কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জোয়ারে ওয়াল স্ট্রিটে নতুন রেকর্ড, ঊর্ধ্বমুখী মার্কিন শেয়ারবাজার
তেল ও সরকারি ঋণের চাপ উপেক্ষা করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিনিয়োগে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে নতুন উচ্চতার রেকর্ড তৈরি হয়েছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জোয়ারে ওয়াল স্ট্রিটে নতুন রেকর্ড, ঊর্ধ্বমুখী মার্কিন শেয়ারবাজার
যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে আবারও উচ্ছ্বাসের নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতকে ঘিরে বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক আগ্রহ, বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শক্তিশালী সম্ভাবনা এবং আসন্ন প্রান্তিক আর্থিক ফলাফল নিয়ে আশাবাদ সব মিলিয়ে ওয়াল স্ট্রিটের প্রধান সূচকগুলো নতুন সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে। সর্বশেষ লেনদেনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শেয়ারসূচক এসঅ্যান্ডপি ৫০০ প্রায় শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ বেড়ে ৭ হাজার ৮১৮ দশমিক ৯৩ পয়েন্টে উঠে সর্বকালের সর্বোচ্চ অবস্থানে লেনদেন শেষ করেছে। প্রযুক্তিনির্ভর নাসডাকও শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ বেড়ে নতুন রেকর্ড গড়েছে।
তথ্য যাচাই করে দেখা যাচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দাবিটির মূল বক্তব্য সত্য হলেও কিছু বিষয় ব্যাখ্যার প্রয়োজন রয়েছে। চলতি ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক প্রায় ১৪ দশমিক ২ শতাংশ বেড়েছে। একই সময়ে নাসডাকের উত্থান প্রায় ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। অর্থাৎ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তি খাতের শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি মার্কিন বাজারের সামগ্রিক ঊর্ধ্বগতিতে বড় ভূমিকা রাখছে।
৬ অক্টোবরের লেনদেন ছিল এই উত্থানের গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ প্রথমবারের মতো ৭ হাজার ৮০০ পয়েন্টের সীমা অতিক্রম করে দিনের লেনদেন শেষ করে। এর আগে আগস্টে সূচকটি সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল। এবার সেই পুরোনো রেকর্ড ছাড়িয়ে নতুন উচ্চতা তৈরি হয়েছে। নাসডাকও একই দিনে নতুন সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে। অন্যদিকে ডাও জোন্স সূচক প্রায় শূন্য দশমিক ৪৯ শতাংশ বাড়লেও আগস্টে গড়া নিজস্ব সর্বোচ্চ অবস্থানের চেয়ে এখনো প্রায় পাঁচ শতাংশ নিচে রয়েছে।
বাজারের এই উত্থানের অন্যতম প্রধান চালিকা শক্তি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো, উন্নত কম্পিউটার চিপ, তথ্যকেন্দ্র এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বেড়েছে। বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে অ্যামাজন, মাইক্রোসফট, টেসলা, অ্যাপল, অ্যালফাবেট ও এনভিডিয়ার শেয়ারে সাম্প্রতিক লেনদেনে ইতিবাচক প্রবণতা দেখা গেছে। মেটা ছাড়া তথাকথিত বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রায় সবাই মঙ্গলবারের লেনদেনে ঊর্ধ্বমুখী ছিল।
চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষেত্রেও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ স্পষ্ট। মার্ভেল টেকনোলজির শেয়ার প্রায় ৫ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানটি তথ্যকেন্দ্রের চিপের চাহিদা শক্তিশালী থাকায় ভবিষ্যৎ আয় নিয়ে ইতিবাচক পূর্বাভাস দিয়েছে। এএমডির শেয়ারও প্রায় ২ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা জানিয়েছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যাপক চাহিদা পূরণে আগামী বছর চিপ সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বিদ্যুৎ খাতও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্প্রসারণের সঙ্গে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। গুগলের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ সরবরাহ চুক্তির খবর প্রকাশের পর কনস্টেলেশন এনার্জির শেয়ার একদিনে প্রায় ১২ দশমিক ৩ শতাংশ বেড়েছে। এর মাধ্যমে বোঝা যায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার শুধু প্রযুক্তি ও চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকেই প্রভাবিত করছে না; বিপুল পরিমাণ বিদ্যুতের প্রয়োজন হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও অবকাঠামো খাতও এর সুফল পাচ্ছে।
তবে বাজারের এই উত্থান একেবারেই ঝুঁকিমুক্ত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণবাজারে সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা গেছে। দীর্ঘমেয়াদি সরকারি ঋণের সুদহার বহু বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল। ১০ বছর মেয়াদি সরকারি ঋণের সুদহার একপর্যায়ে প্রায় ৫ দশমিক ৩৫ শতাংশে পৌঁছে ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছিল। ৩০ বছর মেয়াদি ঋণের সুদহারও পাঁচ দশমিক সাত শতাংশের ওপরে উঠেছিল।
সরকারি ঋণের সুদহার বাড়লে সাধারণত ঋণ নেওয়ার খরচ বাড়ে। এর প্রভাব পড়ে ব্যবসা, আবাসন, ভোক্তা ব্যয় এবং নতুন বিনিয়োগের ওপর। একই সঙ্গে উচ্চ সুদহার ভবিষ্যতের মুনাফার বর্তমান মূল্য কমিয়ে দেয় বলে উচ্চমূল্যের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। এ কারণেই বর্তমান বাজারের উত্থানকে ঘিরে আশাবাদের পাশাপাশি সতর্কতাও রয়েছে।
তেলের দামও বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে তেলের দাম দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। মঙ্গলবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ১০০ ডলারের কাছাকাছি ছিল। বুধবারও তা ১০১ ডলারের ওপরে ওঠে। উচ্চ তেলের দাম পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে তেলের সরবরাহ নিয়ে কিছুটা স্বস্তি তৈরি হয়েছে। জি-৭ জোট জরুরি মজুত থেকে জ্বালানি ও অপরিশোধিত তেল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় বাজারে সরবরাহ ঘাটতির আশঙ্কা কিছুটা কমেছে। এর ফলে তেলের দাম কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে এবং সরকারি ঋণের সুদহারও সাম্প্রতিক সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে নেমেছে। বাজারে এই স্বস্তি শেয়ার কেনার প্রবণতা বাড়াতে সাহায্য করেছে।
এদিকে বিনিয়োগকারীদের নজর এখন যুক্তরাষ্ট্রের বড় কোম্পানিগুলোর তৃতীয় প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফলের দিকে। বিশ্লেষকদের হিসাবে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সময়ে এসঅ্যান্ডপি ৫০০ভুক্ত কোম্পানিগুলোর সামগ্রিক মুনাফা প্রায় ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ বাড়তে পারে। এর মধ্যে প্রযুক্তি খাতে মুনাফা বৃদ্ধির সম্ভাবনা প্রায় ৬৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং জ্বালানি খাতে প্রায় ১১৪ দশমিক ৭ শতাংশ বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ঘিরে বিপুল বিনিয়োগ বর্তমানে শেয়ারবাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মুনাফার উৎস হিসেবে কাজ করছে। একই সঙ্গে উচ্চ তেলের দাম, সরকারি ঋণের চাপ, সুদহার এবং মূল্যস্ফীতি বাজারের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে আছে। ফলে বর্তমান রেকর্ড থেকে আরও ঊর্ধ্বগতি সম্ভব হলেও বাজার একটানা একই গতিতে বাড়বে এমন নিশ্চয়তা নেই।