রাশিয়ার বিরুদ্ধে এক হাজার ছয়শ পঞ্চাশ নতুন নিষেধাজ্ঞা আনছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন

ক্ষেপণাস্ত্র ও সামরিক শিল্পকে লক্ষ্য করে রাশিয়ার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় নিষেধাজ্ঞা তালিকা অনুমোদনের পথে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে এক হাজার ছয়শ পঞ্চাশ নতুন নিষেধাজ্ঞা আনছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন

রাশিয়ার বিরুদ্ধে এক হাজার ছয়শ পঞ্চাশ নতুন নিষেধাজ্ঞা আনছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন


ইউক্রেন যুদ্ধকে কেন্দ্র করে রাশিয়ার ওপর চাপ আরও বাড়ানোর প্রস্তুতি নিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। ইউরোপীয় কূটনীতিকদের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক হাজার ছয়শ পঞ্চাশ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নতুন নিষেধাজ্ঞা তালিকা অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অনুমোদিত হলে এটি ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার ইউক্রেন অভিযান শুরুর পর এক দফায় সবচেয়ে বড় নিষেধাজ্ঞা সম্প্রসারণ হবে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ‘এক হাজার ছয়শ পঞ্চাশটি নিষেধাজ্ঞা ইতিমধ্যে কার্যকর হয়ে গেছে’ এমন বক্তব্য পুরোপুরি সঠিক নয়। ৬ অক্টোবর পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তখন এটি অনুমোদনের পর্যায়ে ছিল। 

প্রস্তাবিত তালিকার প্রায় এক হাজার পাঁচশ সত্তরটি নাম রাশিয়ার সামরিক ও অস্ত্র উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের। এসবের অর্ধেকেরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ও সংশ্লিষ্ট সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে ইউরোপীয় কূটনীতিকরা জানিয়েছেন। ফলে নতুন পদক্ষেপের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে রাশিয়ার যুদ্ধ সক্ষমতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ সামরিক শিল্প। 

নতুন তালিকার আওতায় থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রচলিত নিষেধাজ্ঞার মধ্যে থাকতে পারে ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা, সম্পদ জব্দ এবং আর্থিক লেনদেনে বাধা। ইউরোপীয় কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, রাশিয়াসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞায় থাকা ব্যক্তিদের ইউরোপীয় ইউনিয়নের ব্যাংকে থাকা সম্পদ জব্দ করা যায় এবং তাদের সঙ্গে অর্থ বা সম্পদ সরবরাহ নিষিদ্ধ করা হয়। প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের আর্থিক বিধিনিষেধ কার্যকর হয়। 

এই নতুন উদ্যোগের পরিধি বুঝতে হলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আগের নিষেধাজ্ঞাগুলোর দিকে তাকাতে হয়। চলতি বছরের ২৩ জুলাই ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার বিরুদ্ধে ২১তম বড় নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজ অনুমোদন করেছিল। সেই দফায় ৪৮ ব্যক্তি ও ১৭০ প্রতিষ্ঠানসহ মোট ২১৮টি তালিকাভুক্তি করা হয়েছিল। পাশাপাশি রাশিয়ার ছায়া নৌবহরের আরও ৪১টি জাহাজকে নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হয় এবং ব্যাংক, জ্বালানি, ক্রিপ্টো সম্পদ ও সামরিক শিল্পে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। 

তুলনাটি গুরুত্বপূর্ণ। জুলাইয়ের ২১তম দফায় ২১৮টি তালিকাভুক্তি ছিল, আর নতুন প্রস্তাবিত তালিকায় প্রায় এক হাজার ছয়শ পঞ্চাশটি নাম রয়েছে। অর্থাৎ শুধু তালিকাভুক্তির সংখ্যার দিক থেকেই নতুন উদ্যোগটি আগের বড় দফাগুলোর তুলনায় অনেক বিস্তৃত। তবে এক হাজার ছয়শ পঞ্চাশ সংখ্যাটির সবগুলো যে একই রাশিয়া নিষেধাজ্ঞা কাঠামোর আওতায় থাকবে, তা নয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু তালিকাভুক্তি রাশিয়াসংক্রান্ত হলেও অন্য নিষেধাজ্ঞা কাঠামোর অধীনে পড়বে, যার মধ্যে উত্তর কোরিয়াসংক্রান্ত ব্যবস্থাও রয়েছে। 

