ট্রাম্পের বিতর্কিত ইরান মন্তব্যে ক্ষুব্ধ নিউজম, বললেন তিনি বিপজ্জনক ও উন্মাদ
ইরানের হামলায় লস অ্যাঞ্জেলেস ও সান ডিয়েগো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তা মেনে নেওয়ার বক্তব্যে তীব্র ক্ষোভ জানিয়েছেন গ্যাভিন নিউজম।
ট্রাম্পের বিতর্কিত ইরান মন্তব্যে ক্ষুব্ধ নিউজম, বললেন তিনি বিপজ্জনক ও উন্মাদ
মার্কিন রাজনীতিতে নতুন করে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ইরানসংক্রান্ত একটি মন্তব্যকে ঘিরে। নেব্রাস্কার গ্র্যান্ড আইল্যান্ডে ৫ অক্টোবরের এক নির্বাচনী সমাবেশে ট্রাম্প চলমান ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রসঙ্গ তুলতে গিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেস ও সান ডিয়েগোর সম্ভাব্য ধ্বংসকে খুব কম মূল্যে মেনে নেওয়ার মতো বক্তব্য দেন। তাঁর এই মন্তব্যের পর ক্যালিফোর্নিয়ার গভর্নর গ্যাভিন নিউজম তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ট্রাম্পকে ‘উন্মাদ ও বিপজ্জনক’ বলে আখ্যা দেন।
সমাবেশে ট্রাম্প মূলত ইরানের সঙ্গে চলমান সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব এবং যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির বিষয় নিয়ে কথা বলছিলেন। তিনি দাবি করেন, দেশের নিরাপত্তা ও বিশ্বের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য মূল্যবৃদ্ধি একটি ছোট মূল্য। এরপর তিনি বলেন, ইরান যদি একটি শহর ধ্বংস করে দেয়, তাহলে লস অ্যাঞ্জেলেস বা সান ডিয়েগোকে লক্ষ্য করলেও সেটিকে তিনি ছোট মূল্য হিসেবে দেখছেন। উপস্থিত সমর্থকদের একটি অংশ এ সময় উল্লাস প্রকাশ করে।
ট্রাম্পের এই বক্তব্যের পরপরই প্রতিক্রিয়া জানান নিউজম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ক্যালিফোর্নিয়ায় জাতীয় নিরাপত্তা বাহিনী ও সামুদ্রিক সেনা পাঠানোর পর এখন ট্রাম্প এমন কথা বলছেন যে বিদেশি শত্রুরা লস অ্যাঞ্জেলেস ও সান ডিয়েগোকে ধ্বংস করে দিতে পারে। এরপরই তিনি ট্রাম্পকে ‘উন্মাদ ও বিপজ্জনক’ বলে মন্তব্য করেন।
তবে বিষয়টির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ট্রাম্প সরাসরি কোনো গোয়েন্দা তথ্য প্রকাশ করেননি যে ইরান লস অ্যাঞ্জেলেস বা সান ডিয়েগোতে হামলার পরিকল্পনা করছে। তাঁর বক্তব্যের সময়ও এমন কোনো নির্দিষ্ট তথ্য দেওয়া হয়নি। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘ইরান শিগগিরই ক্যালিফোর্নিয়ায় হামলা করবে’ ধরনের দাবিগুলোকে এই বক্তব্যের ভিত্তিতে সত্য বলে ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসও জানিয়েছে, ট্রাম্পের মন্তব্য কোনো গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছিল কি না, তা স্পষ্ট নয় এবং ইরানের মূল ভূখণ্ড যুক্তরাষ্ট্রে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর সক্ষমতা নিয়েও যথেষ্ট প্রশ্ন রয়েছে।
বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের আলোচনায় ইরানের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ইরান তার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির ক্ষেত্রে প্রায় ১ হাজার ২৪০ মাইল পর্যন্ত পাল্লার সীমা বজায় রাখার কথা জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে ইরানের দূরত্ব এর চেয়ে অনেক বেশি। তবে ইরানের মহাকাশ কর্মসূচি ভবিষ্যতে দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির উন্নয়নে সহায়ক হতে পারে বলে দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন কর্মকর্তারা আশঙ্কা প্রকাশ করে আসছেন।
