেন। পরে আদালতে নিজের কর্মকাণ্ডের দায়ও তিনি অস্বীকার করেননি। বরং তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, আফগানিস্তানে মার্কিন সেনাদের মোতায়েন এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে সামরিক কর্মকাণ্ড নিয়ে তাঁর আপত্তি ছিল। তিনি নিজেই নিজের পক্ষে আইনি লড়াই পরিচালনা করেছিলেন এবং হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করার কাছাকাছি অবস্থান নিয়েছিলেন।
২০১৩ সালে সামরিক আদালতে হাসানকে ১৩টি পরিকল্পিত হত্যার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। একই সঙ্গে আরও বহু মানুষকে হত্যার চেষ্টা ও গুরুতর অপরাধের অভিযোগেও তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। আদালত তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। রায়ের পর তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কারাগার ফোর্ট লিভেনওয়ার্থে রাখা হয়। সামরিক আইনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে দীর্ঘ বিচারিক ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়।
হাসানের বিরুদ্ধে দেওয়া মৃত্যুদণ্ড পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বিচারিক পর্যায়ে বহাল থাকে। ২০২০ সালে সেনাবাহিনীর আপিল আদালত মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে। পরে সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ আপিল আদালতও তা বহাল রাখে। ২০২৫ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালত তাঁর মামলায় বিচারিক পুনর্বিবেচনার আবেদন গ্রহণ করেনি। এর ফলে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পথে বড় ধরনের আইনি বাধা অনেকটাই কমে যায়।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরেই প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কাছে হাসানের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্য আবেদন করেছিলেন। চলতি বছরের অক্টোবরে ট্রাম্প সেই অনুমোদন দেন। প্রতিরক্ষা দপ্তরের মুখপাত্র শন পারনেল জানান, হেগসেথের সুপারিশের ভিত্তিতেই ট্রাম্প গুলিবর্ষণকারী দলের মাধ্যমে হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অনুমোদন দিয়েছেন। সেনাবাহিনীর ভারপ্রাপ্ত সচিব অ্যাডাম টেল এই কার্যক্রমের সময় ও স্থান নির্ধারণের দায়িত্বে রয়েছেন।
এই সিদ্ধান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি। হাসানের ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী ওষুধ প্রয়োগের পরিবর্তে গুলিবর্ষণকারী দলের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যবস্থায় এমন পদ্ধতি অত্যন্ত বিরল। সর্বশেষ কোনো সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল ১৯৬১ সালে। সে সময় জন বেনেট নামের এক সেনাসদস্যকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। আর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীতে গুলিবর্ষণকারী দলের মাধ্যমে সর্বশেষ পরিচিত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল ১৯৪৫ সালে।
যদি নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়, তাহলে এটি হবে ৬৫ বছরেরও বেশি সময় পর যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীতে প্রথম মৃত্যুদণ্ড কার্যকর। একই সঙ্গে এটি কয়েক দশকের মধ্যে সামরিক মৃত্যুদণ্ড ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হবে। বর্তমানে সামরিক মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কয়েকজন বন্দীর মধ্যে হাসানও রয়েছেন।
তবে ট্রাম্পের অনুমোদন মানেই যে নির্ধারিত তারিখে অবশ্যই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে, তা নয়। হাসানের পক্ষ থেকে বেসামরিক আদালতে নতুন আইনি আবেদন করা হলে পুরো প্রক্রিয়া দীর্ঘ সময়ের জন্য স্থগিত হতে পারে। মার্কিন আইনি ব্যবস্থায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগেও বন্দির হাতে নির্দিষ্ট কিছু বিচারিক সুযোগ থাকে। ফলে ৩ ডিসেম্বরের পরিকল্পিত তারিখ থাকলেও শেষ পর্যন্ত ওই দিনই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে কি না, তা ভবিষ্যৎ আইনি পদক্ষেপের ওপর নির্ভর করতে পারে।
ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এসেছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। টেনেসিতে ক্রিস্টা পাইকের মৃত্যুদণ্ড প্রাণঘাতী ওষুধ প্রয়োগের মাধ্যমে কার্যকর করার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর দেশটির মৃত্যুদণ্ড ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে। ওই ঘটনার পর টেনেসির গভর্নর চলতি বছরের বাকি সময়ের মৃত্যুদণ্ড কার্যক্রম স্থগিত করে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। এর কয়েক দিনের মধ্যেই ট্রাম্পের পক্ষ থেকে হাসানের জন্য গুলিবর্ষণকারী দলের পদ্ধতি অনুমোদনের ঘটনা নতুন করে জাতীয় বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
মৃত্যুদণ্ডবিরোধী সংগঠনগুলো ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছে। তাদের বক্তব্য, রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার প্রবণতা মানবাধিকার ও বিচারব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। অন্যদিকে ফোর্ট হুড হামলায় নিহত ও আহতদের পরিবার এবং তাঁদের সমর্থকদের মধ্যে অনেকে দীর্ঘদিন ধরে হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অপেক্ষায় ছিলেন। ফলে এই সিদ্ধান্তকে কেউ দীর্ঘ প্রতীক্ষিত বিচার বাস্তবায়নের পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ এটিকে যুক্তরাষ্ট্রের মৃত্যুদণ্ড নীতির আরও কঠোর হওয়ার উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
“ট্রাম্পের অনুমোদনে সাবেক সেনা মেজর নিডাল হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়ে গেছে” এমন দাবি এখন সঠিক নয়। সঠিক তথ্য হলো, ট্রাম্প মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অনুমোদন দিয়েছেন; গুলিবর্ষণকারী দলের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিকল্পনা করা হয়েছে, আর নির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ৩ ডিসেম্বর তা কার্যকর হওয়ার কথা। তবে এর আগে আইনি প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন বা স্থগিতাদেশ আসার সুযোগ এখনো রয়েছে।