রাশিয়াকে ফাঁসানোর মহামারি ষড়যন্ত্রের দাবি প্রমাণ মেলেনি সত্যতা যাচাইয়ে যা জানা গেল
সাইবেরিয়ায় গবেষণাগারকর্মীর মৃত্যু ঘিরে আতঙ্ক বাড়লেও রাশিয়াকে জৈব অস্ত্র দিয়ে ফাঁসানোর দাবি বা নতুন মহামারির পরিকল্পনার কোনো প্রমাণ মেলেনি এখনও।
রাশিয়াকে ফাঁসানোর মহামারি ষড়যন্ত্রের দাবি প্রমাণ মেলেনি সত্যতা যাচাইয়ে যা জানা গেল
সাইবেরিয়ায় একটি রোগ গবেষণাগারের কর্মীর রহস্যজনক মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নতুন মহামারি ও জৈব অস্ত্র ব্যবহারের নানা দাবি ছড়িয়ে পড়েছে। এরই মধ্যে মার্কিন ষড়যন্ত্রতত্ত্ব প্রচারক অ্যালেক্স জোন্স দাবি করেছেন, গোপন শক্তির লোকজন রাশিয়াকে দায়ী করার জন্য পরিকল্পিতভাবে একটি নতুন মহামারির পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে এবং এর মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে তৈরি জীবাণু ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে। তবে এই দাবির পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং বর্তমান তথ্য বলছে, সাইবেরিয়ায় একজন গবেষণাগারকর্মীর মৃত্যু সত্য হলেও তার মৃত্যুর সঙ্গে মহামারি, জৈব অস্ত্র, ইচ্ছাকৃত জীবাণু ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা রাশিয়াকে ফাঁসানোর কোনো পরিকল্পনার যোগসূত্র নিশ্চিত হয়নি।
ঘটনার সূত্রপাত রাশিয়ার ইরকুতস্ক অঞ্চলে। সেখানে মহামারি প্রতিরোধ ও বিপজ্জনক সংক্রামক রোগ নিয়ে গবেষণা করা একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ২৮ বছর বয়সী দারিয়া শিপিলোভা অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ২ অক্টোবর মারা যান। রুশ স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তার মৃত্যুর কারণ ছিল অজ্ঞাত উৎসের নিউমোনিয়া। তার মৃত্যুর পর সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তার সংস্পর্শে আসা প্রায় দুই শত ব্যক্তিকে চিকিৎসা পর্যবেক্ষণে রাখা হয়। কয়েকটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও সতর্কতামূলক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
ঘটনাটি দ্রুত আলোচনায় আসে কারণ মৃত নারী এমন একটি প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন, যেখানে প্লেগসহ বিভিন্ন বিপজ্জনক জীবাণু নিয়ে গবেষণা করা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এরপর দাবি ছড়িয়ে পড়ে যে তিনি নাকি গবেষণাগারে প্লেগের জীবাণু বহনকারী একটি পাত্র ভেঙে ফেলেছিলেন এবং সেখান থেকেই সংক্রমিত হয়েছিলেন। কিন্তু এই দাবির পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। রুশ স্বাস্থ্য নজরদারি সংস্থা জানিয়েছে, বিস্তৃত পরীক্ষায় তার কর্মস্থলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো বিপজ্জনক জীবাণুর প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই অ্যালেক্স জোন্স তার প্রচারে প্রশ্ন তোলেন, ঘটনাটি রাশিয়াকে দায়ী করে কোনো বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ কি না। তার বক্তব্যে সম্ভাব্য জীবাণু হামলা, সাজানো ঘটনা এবং রাশিয়াকে দায়ী করার মতো বিভিন্ন অনুমানের কথা উঠে এসেছে। তিনি নিজেও আলোচনার সময় একাধিক সম্ভাবনা তুলে ধরে নিশ্চিত প্রমাণের বদলে নিজের সন্দেহ ও অনুমানের কথা বলেছেন। তার ছয় অক্টোবরের প্রচারে রাশিয়াকে জৈব অস্ত্রের ঘটনার জন্য ফাঁসানোর সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হয়।