ইউরোপীয় ইউনিয়নের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের পর রাশিয়ার অর্থনীতি ও যুদ্ধযন্ত্রকে লক্ষ্য করে ধারাবাহিকভাবে নিষেধাজ্ঞা বাড়ানো হয়েছে। এর আগে ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে ২০তম দফায় ১২০ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নতুন তালিকাভুক্তি করা হয়েছিল। ওই দফায় রাশিয়ার জ্বালানি আয়, সামরিক শিল্প, বাণিজ্য, আর্থিক খাত এবং ক্রিপ্টো সম্পদ ব্যবস্থাকে লক্ষ্য করা হয়েছিল। 

জুলাইয়ের ২১তম দফাতেও রাশিয়ার সামরিক শিল্পকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। ইউরোপীয় ইউনিয়ন দীর্ঘপাল্লার চালকবিহীন বিমান তৈরির সঙ্গে যুক্ত ৩৭টি তালিকাভুক্তিসহ সামরিক শিল্পের মোট ৫৬টি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে লক্ষ্য করে ব্যবস্থা নেয়। পাশাপাশি তৃতীয় দেশগুলোর মাধ্যমে রাশিয়ার ওপর আরোপিত রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার অভিযোগে আরও ৫১টি প্রতিষ্ঠানকে কঠোর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের আওতায় আনা হয়। 

নতুন দফায় ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনকে বিশেষভাবে লক্ষ্য করার বিষয়টি তাই আগের নীতিরই সম্প্রসারণ বলে মনে হচ্ছে। রাশিয়া ইউক্রেনের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষেপণাস্ত্র ও চালকবিহীন আকাশযান ব্যবহার করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান হলো, এসব অস্ত্রের উৎপাদনে প্রয়োজনীয় অর্থ, প্রযুক্তি, উপাদান ও সরবরাহব্যবস্থায় বাধা সৃষ্টি করা গেলে রাশিয়ার যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতার ওপর চাপ বাড়ানো সম্ভব হবে।

তবে নিষেধাজ্ঞার সংখ্যা বাড়লেই তাৎক্ষণিকভাবে রাশিয়ার সামরিক সক্ষমতা ভেঙে পড়বে এমন দাবি করার সুযোগ নেই। নিষেধাজ্ঞার কার্যকারিতা নির্ভর করবে সেগুলো কতটা কঠোরভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, তৃতীয় দেশের মাধ্যমে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ কতটা বন্ধ করা যাচ্ছে এবং রাশিয়ার বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা কতটা কার্যকর থাকছে তার ওপর। ইউরোপীয় ইউনিয়ন এরই মধ্যে রাশিয়ার নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে চলার সঙ্গে যুক্ত তৃতীয় দেশের প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বিভিন্ন দফায় লক্ষ্য করেছে। 

বর্তমানে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান রাশিয়াসংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা কাঠামোয় তিন হাজারের কিছু বেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত রয়েছে বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নতুন প্রায় এক হাজার ছয়শ পঞ্চাশটি তালিকাভুক্তি যুক্ত হলে নিষেধাজ্ঞার আওতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। 

‘ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার বিরুদ্ধে এক হাজার ছয়শ পঞ্চাশ নতুন নিষেধাজ্ঞা অনুমোদন করছে’ এই দাবিকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সত্য বলা যায়। কিন্তু সংবাদটি প্রকাশের সময় পর্যন্ত সবচেয়ে নির্ভুল ভাষা হলো, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতরা প্রায় এক হাজার ছয়শ পঞ্চাশটি নতুন নিষেধাজ্ঞা অনুমোদনের পথে বা অনুমোদনের জন্য বিবেচনা করছেন। চূড়ান্ত আইনি অনুমোদনের জন্য ১২ অক্টোবর ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সিদ্ধান্ত প্রয়োজন। তাই ‘ইতিমধ্যে সব নিষেধাজ্ঞা কার্যকর’ বলা বিভ্রান্তিকর হবে। 


সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর