এনভিডিয়ার বাংলাদেশি এআই বিজ্ঞানী ইরফানের মৃত্যু, নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়ে পরিবারের নতুন লড়াই

যুক্তরাষ্ট্রে এনভিডিয়ার বাংলাদেশি এআই বিজ্ঞানী ইরফানের রহস্যজনক মৃত্যু ঘিরে প্রশ্ন, প্রকৃত সত্য উদঘাটনে নিরপেক্ষ পুনঃতদন্তের জোর দাবি পরিবারের সদস্যদের।

এনভিডিয়ার বাংলাদেশি এআই বিজ্ঞানী ইরফানের মৃত্যু, নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়ে পরিবারের নতুন লড়াই

এনভিডিয়ার বাংলাদেশি এআই বিজ্ঞানী ইরফানের মৃত্যু, নিরপেক্ষ তদন্ত চেয়ে পরিবারের নতুন লড়াই


যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার জ্যেষ্ঠ ডাটা সায়েন্টিস্ট ও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষক ইরফান আল-হুসাইনির মৃত্যুর প্রায় দুই মাস পরও এর পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে তাঁর পরিবার। ৩২ বছর বয়সী ইরফানের মৃত্যুকে কর্তৃপক্ষ আত্মহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করলেও পরিবার এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

কেকিউইডের তথ্য অনুযায়ী, গত ২২ জুলাই পালো অল্টো পুলিশ একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির সম্ভাব্য আত্মহত্যার খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যায়। ইরফানকে সেখান থেকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আট দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ৩০ জুলাই তাঁর মৃত্যু হয়।


ইরফান এনভিডিয়ায় জ্যেষ্ঠ ডাটা সায়েন্টিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তাঁর পেশাগত পরিচয়সংক্রান্ত প্রকাশ্য তথ্যেও তাঁকে পালো অল্টোতে অবস্থানরত এনভিডিয়ার গবেষক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঘটনার পর থেকেই ইরফানের পরিবার তাঁর মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। ১৭ সেপ্টেম্বর পালো অল্টো সিটি হলের বাইরে পরিবার, বন্ধু ও সমর্থকেরা জড়ো হয়ে পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানান। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম Palo Alto Daily Post জানিয়েছে, সেখানে শতাধিক মানুষ উপস্থিত ছিলেন।


সংবাদ সম্মেলনে ইরফানের বাবা তাহমীদ আল-হুসাইনি ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে কর্তৃপক্ষের কাছে বিস্তারিত তদন্তের আবেদন জানান। কেকিউইডকে তিনি বলেন, ছেলের মৃত্যুর বিষয়ে স্পষ্ট উত্তর পাওয়ার অপেক্ষায় তিনি যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন। ইরফানের মা সালমা বেগম ও বোন ড. সারাহ আল-হুসাইনিও পরিবারের সঙ্গে এই দাবিতে যুক্ত হয়েছেন।


পরিবারের অন্যতম প্রশ্ন ঘটনার দিনের সময়রেখা নিয়ে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেদিন ইরফানকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়, সেদিন সকালেও তিনি পেশাগত কাজে সক্রিয় ছিলেন এবং একটি কাজসংক্রান্ত উপস্থাপনা করেছিলেন। পরিবার বলছে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড এবং পরবর্তী ঘটনার মধ্যে যে সময়ের ব্যবধান রয়েছে, সেটি আরও গভীরভাবে পরীক্ষা করা দরকার।

পরিবারের আইনজীবী অ্যান্থনি ব্রাসও তদন্তের পক্ষে কয়েকটি বিষয় সামনে এনেছেন। কেকিউইডকে তিনি জানান, কোনো আত্মহত্যার চিরকুট না পাওয়া এবং ঘটনার সময়রেখাসহ কয়েকটি বিষয় তাঁর কাছে আরও তদন্তের দাবি রাখে। পরিবারের পক্ষ থেকে পারিবারিক সম্পর্ক নিয়ে কিছু গুরুতর অভিযোগও তোলা হয়েছে; তবে সেগুলো এখন পর্যন্ত আদালতে প্রমাণিত তথ্য নয়। সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষের আইনজীবী কেকিউইডকে জানিয়েছেন, তাঁর মক্কেল তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করতে চান এবং পূর্ণাঙ্গ ময়নাতদন্তের দাবিও করেছিলেন।

অন্যদিকে, পালো অল্টো পুলিশ বলেছে, এখন পর্যন্ত ইরফানের মৃত্যু অন্য কারও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ফল—এমন প্রমাণ কর্তৃপক্ষ শনাক্ত করেনি। একই সঙ্গে পুলিশ জানিয়েছে, পরিবারের কাছ থেকে বিভিন্ন তথ্য ও উপকরণ তারা পেয়েছে এবং সেগুলো পর্যালোচনার পাশাপাশি তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।

কেকিউইডের ১৮ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সান্তা ক্লারা কাউন্টির মেডিকেল এক্সামিনারের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন তখনও শেষ হয়নি এবং অনলাইনে মামলাটির অবস্থা ‘খোলা’ ছিল। ফলে মৃত্যুর পরিস্থিতি নিয়ে চূড়ান্ত ফরেনসিক নথি প্রকাশের আগ পর্যন্ত বেশ কিছু প্রশ্নের আনুষ্ঠানিক উত্তর পাওয়া বাকি রয়েছে।

এর আগেই ইরফানের পরিবার বিষয়টি ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। ৮ সেপ্টেম্বর পরিবারের সদস্যরা ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল রব বন্টার দপ্তরে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ও জরুরি আবেদন পৌঁছে দেন। এনবিসি বে এরিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়, পরিবার রাজ্য কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ এবং মৃত্যুর ঘটনা আরও বিস্তারিতভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছে।

ইরফানের মৃত্যু বাংলাদেশেও প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। ২২ আগস্ট ঢাকার বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়—বুয়েট প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও পরিবারের সদস্যরা তাঁর মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে কর্মসূচি পালন করেন। আন্তর্জাতিক আলোকচিত্র সংস্থা নুরফটোর প্রকাশিত ছবির তথ্যেও ইরফানকে বুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থী এবং এনভিডিয়ার জ্যেষ্ঠ ডাটা সায়েন্টিস্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।


প্রযুক্তি ও গবেষণার জগতে কর্মরত একজন তরুণ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বিজ্ঞানীর এমন মৃত্যু স্বাভাবিকভাবেই পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে শোক ও প্রশ্ন তৈরি করেছে। তবে মৃত্যুর কারণ ও এর পেছনে অন্য কোনো ঘটনা ছিল কি না—সে বিষয়ে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত প্রতিবেদন না আসা পর্যন্ত পরিবারের অভিযোগ এবং কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক অবস্থানকে আলাদাভাবে দেখা জরুরি।


পরিবারের মূল দাবি এখন একটাই—ঘটনার সময়রেখা, ডিজিটাল তথ্য, ফরেনসিক প্রমাণ এবং মৃত্যুর আগের পরিস্থিতি যথাযথভাবে পরীক্ষা করে তাদের প্রশ্নগুলোর উত্তর দেওয়া হোক। অন্যদিকে পুলিশ বলছে, তারা পরিবারের দেওয়া উপকরণ পর্যালোচনা করছে এবং তদন্ত চলমান রয়েছে। ফলে ইরফান আল-হুসাইনির মৃত্যুকে ঘিরে ওঠা প্রশ্নগুলোর চূড়ান্ত উত্তর এখন অনেকটাই নির্ভর করছে মেডিকেল এক্সামিনারের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এবং চলমান তদন্তের ফলাফলের ওপর।

সিএসবি নিউজ-এর আরও খবর