অস্কারজয়ী অভিনেত্রী ইভা মেরি সেন্ট ১০২ বছরে প্রয়াত, শেষ হলো হলিউডের সোনালি অধ্যায়
হলিউডের কিংবদন্তি অভিনেত্রী ইভা মেরি সেন্ট ১০২ বছর বয়সে মারা গেছেন, রেখে গেলেন সাত দশকের গৌরবময় অভিনয়জীবনের স্মৃতি।
অস্কারজয়ী অভিনেত্রী ইভা মেরি সেন্ট ১০২ বছরে প্রয়াত, শেষ হলো হলিউডের সোনালি অধ্যায়
অস্কারজয়ী কিংবদন্তি মার্কিন অভিনেত্রী ইভা মেরি সেন্ট ১০২ বছর বয়সে মারা গেছেন। ৬ অক্টোবর লস অ্যাঞ্জেলেসে নিজ বাড়িতে স্বাভাবিক কারণে তাঁর মৃত্যু হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। তাঁর প্রচার প্রতিনিধি জেফ স্যান্ডারসন জানিয়েছেন, মৃত্যুর সময় পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা তাঁর পাশে ছিলেন। তাঁর মৃত্যুতে হলিউডের স্বর্ণযুগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়ের অবসান ঘটল।
১৯২৪ সালের ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির নিউয়ার্কে জন্মগ্রহণ করেন ইভা মেরি সেন্ট। অভিনয়জগতে আসার আগে তাঁর লক্ষ্য ছিল শিক্ষক হওয়া। ওহাইওর বোলিং গ্রিন স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় নাটকে অভিনয়ের সুযোগ পান। সেই অভিজ্ঞতাই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। পরে তিনি নিউইয়র্কে গিয়ে মঞ্চ, বেতার ও টেলিভিশনে অভিনয় শুরু করেন। অভিনয়ের পাশাপাশি তিনি বিখ্যাত অভিনেতা প্রশিক্ষক লি স্ট্রাসবার্গের অধীনে কাজ করেন এবং অভিনয়শিল্পীদের মর্যাদাপূর্ণ সংগঠন অ্যাক্টরস স্টুডিওর সঙ্গে যুক্ত হন।
সিনেমায় তাঁর অভিষেকই ছিল অবিশ্বাস্য সাফল্যের। ১৯৫৪ সালের এলিয়া কাজানের বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘অন দ্য ওয়াটারফ্রন্ট’-এ মার্লন ব্র্যান্ডোর বিপরীতে এডি ডয়েল চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। ছবিতে তাঁর চরিত্র ছিল একজন তরুণী, যার ভাই শ্রমিক ইউনিয়নের দুর্নীতি ও অপরাধচক্রের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা লোকজনের হাতে নিহত হয়। এরপর তাঁর চরিত্রের সঙ্গে ব্র্যান্ডোর অভিনীত টেরি ম্যালয়ের সম্পর্ক ছবির আবেগের কেন্দ্র হয়ে ওঠে। অসাধারণ অভিনয়ের জন্য নিজের প্রথম চলচ্চিত্রেই তিনি শ্রেষ্ঠ পার্শ্ব অভিনেত্রীর অস্কার জিতে নেন।
অস্কার পাওয়ার সময় ইভা মেরি সেন্ট অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। পুরস্কার গ্রহণের সময় তিনি জানিয়েছিলেন, তাঁর মনে হচ্ছিল সন্তানটি যেন তখনই জন্ম নিতে পারে। মাত্র দুই দিন পর তাঁর ছেলে ড্যারেল জন্মগ্রহণ করে। নিজের প্রথম চলচ্চিত্রেই অস্কার জয় তাঁকে রাতারাতি আন্তর্জাতিক তারকায় পরিণত করে।
তবে অস্কার জয়ের পর ইভা মেরি সেন্ট অন্য অনেক তারকার মতো একের পর এক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেননি। বরং নিজের পরিবারকে বেশি সময় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বহু বড় চলচ্চিত্রের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। স্বামী জেফ্রি হেইডেন ছিলেন পরিচালক ও প্রযোজক। ১৯৫১ সালে তাঁদের বিয়ে হয় এবং ২০১৬ সালে হেইডেনের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁরা দীর্ঘ দাম্পত্য জীবন কাটান। তাঁদের দুই সন্তান ছিল।
