টানা ২৩ মাস সোনা কিনল চীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাড়ল মজুত বিশ্ব বাজারে
চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেপ্টেম্বরেও সোনা কিনে টানা ২৩ মাসের রেকর্ড গড়েছে, মজুত বেড়ে ২৪০৯ টনের বেশি হয়েছে, মূল্য কমেছে বাজারে।
টানা ২৩ মাস সোনা কিনল চীন কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাড়ল মজুত বিশ্ব বাজারে
চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সেপ্টেম্বর মাসেও সোনার মজুত বাড়িয়েছে। এর মধ্য দিয়ে টানা ২৩ মাস সোনা কেনার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির দেশটি। চীনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শেষে দেশটির সরকারি সোনার মজুত দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৭৪ লাখ ৭০ হাজার আউন্সে, যা আগস্টের ৭ কোটি ৬৭ লাখ ৩০ হাজার আউন্সের তুলনায় প্রায় ৭৪ লাখ আউন্স বেশি। ওজনের হিসাবে সেপ্টেম্বর মাসে মজুত বেড়েছে প্রায় ২৩ দশমিক শূন্য ২ টন এবং মোট মজুত দাঁড়িয়েছে প্রায় ২ হাজার ৪০৯ দশমিক ৬ টনে।
অর্থাৎ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ২৩ টন সোনা কেনার দাবিটি মূলত সঠিক। একইভাবে সেপ্টেম্বর শেষে চীনের সোনার মজুত ৭ কোটি ৭৪ লাখ ৭০ হাজার আউন্সে পৌঁছানোর তথ্যও সরকারি পরিসংখ্যানের সঙ্গে মিলে যায়। তবে মজুতের আর্থিক মূল্য নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। সেপ্টেম্বর শেষে এসব সোনার ঘোষিত মূল্য ছিল প্রায় ৩২৩ দশমিক ৫২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগস্টের প্রায় ৩৫০ দশমিক ০৮ বিলিয়ন ডলারের চেয়ে কম। অর্থাৎ সোনার পরিমাণ বাড়লেও বাজারমূল্য কমেছে।
এর প্রধান কারণ সেপ্টেম্বর মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়া। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বর মাসে সোনার দাম ৬ শতাংশের বেশি কমেছিল। ফলে চীন নতুন করে সোনা কেনার পরও মোট মজুতের ঘোষিত আর্থিক মূল্য কমে যায়। এটি বোঝায় যে সোনার মজুতের পরিমাণ এবং সেই মজুতের বাজারমূল্য দুটি আলাদা বিষয়। পরিমাণ বাড়লে সবসময় মূল্যও একই হারে বাড়বে, এমন নয়।
চীনের এই ধারাবাহিক সোনা কেনার প্রবণতা নতুন নয়। ২০২৪ সালের শেষ দিক থেকে দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিয়মিতভাবে সোনার মজুত বাড়িয়ে চলেছে। আগস্টেও চীন প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার আউন্স সোনা যোগ করেছিল। তখন মোট মজুত বেড়ে ৭ কোটি ৬৭ লাখ ৩০ হাজার আউন্সে পৌঁছায় এবং টানা ২২ মাস সোনা কেনার ধারাবাহিকতা তৈরি হয়। আগস্টের ক্রয় প্রায় তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় মাসিক বৃদ্ধিগুলোর একটি ছিল।
বিশ্লেষকদের কাছে চীনের এই নীতি গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার অন্যতম কারণ হলো বৈদেশিক মুদ্রার মজুতকে আরও বৈচিত্র্যময় করার চেষ্টা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মজুতে সাধারণত বিভিন্ন দেশের মুদ্রা, সরকারি ঋণপত্র এবং অন্যান্য নিরাপদ সম্পদ থাকে। সোনা এসব সম্পদের বাইরে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংরক্ষণযোগ্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশ্ব স্বর্ণ পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো নিরাপত্তা, সহজে নগদে রূপান্তরের সুবিধা এবং দীর্ঘমেয়াদি মূল্য সংরক্ষণের মতো কারণেই সোনা ধরে রাখে।
চীনের ক্ষেত্রে সোনা কেনার এই ধারাবাহিকতা আরও তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ দেশটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক মুদ্রার মজুতধারীদের একটি। সেপ্টেম্বর মাসে চীনের মোট বৈদেশিক মুদ্রার মজুতও কমেছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শেষে দেশটির বৈদেশিক মুদ্রার মজুত প্রায় ৩ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। শক্তিশালী মার্কিন মুদ্রা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণপত্রের উচ্চতর সুদের হারসহ বিভিন্ন মূল্যায়নজনিত প্রভাব এতে ভূমিকা রেখেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
চীনের সোনা কেনার প্রবণতা আন্তর্জাতিক বাজারেও নজর কাড়ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ক্রমাগত সোনা কেনাকে দীর্ঘমেয়াদি চাহিদার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। যদিও স্বল্পমেয়াদে সোনার দাম সুদের হার, মুদ্রার বিনিময়মূল্য, সরকারি ঋণপত্রের ফলন এবং বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতার ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভর করে।
৭ অক্টোবর আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দামও কিছুটা নিম্নমুখী ছিল। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শক্তিশালী মার্কিন মুদ্রা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে বিনিয়োগকারীদের অপেক্ষার কারণে সোনার দাম চাপের মধ্যে ছিল। একই সময়ে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টানা ২৩তম মাসের সোনা কেনার তথ্য সামনে আসে।
তবে চীনের এই ক্রয়কে সরাসরি সোনার দাম বাড়ানোর পদক্ষেপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং সরকারি তথ্য ও সাম্প্রতিক বাজার পরিস্থিতি থেকে বোঝা যায়, এটি দীর্ঘমেয়াদি মজুত ব্যবস্থাপনা ও সম্পদ বৈচিত্র্যকরণের অংশ। কারণ সেপ্টেম্বর মাসে চীন সোনা কিনেছে, অথচ একই মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে চীনের ক্রয় বাজারে তাৎক্ষণিক মূল্য বৃদ্ধির নিশ্চয়তা দেয়নি।
সেপ্টেম্বর মাসে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রায় ২৩ টন সোনা কিনেছে এবং এর ফলে টানা ২৩ মাস সোনা কেনার ধারাবাহিকতা তৈরি হয়েছে। সেপ্টেম্বর শেষে সরকারি সোনার মজুত প্রায় ২ হাজার ৪০৯ দশমিক ৬ টনে পৌঁছেছে। তবে ৩২৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের মূল্যটি স্থির মূল্য নয়; এটি ওই সময়ের বাজারদরের ভিত্তিতে হিসাব করা মূল্য, যা আগস্টের তুলনায় কমেছে।