ব্রঙ্কসে ভুল গ্রেপ্তারে আইসিইর মিথ্যা সাক্ষ্য, নথি জাল: ট্রাম্পের নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারকের রায়
ব্রঙ্কসে ভুল পরিচয়ে দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় মিথ্যা সাক্ষ্য ও নথি জালের অভিযোগে অভিবাসন কর্মকর্তাদের তীব্র ভর্ৎসনা করেছেন ফেডারেল বিচারক।
ব্রঙ্কসে ভুল গ্রেপ্তারে আইসিইর মিথ্যা সাক্ষ্য, নথি জাল: ট্রাম্পের নিয়োগপ্রাপ্ত বিচারকের রায়
ব্রঙ্কসে ভুল পরিচয়ের ভিত্তিতে দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগ সংস্থার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন ফেডারেল বিচারক গ্যারি আর ব্রাউন। ৫ অক্টোবর দেওয়া ২৮ পৃষ্ঠার এক রায়ে তিনি বলেন, কর্মকর্তাদের দেওয়া বক্তব্যে অসঙ্গতি ছিল, সরকারি নথিতে মিথ্যা তথ্য দেওয়া হয়েছিল এবং একজন মার্কিন নাগরিককে গ্রেপ্তারের ঘটনায় গুরুতর আঘাতও লেগেছে। ঘটনাটি ঘটে চলতি বছরের ৬ মে নিউইয়র্কের ব্রঙ্কসের নরউড এলাকায়।
বিচারক ব্রাউন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মনোনীত বিচারক। তিনি ২০১৯ সালে নিউইয়র্কের পূর্বাঞ্চলীয় ফেডারেল আদালতে নিয়োগ পান। এই মামলায় তিনি ডমিনিকান প্রজাতন্ত্রের নাগরিক অ্যাঞ্জেল জেসুস আলমন্তের আটক চ্যালেঞ্জ করে করা আবেদন পর্যালোচনা করেন। শুনানির সময় অভিবাসন কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য, সরকারি নথি, গ্রেপ্তারের বিবরণ এবং ঘটনাস্থলের ভিডিওসহ বিভিন্ন তথ্য পর্যালোচনা করা হয়।
ঘটনার শুরুতে অভিবাসন কর্মকর্তারা দুজন ব্যক্তিকে খুঁজছিলেন, যাদের বিরুদ্ধে দেশত্যাগের আদেশ কার্যকর না করার অভিযোগ ছিল। কর্মকর্তাদের দাবি ছিল, অভিযান চলাকালে আলমন্তেকে তাদের কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিদের একজনের সঙ্গে ভুল করে মিলিয়ে ফেলা হয়। কিন্তু আদালতে উপস্থাপিত নথি ও ছবিতে দেখা যায়, আলমন্তের সঙ্গে ওই ব্যক্তির শারীরিক গঠনে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য ছিল। আলমন্তের উচ্চতা ছিল প্রায় ছয় ফুট এবং ওজন প্রায় ১৮০ পাউন্ড। অথচ যাকে গ্রেপ্তার করার কথা ছিল, তার উচ্চতা ছিল প্রায় পাঁচ ফুট সাত ইঞ্চি এবং ওজন প্রায় ১১০ পাউন্ড।
বিচারকের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া একজন কর্মকর্তা আদালতে স্বীকার করেন যে ছবি পাশাপাশি রাখলে দুজনকে আলাদা ব্যক্তি হিসেবে চেনা খুবই সহজ। এ কারণে শুধু চেহারা বা শারীরিক মিলের ভিত্তিতে আলমন্তেকে লক্ষ্য ব্যক্তি মনে করার সরকারি ব্যাখ্যাকে বিচারক গ্রহণ করেননি। বরং তিনি বলেছেন, ভুল পরিচয়ের ব্যাখ্যাটি ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে এবং গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়াটিও আইনগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ ছিল।
বিষয়টি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে আলমন্তেকে আটকের পর তৈরি করা সরকারি নথি নিয়ে। বিচারকের মতে, প্রথম দিকে কর্মকর্তারা সরকারি বিভিন্ন তথ্যভান্ডারে আলমন্তের বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে পাননি। পরে তাকে আটক করার পর তার তথ্য ব্যবস্থায় প্রবেশ করানো হয়। এরপর তৈরি করা প্রশাসনিক গ্রেপ্তারি পরোয়ানায় দাবি করা হয়েছিল, আগের অনুসন্ধানেই তার পরিচয় ও অভিবাসন অবস্থার বিষয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য পাওয়া গিয়েছিল এবং জীববৈজ্ঞানিক পরিচয় যাচাইয়ের মাধ্যমে তার পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছিল। বিচারক এসব দাবিকে মিথ্যা বলে উল্লেখ করেন এবং নথিটিকে জালিয়াতিপূর্ণ হিসেবে বর্ণনা করেন।
এখানেই শেষ নয়। আদালতে কয়েকজন কর্মকর্তা দাবি করেন, গ্রেপ্তারের আগে তারা আলমন্তেকে মাদক কেনাবেচার মতো একাধিক লেনদেনে জড়িত থাকতে দেখেছেন। একজন কর্মকর্তা প্রায় আট থেকে দশটি দ্রুত হাতবদল হওয়ার ঘটনা দেখেছেন বলে জানান। আরেকজন দাবি করেন, দূর থেকে প্যাকেট ও অর্থের লেনদেন দেখেছেন। কিন্তু আলমন্তের কাছ থেকে কোনো মাদক, নগদ অর্থ বা মাদকসংক্রান্ত সরঞ্জাম পাওয়া যায়নি। এমনকি গ্রেপ্তারের সরকারি প্রতিবেদনে কথিত এসব লেনদেনের উল্লেখও ছিল না।
বিচারক ব্রাউন এসব বক্তব্যকে অত্যন্ত সন্দেহজনক বলে মনে করেন। তার মতে, কর্মকর্তাদের বক্তব্যের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি ছিল এবং সেগুলো সমন্বিতভাবে তৈরি করা বক্তব্যের বৈশিষ্ট্য বহন করছিল। তিনি এমনকি কিছু সাক্ষ্যকে সম্ভাব্য মিথ্যা শপথভিত্তিক সাক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতা ও প্রশিক্ষণের ঘাটতিও এই ঘটনার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
আলমন্তের গ্রেপ্তারের কয়েক মিনিট পর একই এলাকায় আরেক ব্যক্তিকে আটক করে ওই দল। তিনি ছিলেন ১৯ বছর বয়সী জিউরি কনসেপসিওন, জন্মসূত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। আদালতের নথি ও ভিডিও অনুযায়ী, কর্মকর্তারা তাকেও অভিযানের কাঙ্ক্ষিত অন্য ব্যক্তির সঙ্গে ভুল করে মিলিয়ে ফেলেছিলেন। ঘটনাস্থলের ভিডিওতে দেখা যায়, মুখ ঢাকা এক কর্মকর্তা অস্ত্র হাতে কনসেপসিওনের দিকে এগিয়ে যান। পরে কয়েকজন কর্মকর্তা তাকে মাটিতে ফেলে হাতকড়া পরান।
কনসেপসিওনের মাথায় আঘাত লাগে এবং চিকিৎসার জন্য সেলাই প্রয়োজন হয়। ঘটনার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হলেও পরিবারের সদস্যরা জানান, তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় বাড়ি থেকে দূরের একটি স্থানে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সে সময় তার পরিবার বিষয়টি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। স্থানীয়ভাবে ধারণ করা ভিডিও প্রকাশের পর ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনায় আসে এবং ব্রঙ্কসের কংগ্রেস সদস্য রিচি টরেস সরকারি তদন্তের দাবি জানান।
প্রাথমিক পর্যায়ে মার্কিন স্বরাষ্ট্র নিরাপত্তা বিভাগ অবশ্য ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছিল। তাদের বক্তব্য ছিল, কনসেপসিওনকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তার করা হয়নি; তিনি অভিযানের লক্ষ্য ব্যক্তির সঙ্গে শারীরিকভাবে মিলে যাওয়ায় সাময়িকভাবে আটক হন এবং পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কর্মকর্তারা আরও দাবি করেছিলেন, তিনি পরিচয় জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত লোকজনের কারণে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল।
তবে পরবর্তী আদালতীয় পর্যালোচনায় বিচারক ব্রাউন ঘটনাটিকে অত্যন্ত সহিংস এবং আইনগতভাবে অবৈধ হিসেবে বর্ণনা করেন। বিশেষ করে একজন মার্কিন নাগরিক আহত হওয়ার বিষয়টিকে তিনি গুরুতর উদ্বেগের কারণ হিসেবে দেখেছেন। তার রায়ে বলা হয়েছে, ভুল পরিচয়ের দাবি, গ্রেপ্তারের প্রক্রিয়াগত ত্রুটি এবং সরকারি নথিতে অসত্য তথ্য সবকিছু মিলিয়ে ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ ভুলের পর্যায়ে পড়ে না।
আলমন্তে প্রায় দুই মাস আটক থাকার পর বিচারকের হস্তক্ষেপে মুক্তির সুযোগ পান এবং তার অভিবাসনসংক্রান্ত মামলা এখনো চলমান। বিচারক সরকারকে ২১ দিনের মধ্যে জানাতে বলেছেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা ঠেকাতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা, বিষয়টি অন্য কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো কিংবা আদালত অবমাননার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না, সেটিও পরবর্তী পর্যায়ে বিবেচনা করা হতে পারে।
এই রায়ের গুরুত্ব আরও বেড়েছে কারণ সাম্প্রতিক সময়ে নিউইয়র্কসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন এলাকায় অভিবাসন অভিযান নিয়ে আদালতে একের পর এক প্রশ্ন উঠছে। এর আগে নিউইয়র্কের আরেক ফেডারেল মামলায় সরকারি আইনজীবীরা স্বীকার করেছিলেন যে অভিবাসন আদালতে গ্রেপ্তারের বৈধতা প্রতিষ্ঠায় তারা একটি সংস্থার নির্দেশনার প্রয়োগক্ষেত্র সম্পর্কে ভুল তথ্য আদালতকে দিয়েছিলেন। সেই ঘটনায় বিচারক সংশ্লিষ্ট নথি সংরক্ষণের নির্দেশও দেন।
ফলে ব্রঙ্কসের ঘটনাটি এখন শুধু ভুল পরিচয়ে গ্রেপ্তারের একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে নয়, বরং অভিবাসন আইন প্রয়োগের পদ্ধতি, কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ, সরকারি নথির নির্ভুলতা এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার প্রশ্নে বড় ধরনের আইনি বিতর্কের অংশ হয়ে উঠেছে। বিচারকের সর্বশেষ রায় সরাসরি কোনো ফৌজদারি দণ্ড ঘোষণা করেনি; বরং আদালত যে গুরুতর অনিয়ম পেয়েছে, তার ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার পথ খুলে দিয়েছে। তাই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত শাস্তি হয়েছে এমন দাবি এখনই করা সঠিক হবে না। তবে আদালতের রায়ে মিথ্যা সাক্ষ্য ও সরকারি নথি বিকৃতির বিষয়ে যে কঠোর পর্যবেক্ষণ এসেছে, তা নিঃসন্দেহে মার্কিন অভিবাসন প্রয়োগ ব্যবস্থার জন্য বড় ধাক্কা।