১৯৫৯ সালে ইভা মেরি সেন্ট আবারও চলচ্চিত্র ইতিহাসে নিজের জায়গা শক্ত করেন আলফ্রেড হিচককের ‘নর্থ বাই নর্থওয়েস্ট’-এ অভিনয় করে। ক্যারি গ্র্যান্টের বিপরীতে তিনি ইভ কেন্ডাল চরিত্রে অভিনয় করেন। রহস্য, গুপ্তচরবৃত্তি ও রোমাঞ্চে ভরা এই চলচ্চিত্র পরবর্তীকালে হিচককের অন্যতম সেরা কাজ হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এ ছবির মাধ্যমে ইভা মেরি সেন্ট নিজেকে শুধু আবেগঘন চরিত্রের অভিনেত্রী হিসেবে নয়, বরং পর্দায় শক্তিশালী ও আকর্ষণীয় রহস্যময় চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম শিল্পী হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেন।
এরপর তিনি পল নিউম্যানের সঙ্গে ‘এক্সোডাস’-এ অভিনয় করেন। এলিজাবেথ টেলর, মন্টগোমারি ক্লিফট, ওয়ারেন বিটি, রিচার্ড বার্টনসহ সে সময়ের বহু বড় তারকার সঙ্গে কাজ করেন তিনি। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে ছিল ‘আ হ্যাটফুল অব রেইন’, ‘রেইনট্রি কাউন্টি’, ‘অল ফল ডাউন’, ‘দ্য স্যান্ডপাইপার’ এবং ‘গ্র্যান্ড প্রি’।
চলচ্চিত্রের পাশাপাশি টেলিভিশনেও দীর্ঘ সাফল্যের গল্প লিখেছেন ইভা মেরি সেন্ট। ১৯৭০-এর দশক থেকে তিনি টেলিভিশনে বেশি সক্রিয় হন। আশির দশকে জনপ্রিয় ধারাবাহিক ‘মুনলাইটিং’-এ সাইবিল শেফার্ডের মায়ের চরিত্রে অভিনয় করে নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছেও পরিচিতি পান। ১৯৯০ সালে ‘পিপল লাইক আস’ ধারাবাহিকের জন্য তিনি টেলিভিশনের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার এমি অর্জন করেন।
বয়স বাড়লেও অভিনয় থেকে পুরোপুরি সরে যাননি তিনি। ২০০৬ সালে ‘সুপারম্যান রিটার্নস’ চলচ্চিত্রে মার্থা কেন্টের চরিত্রে অভিনয় করেন। ছবিটিতে তাঁর উপস্থিতি বিশেষভাবে আলোচিত হয়, কারণ এতে তাঁর সঙ্গে পরোক্ষভাবে আবারও যুক্ত হয় মার্লন ব্র্যান্ডোর স্মৃতি। ব্র্যান্ডোর পুরোনো দৃশ্য ব্যবহারের মাধ্যমে দুই কিংবদন্তি অভিনেতার চলচ্চিত্রজীবনের একটি প্রতীকী যোগসূত্র তৈরি হয়েছিল।
ইভা মেরি সেন্টের অভিনয়জীবন সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে বিস্তৃত ছিল। তিনি ৯০-এর দশকেও অভিনয় চালিয়ে যান। তাঁর শেষদিকের কাজের মধ্যে ‘উইন্টার্স টেল’ উল্লেখযোগ্য। জীবনের শেষ পর্যায়েও তিনি চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে হলিউডের সোনালি যুগের জীবন্ত স্মারক হিসেবে বিবেচিত ছিলেন।
তাঁর মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর চলচ্চিত্রজগতে নেমে এসেছে শোকের আবহ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইভা মেরি সেন্টের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তাঁর বেছে বেছে কাজ করা। মাত্র কয়েকটি চলচ্চিত্র দিয়েই তিনি এমন অবস্থান তৈরি করেছিলেন, যা বহু অভিনেতা-অভিনেত্রীর দীর্ঘ ক্যারিয়ারেও অর্জন করা কঠিন। প্রথম চলচ্চিত্রেই অস্কার, এরপর হিচককের স্মরণীয় ছবিতে অভিনয় এবং পরবর্তী সময়ে টেলিভিশনে পুরস্কারজয়ী কাজ সব মিলিয়ে তাঁর ক্যারিয়ার ছিল ব্যতিক্রমী।