এর আগে ক্যালিফোর্নিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোকে ইরান-সংক্রান্ত সংঘাতের প্রেক্ষাপটে সম্ভাব্য আকস্মিক আকাশপথের হামলা নিয়ে সতর্ক করা হয়েছিল। তবে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তখন এমন কোনো বিশ্বাসযোগ্য গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া যায়নি যার ভিত্তিতে ক্যালিফোর্নিয়ায় আসন্ন হামলার আশঙ্কাকে নিশ্চিত বলা যায়। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতেও সতর্কতা এবং নিশ্চিত হামলার আশঙ্কার মধ্যে পার্থক্য রাখা জরুরি।
ট্রাম্পের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ক্যালিফোর্নিয়ার স্থানীয় নেতারাও। লস অ্যাঞ্জেলেসের মেয়র কারেন বাস বলেন, একজন প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব দেশের মানুষকে রক্ষা করা, তাদের জীবনের জন্য হুমকি তৈরি করা বা হামলাকে উৎসাহিত করা নয়। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ট্রাম্পের মন্তব্য নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক।
সান ডিয়েগোর মেয়র টড গ্লোরিয়াও ট্রাম্পের মন্তব্য প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, সান ডিয়েগো কোনো ‘পার্শ্বক্ষতি’ নয় এবং শহরের মানুষকে কখনোই সামান্য মূল্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। তিনি প্রেসিডেন্টকে শহরটিকে যুদ্ধসংক্রান্ত বক্তব্যের বাইরে রাখার আহ্বান জানান।
লস অ্যাঞ্জেলেস ও সান ডিয়েগো দুটিই ক্যালিফোর্নিয়ার গুরুত্বপূর্ণ নগরী। লস অ্যাঞ্জেলেস যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম বৃহৎ শহর এবং সেখানে মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। অন্যদিকে সান ডিয়েগো অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী ও সামুদ্রিক সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে। ফলে কোনো ধরনের হামলা হলে তার মানবিক ও কৌশলগত প্রভাব অত্যন্ত বড় হতে পারে।
ট্রাম্প একই বক্তব্যে বলেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাত খুব দ্রুত শেষ হতে পারে, যদিও তিনি স্বীকার করেন যে পরিস্থিতি আরও কিছু সময় দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তিনি ইরানের দীর্ঘমেয়াদি চাপ সহ্য করার ক্ষমতা নিয়েও মন্তব্য করেন এবং শেষ পর্যন্ত সংঘাত কোনো না কোনোভাবে শেষ হবে বলে দাবি করেন।
এদিকে ট্রাম্পের বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনা আরও তীব্র। জ্বালানি সরবরাহ, তেলের মূল্য এবং হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগও বাড়ছে। সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরেও রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে।
‘নিউজম ট্রাম্পের মন্তব্যকে উন্মাদ ও বিপজ্জনক বলেছেন’ এই দাবিটি সত্য এবং একাধিক নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমে তা নিশ্চিত হয়েছে। একইভাবে ট্রাম্প লস অ্যাঞ্জেলেস ও সান ডিয়েগোকে ইরানের সম্ভাব্য হামলার প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন এটিও সত্য। তবে এর অর্থ এই নয় যে ইরান ওই দুই শহরে হামলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কিংবা তাদের হাতে এমন হামলার নিশ্চিত সক্ষমতা রয়েছে। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অতিরঞ্জিত বা আতঙ্কসৃষ্টিকারী ব্যাখ্যা থেকে আলাদা রেখে মূল বক্তব্যটিই তুলে ধরা উচিত।