কিন্তু তথ্য যাচাই করে দেখা যাচ্ছে, অ্যালেক্স জোন্সের এই বক্তব্যকে প্রতিষ্ঠিত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করার মতো কোনো প্রমাণ নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকেও ইরকুতস্কে নিশ্চিত প্লেগ রোগীর সন্ধান পাওয়ার কথা বলা হয়নি। সংস্থাটি রুশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং বৃহত্তর অঞ্চলের ঝুঁকি অত্যন্ত কম বলে জানিয়েছে। সংস্থার মুখপাত্র ক্রিশ্চিয়ান লিন্ডমায়ার স্পষ্ট করেছেন, বর্তমান পরিস্থিতিকে নতুন মহামারির মতো কোনো ঘটনার সঙ্গে তুলনা করার কারণ নেই।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, মৃত গবেষণাগারকর্মীর সংস্পর্শে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে এখন পর্যন্ত প্লেগের জীবাণুর উপস্থিতি নিশ্চিত হয়নি। প্রায় দুই শত ব্যক্তিকে সতর্কতামূলকভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা হলেও তাদের মধ্যে নিশ্চিত প্লেগ সংক্রমণের খবর পাওয়া যায়নি। পরে পর্যবেক্ষণে থাকা অনেক ব্যক্তিকেই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ব্যাপক সংক্রমণ বা নতুন মহামারির দাবির সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল পাওয়া যাচ্ছে না।
রুশ কর্তৃপক্ষ অবশ্য তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছ হওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও মস্কোর প্রতি দ্রুত ও বিস্তারিত তথ্য প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছেন। মার্কিন প্রশাসনও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে এমন কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি যে রাশিয়ায় জৈব অস্ত্র ছড়িয়ে পড়েছে কিংবা কোনো পক্ষ পরিকল্পিতভাবে নতুন মহামারি শুরু করেছে।
অন্যদিকে রুশ স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অতিরঞ্জিত তথ্যের বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে। বিশেষ করে এমন একটি নথি ছড়িয়ে পড়েছিল, যাতে ইরকুতস্ক অঞ্চলে কঠোর বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওই নথি সরকারি নয় এবং এর তথ্য সত্য নয়। একই সঙ্গে তারা জানিয়েছে, অঞ্চলের সামগ্রিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে।
প্লেগ নিজেই অবশ্য বাস্তব ও গুরুতর একটি সংক্রামক রোগ। সাইবেরিয়ার কিছু এলাকায় এর জীবাণু প্রাকৃতিকভাবে বন্য প্রাণী ও তাদের শরীরে থাকা পরজীবীর মধ্যে থাকতে পারে। ফুসফুসে আক্রান্ত হওয়ার ধরনটি দ্রুত গুরুতর হতে পারে এবং চিকিৎসা না হলে প্রাণঘাতী হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। তবে দ্রুত শনাক্ত করা গেলে উপযুক্ত জীবাণুনাশক ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা সম্ভব। বর্তমান ঘটনায় এখন পর্যন্ত ব্যাপক মানব সংক্রমণের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ফলে যাচাই করা তথ্যের ভিত্তিতে অ্যালেক্স জোন্সের বক্তব্যকে সত্য ঘটনা হিসেবে প্রচার করা ঠিক হবে না। এখানে একটি বাস্তব ঘটনা রয়েছে একজন গবেষণাগারকর্মীর অজ্ঞাত কারণে নিউমোনিয়ায় মৃত্যু এবং তার সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের সতর্কতামূলক পর্যবেক্ষণ। কিন্তু এর সঙ্গে পরিকল্পিত জৈব অস্ত্র হামলা, নতুন মহামারি সৃষ্টি, কিংবা রাশিয়াকে ইচ্ছাকৃতভাবে ফাঁসানোর কোনো প্রমাণ এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে, কিন্তু বর্তমান তথ্য অনুযায়ী এটিকে নতুন মহামারি হিসেবে চিহ্নিত করার কোনো ভিত্তি নেই। তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভয়াবহ দাবিগুলোকে নিশ্চিত সংবাদ হিসেবে গ্রহণ না করে সরকারি স্বাস্থ্যতথ্য ও নির্ভরযোগ্য আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের পরবর্তী হালনাগাদ অনুসরণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ।