পাকিস্তানের সঙ্গে ঢাকার নতুন সমীকরণ, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কোন পথে?
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
পাকিস্তানের সঙ্গে ঢাকার নতুন সমীকরণ, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কোন পথে?
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ার কূটনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাইডলাইনে অনুষ্ঠিত বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, পারস্পরিক স্বার্থ এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকটি এমন এক সময়ে হলো, যখন ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কও নতুন করে পুনর্বিন্যাসের পর্যায়ে রয়েছে। ভারত এরই মধ্যে তারেক রহমানকে দ্বিপাক্ষিক সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে এবং দুই দেশের মধ্যে সম্ভাব্য সফরের সময় নিয়েও আলোচনা চলছে। ফলে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তারেক রহমানের এই বৈঠককে শুধু ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্কের ঘটনা হিসেবে না দেখে বৃহত্তর দক্ষিণ এশীয় কূটনীতির প্রেক্ষাপটেও দেখা হচ্ছে।
পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক, বার্তা যাচ্ছে দিল্লিতেও?
জাতিসংঘের মতো বহুপাক্ষিক কূটনীতির গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি বৈঠক নিঃসন্দেহে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এই বৈঠককে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ পাকিস্তানের দিকে স্থায়ীভাবে ঝুঁকে যাচ্ছে বা ভারত থেকে দূরে সরে যাচ্ছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার মতো প্রকাশ্য তথ্য এখনো নেই।
বরং সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে দেখা যাচ্ছে, ঢাকা একদিকে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা করছে, অন্যদিকে ভারতের সঙ্গেও নতুন করে যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্প্রতি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে ‘ইতিবাচক, গঠনমূলক ও ভবিষ্যতমুখী’ করার আগ্রহের কথা জানিয়েছে। একই সময়ে তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের জন্য নভেম্বরের সময় নিয়ে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে আলোচনা চলছে বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে।
অর্থাৎ, পাকিস্তানের সঙ্গে বৈঠককে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিকল্প হিসেবে দেখার চেয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে একাধিক দেশের সঙ্গে সমান্তরাল যোগাযোগের অংশ হিসেবেও দেখা যেতে পারে।
ভারতের সঙ্গে কি নতুন অধ্যায় শুরু হবে?
এখন বড় প্রশ্ন, পাকিস্তানের সঙ্গে তারেক-শাহবাজ বৈঠকের পর দিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক কোন দিকে যায়।এখন পর্যন্ত তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির কোনো আনুষ্ঠানিক দ্বিপাক্ষিক বৈঠক হয়নি। তবে ভারতীয় পক্ষের পক্ষ থেকে তারেক রহমানকে দ্বিপাক্ষিক সফরের আমন্ত্রণের কথা প্রকাশ্যে জানানো হয়েছে। সম্ভাব্য সফরের তারিখ নিয়েও আলোচনা চলছে।
ফলে নিউইয়র্কে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকের পর ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য বৈঠক আরও গুরুত্ব পেতে পারে। বিশেষ করে বাণিজ্য, সীমান্ত, পানি, নিরাপত্তা, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ঘিরে দুই দেশের মতপার্থক্যের মতো বিষয়গুলো ভবিষ্যৎ আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।তবে এসব বিষয়ে কোনো নতুন সমঝোতা হয়েছে—এমন তথ্য এখনো প্রকাশ্যে আসেনি।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রভাব কতটা?
এই বৈঠকের আরেকটি সম্ভাব্য আলোচনার জায়গা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি। বিশেষ করে বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার এবং প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্ক ভবিষ্যতে কোন পথে যাবে, সেটিও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের কারণে জামায়াতে ইসলামী সরকারকে সহযোগিতা করবে বা করবে না—এমন সরাসরি সম্পর্কের কোনো প্রমাণ এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।বরং বর্তমান বাস্তবতায় জামায়াতে ইসলামী জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে সরকারের বিভিন্ন নীতি ও সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছে। দলটির আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান অবশ্য সংসদে দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা পালনের কথা বলেছেন এবং জাতীয় স্বার্থে সরকারকে সহযোগিতার কথাও জানিয়েছেন।
এর আগে তিনি সরকারকে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বিশেষজ্ঞ সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাবের কথাও জানিয়েছিলেন এবং বলেছিলেন, জামায়াত বিরোধিতা করার জন্য বিরোধিতা করতে চায় না, আবার অন্ধভাবে সরকারকেও সমর্থন করবে না।
অন্যদিকে, জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় বিরোধী জোট সাম্প্রতিক সময়ে সরকারবিরোধী বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করেছে। আগস্টে সাংবিধানিক সংস্কার ও অন্যান্য ইস্যুতে বিরোধী দলের সংসদ থেকে ওয়াকআউটের ঘটনাও ঘটেছে।
অর্থাৎ, বর্তমান অবস্থানটি একেবারে ‘সহযোগিতা’ কিংবা ‘বিরোধিতা’—কোনো একটি শব্দে সীমাবদ্ধ নয়। জাতীয় স্বার্থের কিছু বিষয়ে সহযোগিতার বার্তা থাকলেও রাজনৈতিক ও নীতিগত বিভিন্ন প্রশ্নে সরকার ও জামায়াতের মধ্যে বিরোধও স্পষ্ট।
সামনে কোন সমীকরণ?
তারেক রহমান-শাহবাজ শরীফের বৈঠকের পর বাংলাদেশের সামনে মূলত তিনটি কূটনৈতিক প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।প্রথমত, পাকিস্তানের সঙ্গে বাণিজ্য, যোগাযোগ, প্রতিরক্ষা নয় বরং অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে সম্পর্ক কতটা এগোয়।
দ্বিতীয়ত, ভারতের সঙ্গে তারেক রহমান সরকারের প্রত্যাশিত নতুন সম্পর্ক কত দ্রুত বাস্তব রূপ পায়। বিশেষ করে সম্ভাব্য দিল্লি সফর হলে সেখানে কোন কোন দ্বিপাক্ষিক ইস্যু আলোচনায় আসে, সেটিই হবে গুরুত্বপূর্ণ। ভারত ইতিমধ্যে ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ককে ভবিষ্যতমুখী করার আগ্রহের কথা জানিয়েছে।
তৃতীয়ত, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সরকার ও বিরোধী দলের সম্পর্ক কোন পথে যায়। জামায়াতে ইসলামী যদি জাতীয় ইস্যুতে সরকারকে সহযোগিতার নীতি অনুসরণ করে, তাহলে সংসদীয় রাজনীতিতে তার প্রতিফলন দেখা যেতে পারে। আবার নীতিগত মতবিরোধ ও জনস্বার্থের প্রশ্নে বিরোধী কর্মসূচিও অব্যাহত থাকতে পারে। বর্তমান বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডে দুই ধরনের অবস্থানেরই নজির রয়েছে।
নিউইয়র্কে তারেক রহমান ও শাহবাজ শরীফের বৈঠক তাই শুধু দুই প্রধানমন্ত্রীর একটি দ্বিপাক্ষিক বৈঠক নয়, বরং বাংলাদেশের পরিবর্তিত পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে আলোচনায় এসেছে। তবে এই একটি বৈঠক থেকেই বাংলাদেশ পাকিস্তানের দিকে স্থায়ীভাবে ঝুঁকছে কিংবা ভারত থেকে দূরে সরে যাচ্ছে—এমন সিদ্ধান্ত এখনই টানা ঠিক হবে না।
আগামী দিনে ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্ক কতটা এগোয়, তারেক রহমানের দিল্লি সফর কবে হয় এবং সেখানে কী আলোচনা হয়, আর দেশের ভেতরে সরকার ও জামায়াতের সম্পর্ক কোন পথে যায়—এই তিনটি বিষয়ই বাংলাদেশের পরবর্তী রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমীকরণ বোঝার ক্ষেত্রে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।